kalerkantho


এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার

প্রতিশ্রুতি রাখেননি দেশের রাষ্ট্রপতিও

১৯৮৬ সিউল এশিয়ান গেমসে লাইট হেভিওয়েটে ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন মোশাররফ হোসেন। মর্যাদার এই আসরে বাংলাদেশের আর কোনো খেলোয়াড়ই পাননি ব্যক্তিগত ইভেন্টে কোনো পদক। এমন সাফল্যে মোশাররফ ছেলের নামই রেখেছেন সিউল। সেই ছেলের চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে পারছেন না রাজশাহীর এই কৃতি সন্তান। রাহেনুর ইসলামকে দেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে নিজের অভিমানের পাশাপাশি স্বপ্নের কথাও জানালেন মোশাররফ হোসেন   

১৪ নভেম্বর, ২০১৪ ০০:০০



প্রতিশ্রুতি রাখেননি দেশের রাষ্ট্রপতিও

ছবি : রফিকুল ইসলাম

প্রশ্ন : আপনার তালাইমারী বাঁদুরতলার বাড়িটা খুঁজতে ঘাম ঝরল অনেক! কয়েকজন প্রতিবেশী বক্সার মোশাররফের বদলে চিনলেন সেনাবাহিনীর মোশাররফ নামে...

মোশাররফ হোসেন : মাঝেমধ্যে নিজেই ভুলে যাই, বক্সার ছিলাম কখনো! প্রতিবেশীদের আর দোষ দিয়ে লাভ কি! খেলাটা ছাড়ার পর সেভাবে আর কেউ খোঁজ নেয়নি আমার। জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্তারাও না। আমার ধারণা, গত কয়েকটা কমিটির অনেকে জানেনই না আমি রাজশাহীর সাবেক কৃতি বক্সার।

প্রশ্ন : জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্তাদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলছে নাকি?

মোশাররফ হোসেন : সম্পর্ক থাকলেই না দ্বন্দ্ব হবে। তারা তো খোঁজই রাখে না। জেলা ক্রীড়া সংস্থায় খেলার বাইরের মানুষদের পদচারণা বেশি হওয়ায় সাবেক খেলোয়াড়রা মূল্যায়ন পান না আর। এই তো গত মাসে বাংলাদেশের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার আন্তর্জাতিক ম্যাচ হলো রাজশাহীতে। এমন ঐতিহাসিক ম্যাচটিতে বাংলাদেশের হয়ে এশিয়াডে ব্যক্তিগত ইভেন্টে পদকজয়ী হিসেবে একটা সৌজন্য টিকিট তো আমি পেতে পারতাম। কিন্তু টিকিট পরের কথা, কেউ একটা ফোন পর্যন্ত করেনি।

প্রশ্ন : আন্তর্জাতিক ম্যাচের কথা যখন এলই তখন বরং আপনার আন্তর্জাতিক অঙ্গন নিয়ে গল্প করা যাক। এশিয়ান গেমসের মতো বড় আসরে ব্যক্তিগত ইভেন্টে বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের মধ্যে একমাত্র পদকজয়ী আপনি...

মোশাররফ হোসেন : ১৯৮৬ সালের সিউল এশিয়াডের সেই দিনটাই আমার জীবনের সেরা। ভুলব না কখনো। এত বড় একটা আসরে ব্রোঞ্জ জিততে পারি, ভাবেনি হয়তো বাংলাদেশের কেউ। এখনো মনে আছে, ব্রোঞ্জ নিশ্চিতের পর দক্ষিণ কোরিয়ায় আসা বাংলাদেশি দলের সবাই অভিন্দন জানাতে এসেছিল আমাকে। দু-একজন তো জড়িয়ে ধরে কেঁদেও ফেলেছিল হাউমাউ করে। চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি আমিও।

প্রশ্ন : এশিয়াডের সেই লাইট হেভিওয়েট ইভেন্টের স্মৃতির ঝাঁপিটা যদি একটু খুলতেন...

মোশাররফ হোসেন : সেই ইভেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন স্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়ার এক বক্সার আর রুপা পাকিস্তানি একজন। আমি জিতেছিলাম নেপাল আর ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপক্ষে। সবার নাম মনে নেই, তবে পাকিস্তানি বক্সার হোসেন শাহর কাছে হারটা পোড়ায় এখনো। তাকে হারাতে পারলে অন্তত রুপাটা নিশ্চিত ছিল। আর মনে মনে রুপা জয়ের স্বপ্নও দেখছিলাম আমি।

প্রশ্ন : এশিয়াডের বছরখানেক আগে দ্বিতীয় সাফ গেমসে সোনা জেতাটা নিশ্চয়ই বাড়তি অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল আপনাকে?

মোশাররফ হোসেন : তা তো বটেই। এশিয়ান গেমসে ঘুরে-ফিরে কিন্তু সাফের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গেই খেলতে হয়েছে আমাকে। সেই নেপাল, ভারত আর পাকিস্তানি বক্সারই তো। সাফে কিন্তু হারিয়েছিলাম পাকিস্তানের বক্সার ইউসুফকে। এশিয়াডে ইউসুফের বদলে পাকিস্তান পাঠায় হোসেন শাহকে। তার পরও সাফের সাফল্যে এশিয়াডে পাকিস্তানের হোসেন শাহর কাছে হেরে যাওয়াটা কষ্টের আমার জন্য। এর বদলে দক্ষিণ কোরিয়া বা চীন, জাপানের কারো সঙ্গে হারলে এত বেশি খারাপ লাগত না। হোসেন অবশ্য এলেবেলে প্রতিপক্ষ ছিল না। সে সময় আন্তর্জাতিক বক্সিংয়ে যথেষ্ট সুনাম ছিল ওর। মনে হয়, র‌্যাংকিংয়েও ছিল তিন বা চারে।

প্রশ্ন : দেশে ফেরার পর তো ব্যাপক উন্মাদনা হয়েছিল আপনাকে ঘিরে...

মোশাররফ হোসেন : বিমানবন্দরে মানুষের ভিড় দেখে মনে হচ্ছিল কোনো রাজ্য জয় করে ফিরেছি আমি। সে সময়ের বাংলাদেশ রাষ্ট্রপতি জেনারেল এইচএম এরশাদ পর্যন্ত ফুলের মালা নিয়ে হাজির বিমানবন্দরে! বিশ্বাসই হচ্ছিল না আমার। ফুলের মালা পরিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলেন তিনি। কী করব, কী বলব কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। দেশের রাষ্ট্রপতি জড়িয়ে ধরেছেন আমাকে, ভাবা যায়?

প্রশ্ন : বুকে জড়িয়ে এরশাদ কিছু বলেছিলেন?

মোশাররফ হোসেন : এরশাদ বলেছিলেন, 'মোশাররফ, দেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছো তুমি। আমরাও সম্মানিত করব তোমাকে। তুমি সেনাবাহিনীতে চাকরি করো আর আমিও ছিলাম সেনাবাহিনীতে, এটা আরো বেশি গর্বিত করছে আমাকে। তোমাকে ঢাকায় একটা ফ্ল্যাট দেওয়া হবে। সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হবে গাড়িও।'

প্রশ্ন : সেই বাড়ি-গাড়ির খবর কী?

মোশাররফ হোসেন : রাজনৈতিক নেতারা কত প্রতিশ্রুতিই তো দেন, সেগুলো পূরণ হলে দেশের কি এই হাল থাকে? তবে রাষ্ট্রপতি প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাখবেন না, এটা প্রথমে বুঝতে পারিনি। আশায় ছিলাম, এই হয়তো ডাক পড়বে বঙ্গভবনে যাওয়ার। সেই আশার গুড়ে বালি। কিছু দিন পরই সামান্য এই বক্সারকে বাড়ি-গাড়ি দেওয়ার কথা বেমালুম ভুলে যান এরশাদ।

প্রশ্ন : রাষ্টপতির সঙ্গে আরো অনেকেই তো অনেক কিছু দেওয়ার প্রতিশ্রতি দিয়েছিলেন তখন...

মোশাররফ হোসেন : সে সময় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সভাপতি ছিলেন মেজর জেনারেল সাদেকুর রহমান। তিনি দিতে চেয়েছিলেন এক লাখ টাকা। রাজশাহীর মেয়র মিজানুর রহমান মিনুও এই শহরে একটা দোকান বরাদ্দ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কবির সেই সুরেই বলতে হয়, 'কেউ কথা রাখেনি।' এগুলো পেলে আমার সংসারে অভাব আসত না। এখন এমনই হাল যে ছেলের চিকিৎসার টাকা পর্যন্ত জোগাড় করতে পারছি না।

প্রশ্ন : কী হয়েছে আপনার ছেলের?

মোশাররফ হোসেন : দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে ব্রোঞ্জ পদক জেতায় ছেলের নামই রেখেছি সিউল। আমার মতো বক্সার তৈরি করতে চেয়েছিলাম ওকে। কিন্তু আল্লাহ চাননি সেটা। তাই আমার ছেলে হয়েছে প্রতিবন্ধী। জন্ম থেকে হাঁটাচলা করতে পারে না ও। নিজের সামান্য সামর্থ্য দিয়ে অনেক চেষ্টা করেছি চিকিৎসার। আর পারছি না। ডাক্তার বলেছেন, উন্নত চিকিৎসা পেলে সিউল সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবে। এ জন্য ওকে নিতে হবে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা সিঙ্গাপুরে। খরচ হতে পারে ৪০ লাখ টাকা। সংসারই যেখানে চলছে টেনেটুনে, সেখানে এত টাকা জোগাড় করব কিভাবে? ছেলেটার মুখের দিকে তাকালে বুক ফেটে কান্না আসে। অধম মনে হয় নিজেকে। কয়টা টাকার জন্য পৃথিবীর বুকে এসেও হাঁটতে পারছে না আমার ছেলে, বাবা হয়ে মেনে নিই কিভাবে?

প্রশ্ন : আপনার সংসার চলছে কিভাবে?

মোশাররফ হোসেন : সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে ২০০৫ সালে অবসর নেওয়ার পর এককালীন কিছু টাকা পেয়েছি। সেই টাকায় তিনতলা বাড়ি করেছি একটা। এই বাড়ি ভাড়া আর পেনশন থেকে পাওয়া টাকাই আয়ের উৎস আমার। আমরা যখন চাকরি করতাম, তখন সেনাবাহিনীর বেতন খুব বেশি ছিল না। তাই পেনশনের অঙ্কটাও খুব বলার মতো কিছু নয়। আর মফস্বল শহরে বাড়ি ভাড়া কত হতে পারে সেটাও জানার কথা আপনার। এই টাকায় স্ত্রী আর তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে চলা কঠিন। তবে দুঃখজনক হলো, অনেকেই ভাবেন তিনতলা বাড়ির মালিকের আর অভাব কিসের? নিষ্ঠুর পরিহাস আর কি!

প্রশ্ন : আপনার দুই মেয়ে কী করে?

মোশাররফ হোসেন : এক মেয়ে পড়ছে সিরাজগঞ্জ নর্থ বেঙ্গল মেডিক্যালে ফাইনাল ইয়ারে। আরেক মেয়ে কলেজে। মেডিক্যালের পড়ার যা খরচ, সেটা আমার পক্ষে চালানো অসম্ভব। আমার অবস্থা বুঝেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন লে. কর্নেল (অবসর) লুৎফুল হক। শুধু মেয়েদের পড়ার খরচই নয়, যতভাবে সম্ভব তিনি সাহায্য করেন আমাকে। লুৎফুল হক আবার একটি জাতীয় দৈনিকের উপদেষ্টা। সেই দৈনিকটিও সাহায্য করে যতটা সম্ভব। তাদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ আমি। না হলে ছেলেমেয়েদের নিয়ে অকুল পাথারেই পড়তে হতো।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের অন্যতম সেরা বক্সার আপনি। জাতীয় পুরস্কারসহ জিতেছেন অসংখ্য পদক। কিন্তু আপনার বাড়ির শোকেসে তেমন কোনো ট্রফি বা পদক দেখছি না...

মোশাররফ হোসেন : কী হবে এসব পদক দিয়ে? দু-একটি শোকেসে রেখে অন্য পদকগুলো পুঁটলিতে মুড়িয়ে খাটের তলায় রেখেছি। ধুলোও জমে গেছে সেই পুঁটলিতে। বলতে পারেন এক ধরনের অভিমানেই এমনটা করা। আমার মতো এশিয়ান গেমসে ব্যক্তিগত ইভেন্টে পদক জিততে পারেনি আর কেউ; অথচ সেই আমাকে মূল্যায়ন করল না কেউ। তাই এসব পদক শোকেসে রেখে হবেটা কি? তা ছাড়া আমি আবার মোহাম্মদ আলীর ভীষণ ভক্ত। তাঁকে দেখেই এসেছিলাম বক্সিংয়ে। যতটা জানি, তাতে মনে হয়, মোহাম্মদ আলী অভিমানে তাঁর পদকগুলো ছুড়ে ফেলেছিলেন সমুদ্রে। আমিও চাইলে পদ্মায় সব ফেলে দিতে পারতাম। সেটা না করে বিছানার নিচে ছুড়ে ফেলেছি আর কি? এর মধ্যেও কিন্তু ১৯৯৯ সালে পাওয়া জাতীয় পুরস্কারের স্মারকটা শোকেসে রেখেছি। দেশ সম্মান করেছে, তাই দেশের দেওয়া সম্মানকে অবহেলা করিনি। জাতীয় পুরস্কারের সনদের সঙ্গে পেয়েছিলাম ২৫ হাজার টাকা। একটা দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সর্বোচ্চ পুরস্কারের অঙ্কটা ২৫ হাজার টাকা, ভাবা যায়!

প্রশ্ন : আলীকে দেখে বক্সিংয়ে আসার কথা বললেন। গল্পটা শোনাবেন...

মোশাররফ হোসেন : শুরুতে আমি ছিলাম অ্যাথলেট। দৌড়ানো, লৌহগোলক নিক্ষেপ, লং জাম্প, হাই জাম্প ভালো লাগত সবই। সফলও হয়েছিলাম ১৯৭৫ সালে ইন্টার বাংলাদেশ স্কুল প্রতিযোগিতার শটপুটে। এই ইভেন্টে দ্বিতীয় হয়েছিলাম সেবার। পরের বছর ভালো অ্যাথলেট হওয়ার সুবাদে চাকরি পাই সেনাবাহিনীতে। পোস্ট ছিল ওয়ারেন্ট অফিসার। সেনাবাহিনীতেই একদিন টেলিভিশনে দেখাচ্ছিল মোহাম্মদ আলী আর জর্জ ফোরম্যানের বিখ্যাত 'দ্য রাম্বেল ইন দ্য জঙ্গল' হেভিওয়েট লড়াইটা। দুই বছর আগের লড়াই হলেও তখনো অন্য রকম শিহরণ খেলে গিয়েছিল রক্তে। মনে মনে ভাবছিলাম আলীর মতো যদি বক্সার হতে পারতাম! আমার পেটানো শরীর আর বক্সিয়ে আগ্রহ দেখে উৎসাহ দিলেন সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার কেরামত আলী। বলতে পারেন তিনিই আমার শিক্ষাগুরু। বক্সিয়ের প্রাথমিক পাঠ নিয়েছি তাঁর কাছ থেকে। এখনো শ্রদ্ধায় স্মরণ করি কেরামত স্যারের কথা।

প্রশ্ন : বক্সিংয়ে সাফল্য পেতে শুরু করলেন কখন থেকে?

মোশাররফ হোসেন : প্রথমে কিছুটা ভয় ভয় লাগত। কিন্তু যার প্রেরণা মোহাম্মদ আলী, তাকে কি ভয় পেলে চলে? আলীর বক্সিংয়ের স্টাইলটা দারুণ লাগত আমার। প্রথমে শরীরে প্রতিপক্ষের মার হজম করতেন। তারপর বিপক্ষের শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেলে হামলে পড়তেন রীতিমতো। আমি চেষ্টা করতে গিয়ে দেখলাম দু-একটা ঘুষিতে কাবু হয়ে যাচ্ছি! তখনই বুঝে যাই, আমার পক্ষে আলী হওয়া সম্ভব নয়। তাই আক্রমণাত্মক থাকতাম শুরু থেকে। সাফল্যও পেয়েছি বক্সিং শুরু করার পরপরই।

প্রশ্ন : আলীর সঙ্গে কখনও দেখা হয়েছিল আপনার...

মোশাররফ হোসেন : হ্যাঁ। স্বপ্নের নায়কের সঙ্গে দেখা হয়েছিল ইসলামাবাদ সাফ গেমসে ১৯৮৯ সালে। টুর্নামেন্টের উদ্বোধন করে চলে গিয়েছিলেন তিনি। আলী আসার পর থেকেই চেষ্টা করতে থাকি তাঁর সঙ্গে যে ভাবে হোক দেখা করতে। সেই সুযোগ এসেও যায় হোটেল লবিতে। তাঁর সঙ্গে মিলিয়েছি হাতও। তখন উচ্ছ্বাসে কাঁপছিলাম রীতিমত। আলী বুঝতে পেরে মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করে চলে যান। সেই সময়টা ভুলতে পারব না কখনও।

প্রশ্ন : আপনার প্রথম জাতীয় শিরোপা খুব সম্ভবত ১৯৮১ সালে...

মোশাররফ হোসেন : ঠিকই বলেছেন। ১৯৮১ সালে প্রথমবার হলাম লাইট হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন। এরপর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৮১ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত টানা ১০ বছর জাতীয় চ্যাম্পিয়ন আমি। লাইট হেভিওয়েটের চেয়ে হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নই হয়েছি বেশি। টানা ১০ বছর জাতীয় বক্সিংয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়নি বাংলাদেশের কেউই। এশিয়ান গেমসে ব্রোঞ্জ জেতার মতো এটাও গর্বের অর্জন আমার।

প্রশ্ন : কার সঙ্গে লড়াইটা চ্যালেঞ্জের মনে হতো তখন?

মোশাররফ হোসেন : সে সময় মানসম্পন্ন অনেক বক্সারই ছিল বাংলাদেশে। বিডিআরের (এখনকার বিজিবি) আবদুর রহমান, পুলিশের হাফিজুর রহমান, বিজেএমসির এনায়েত আলীরা কঠিন প্রতিপক্ষ ছিল। এনায়েত তো পরে যুক্তরাষ্ট্রেই স্থায়ী হয়ে গেছে। আমিও চাইলে বক্সিংয়ের অনেকের মতো বৈধ বা অবৈধভাবে চলে যেতে পারতাম বিদেশে। সে সুযোগ একাধিকবার এসেছিল। কিন্তু দেশটাকে ভালোবাসতাম। ভেবেছিলাম, দেশের হয়ে এত সম্মান যখন এনেছি, তখন দেশও এর প্রতিদান দেবে। কোথায় কী? আমাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো রাখলেন না দেশের রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত। তাই তো লজ্জা ভুলে হাত পেতে সাহায্যও নিতে হয়েছে আমাকে।

প্রশ্ন : এখনকার বক্সিং কি ঠিক পথে এগোচ্ছে?

মোশাররফ হোসেন : ঠিক পথে এগোলে কি গতবারের এশিয়ান গেমস থেকে বক্সিং বাদ পড়ে? কমনওয়েলথ গেমসে খারাপ পারফরম্যান্সের কারণে এশিয়ান গেমসে নেওয়াই হলো না বক্সারদের। অথচ এই একটা ইভেন্টে এশিয়াডে ব্যক্তিগত পদক আছে বাংলাদেশের। সেই পদকজয়ী খেলোয়াড় হিসেবে অবশ্যই হতাশ আমি। ব্যর্থতার দায় নিতে হবে বক্সিং ফেডারেশনকেও। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বেশির ভাগ সময়ই হন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা ব্যবসায়ী। খেলার বাইরের মানুষরা বক্সিংয়ের মর্ম বুঝবে কি? ফেডারেশনের মতো একই হাল জেলা ক্রীড়া সংস্থারও। আমি বুকে হাত দিয়েই বলতে পারি, রাজশাহী জেলা ক্রীড়া সংস্থার যাঁরা এখন নানা পদে আছেন, তাঁদের কারো কাছেই আমার মোবাইল নম্বর বা ঠিকানা পাবেন না আপনি।

প্রশ্ন : বুঝতে পারছি সংস্থাটির সঙ্গে অনেক দূরত্ব তৈরি হয়েছে আপনার...

মোশাররফ হোসেন : সাবেক খেলোয়াড় হিসেবে যেটুকু সম্মান দেওয়া উচিত, তার এক শতাংশও পাইনি আমি। ওয়ান-ইলেভেনের সময় অ্যাডহক কমিটি দিয়ে চলছিল এই সংস্থা। নয় সদস্যের সেই কমিটির একজন ছিলাম আমি। সেই হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল জেলা ক্রীড়া সংস্থার ভাড়া দেওয়া দোকানের বকেয়া নয় লাখ টাকা আদায় করার। নিষ্ঠার সঙ্গেই পালন করেছি দায়িত্বটা। নয় লাখের মধ্যে তুলে দিয়েছি সাত লাখ টাকা। আমি দায়িত্ব না নিলে দুই লাখ টাকাও ওরা তুলতে পারত কি না বলা কঠিন। কেননা চরম বিশৃঙ্খলা চলছিল সে সময়। ভাড়া আদায় করতে গিয়ে দেখি ক্রীড়া সংস্থার দোকান ৪১৬টা। অথচ ভাড়া তোলার হিসাবে দেখানো হতো ৩৭৫টা দোকান! বাকি ৩১টি দোকানের টাকা যে লুটপাট হতো বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই। লুটপাট করতে পারবে না বলেই কিনা দু-দুটো কমিটির কেউই আর ডাকেনি আমাকে।

প্রশ্ন : জেলার বক্সিংয়ের জাজ হিসেবেও কি ডাক পান না?

মোশাররফ হোসেন : এটা একটা মজার ব্যাপার। আমি বক্সিং ফেডারেশনের নিবন্ধিত জাজ। জাতীয় খেলায় জাজ হিসেবে ডাকাও হয় নিয়মিত। এমনকি ডাক পাই রাজশাহীর ক্লাবগুলোর বিভিন্ন টুর্নামেন্টে। কিন্তু জেলা ক্রীড়া সংস্থার বক্সিংয়ে আমার নাম মনেই হয় না কর্তাদের! কারণটা কী তাই তো বুঝছি না। এটা ইচ্ছে করে অবহেলা নাকি সম্মানী লোকের সম্মান করতে না জানা? বর্তমান সাধারণ সম্পাদক রাফিউস শামস প্যাডির সঙ্গে কোনো দিন দেখা হলে প্রশ্নটা করার ইচ্ছা আছে। বাংলাদেশে বক্সিংয়ের জাজদের মূল্যায়নও কিন্তু হয় না সেভাবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ম্যাচ শেষে দেওয়া হয় ৫০০ টাকা। এই টাকা তো বাড়ি থেকে যাতায়াত করতেই চলে যায়। আমার স্ত্রী আর পরিবারের লোকজন এ জন্য নিষেধ করেছিল কোনো টুর্নামেন্টে যেতে। তার পরও বক্সিং যেহেতু রক্তে, তাই কেউ ডাকলে না গিয়ে পারি না।

প্রশ্ন : জেলা ক্রীড়া সংস্থার সঙ্গে অভিমান আছে কিন্তু ক্লাব বা এরকম কিছুর সঙ্গেও কি কোনো সম্পর্ক নেই?

মোশাররফ হোসেন : সেটা আছে। ওয়াইএম স্পোর্টিং ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আমি। প্রশিক্ষণ দিই সিটি বক্সিং ক্লাবের ছাত্রদেরও। জেলা ক্রীড়া সংস্থায় না হলেও ক্লাবগুলো সম্মান দেয় এখনো। আসলে ক্লাবে তো সব খেলার মানুষ আর জেলা ক্রীড়া সংস্থায় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। খেলার উন্নয়নের চেয়ে লুটপাটে ব্যস্ত এই সংস্থার মানুষগুলো। রাজশাহীতে এ নিয়ে মামলাও চলছে। সাবেক সাধারণ সম্পাদক মামলা করেছেন বর্তমান সাধারণ সম্পাদকের বিপক্ষে। আবার বর্তমান কমিটির একজন মামলা করেছেন আগের সাধারণ সম্পাদকের বিপক্ষে। খেলাটা তাই মাঠের চেয়ে কোর্টেই বেশি জমজমাট!

প্রশ্ন : সিটি ক্লাবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলছিলেন। জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য পাওয়া কোনো খেলোয়াড় তৈরি করতে পেরেছেন এখান থেকে?

মোশাররফ হোসেন : রাজশাহী থেকে জাতীয় পর্যায়ে ভালো করা অনেকেই আমার হাতে গড়া। তাদের মধ্যে আলাদা করে বলতে হয় জাহাঙ্গীর আলমের কথা। বর্তমান হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন ও। গিরগিরি হাজদা, শাখাওয়াত হোসেনরাও ভালো করেছে জাতীয় বক্সিংয়ে। এই তরুণদের উৎসাহে ভাটা পড়েছে গত এশিয়াডে বক্সিংয়ের কাউকে দক্ষিণ কোরিয়া না পাঠানোয়। এভাবে বক্সিং থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া হলে খেলাটাই না স্থবির হয়ে পড়ে। আমার মতো কোনো মোশাররফ হয়তো তখন নাওয়া-খাওয়া ভুলে আর পড়ে থাকবে না বক্সিং রিংয়ে।

প্রশ্ন : বুঝতে পারছি বারবার স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে আপনার। তার পরও শেষ করতে চাই আপনার কোনো স্বপ্ন দিয়ে...

মোশাররফ হোসেন : আমার প্রথম স্বপ্ন ছেলের উন্নত চিকিৎসা করা। বুঝতেই পারছেন, কেউ এগিয়ে না এলে পূরণ হওয়ার নয় এটা। আরেকটা স্বপ্ন আছে বক্সিং একাডেমি করার। পদ্মা পাড়ের রাজশাহী অঞ্চলের ছেলেমেয়েদের শারীরিক গড়ন অসাধারণ। একটু চর্চা পেলে ভালো মানের অনেক বক্সার তৈরি করা সম্ভব এখান থেকে। মনে হয় না এই স্বপ্নও পূরণ হবে কোনো দিন।

 

 



মন্তব্য