kalerkantho

নিউজিল্যান্ডে মসজিদে হামলা নিয়ে বিশেষ আয়োজন

শান্তির দেশে রক্তের দাগ

ড. মুহাম্মদ সাদিক হুসাইন

২২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



শান্তির দেশে রক্তের দাগ

আল নূর মসজিদ, নিউজিল্যান্ড

শান্তির দেশ হিসেবে খ্যাত নিউজিল্যান্ড। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে অবস্থিত আন নূর মসজিদ ও লিনউড মসজিদে গত ১৫ মার্চ স্মরণকালের ভয়াবহতম সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় হতবাক গোটা পৃথিবী। শোকে মুহ্যমান মুসলিম বিশ্ব। আল্লাহর পবিত্র ঘর মসজিদে এমন নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড শুধু নিউজিল্যান্ডে নয়; পৃথিবীতেই বিরল। উগ্র বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসীর এ হামলায় পাঁচ বাংলাদেশিসহ ৫০ জন মুসল্লি নিহত হয়েছেন। গুরুতর আহত হয়েছেন ৬০ জন। অল্পের জন্য বেঁচে যান বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সদস্যরা। তাঁরাও ওই মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করতে যাচ্ছিলেন। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া এরই মধ্যে জানিয়েছে, হতাহতদের মধ্যে এসব দেশের নাগরিকও রয়েছেন।

সদিচ্ছা থাকলে এই হামলা ঠেকানো যেত!

বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে, হামলাকারী দুই বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটা ন্যক্কারজনক আক্রমণের ঘোষণা দিয়ে আসছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, সামরিক পোশাক পরিহিত ওই লোক স্বয়ংক্রিয় বন্দুক দিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় গুলি ছোড়ে নিরীহ মুসল্লিদের ওপর এবং মাথার ওপর সেট করা ক্যামেরা দিয়ে পুরো হত্যাকাণ্ড সে লাইভ ভিডিও প্রচার করে। নিউজিল্যান্ডের গোয়েন্দা সংস্থা ‘উগ্র চরমপন্থীদের’ বিষয়ে তদন্ত করছে। কিন্তু হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির চরমপন্থা গোয়েন্দাদের কিংবা পুলিশের নজরেই আসেনি। ওই ব্যক্তি ২০১৭ সালে ইউরোপ ভ্রমণের পর থেকে এই হামলার পরিকল্পনা করছিল এবং সেখানকার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। ডেইলি মেইল জানায়, ২৮ বছর বয়সী হামলাকারী টুইটারে তার পরিচয় প্রকাশ করেছে। তার নাম ব্রেন্টন টারেন্ট বলে দাবি করা হয়েছে। সে অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের গ্র্যাফটন এলাকার বাসিন্দা। এর আগে নিজের উদ্দেশ্য জানিয়ে হামলার এক ঘণ্টা আগে ৮৭ পৃষ্ঠার ‘দ্য গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট  টুওয়ার্ডস আ নিউ সোসাইটি’ শিরোনামে একটি ‘ম্যানিফেস্টো’ প্রকাশ করে। এখানে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, কোথায় গেল পশ্চিমাদের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান? কী জবাব দেবেন সারা জীবন মুসলমানদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের অভিযোগকারীরা? কোথায় ছিল নিউজিল্যান্ডের মতো একটি আধুনিক দেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাব্যবস্থা?

পৃথিবী নতুন নিউজিল্যান্ড আবিষ্কার করল!

নিউজিল্যান্ডকে বিশ্বের অন্যতম শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ দেশ হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০০৩ সালে পরিচালিত আদমশুমারিতে দেখা যায়, প্রায় ৪৬ হাজার মুসলিম বসবাস করে নিউজিল্যান্ডে, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার  এক শতাংশ। জরিপে আরো দেখা যায়, ২০০৬ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত মুসলমানদের সংখ্যা ২৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তার মধ্যে এক-চতুর্থাংশের জন্ম নিউজিল্যান্ডে।

নিউজিল্যান্ডে বসবাসরত মুসলমানরা এমন ভয়াবহ ঘটনা কখনো প্রত্যক্ষ করেনি। ঘটনার আকস্মিকতায় তারা নির্বাক, শোকে বিহ্বল। টিভি চ্যানেল TVNZ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘ইসলামিক অ্যাসোসিয়েশন অব নিউজিল্যান্ড’-এর সভাপতি মোস্তফা ফারুক বলেন,

‘আমাদের উপলব্ধি ছিল, আমরা বিশ্বের নিরাপদতম দেশে বসবাস করছি। এমন একটি ঘটনা ঘটবে, তা কখনোই প্রত্যাশা করিনি আমরা। ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে এ দেশে মুসলমানরা বসবাস করে আসছে। এ ধরনের ঘটনা আর কখনোই ঘটেনি। নিউজিল্যান্ড সম্পর্কে আমরা যে ধারণা পোষণ করি, তাতে এ ঘটনা কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে না।’

নিউজিল্যান্ডে ইসলাম ও মুসলমান

১৮৭০ সালে দেশটিতে ইসলাম ধর্মের বিকাশ শুরু হয়। ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর ইউরোপ, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকাসহ নানা দেশের বহু মানুষ এখানে এসে বসতি স্থাপন করে। নিউজিল্যান্ড সরকারের হিসাব মতে, ১৯৫০ সালে নিউজিল্যান্ডে মুসলমান অধিবাসী ছিল মাত্র ১৫০ জন। ১৯৬০ সালে এ সংখ্যা উন্নীত হয় ২৬০-এ। অভিবাসী মুসলমানদের বড় আকারে বসতি স্থাপন শুরু হয় ১৯৭০ সালে। সে সময় ফিজি থেকে আসা ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলমানরা নিউজিল্যান্ডে বসতি স্থাপন শুরু করে। তাদের অনুসরণ করে ১৯৯০ সালের মধ্যে যুদ্ধবিধ্বস্ত অনেক দেশের উদ্বাস্তু মুসলমানরা পাড়ি জমায় নিউজিল্যান্ডে। এর পর থেকেই নিউজিল্যান্ডে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকে।

বর্তমানে নিউজিল্যান্ডে মুসলমানের সংখ্যা প্রায় লাখের কাছাকাছি। ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন করে এ দেশে এসেছেন—এমন অনেক যোগ্য ও অভিজ্ঞ আলেমও রয়েছেন দেশটিতে। তাঁরা নিউজিল্যান্ডে ইসলাম প্রচার ও সেখানকার মুসলিমদের ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করার পেছনে দিন-রাত শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন।

ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রেও মুসলমানরা এগিয়ে রয়েছে। নিউজিল্যান্ডের মুসলিম কমিউনিটিতে তাদের আবাসস্থল ঘেঁষে মসজিদগুলো গড়ে তোলা হয়েছে। মসজিদসংলগ্ন কমপ্লেক্সে শিশুদের প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া বেশ কিছু হিফজখানাও গড়ে উঠেছে। কয়েকটি মসজিদের উদ্যোগে ‘সানডে স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ছুটির দিন তাতে শিশুদের দিনব্যাপী ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হয়। মুসলমানরা নিউজিল্যান্ডে শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করলেও ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে ভয়াবহ হামলা তাদের মধ্যে আতঙ্ক ও ভয় সৃষ্টি করেছে।

শান্তিপূর্ণ দেশে এই আক্রমণ কেন?

নিউজিল্যান্ডকে শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে ধরা হলেও ইউরোপ বর্ণবাদ ও খ্রিস্টবাদ থেকে বের হতে পারেনি। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মুসলমানদের ক্রমবৃদ্ধি ও অগ্রযাত্রা পশ্চিমাদের মনে ইসলামভীতি জাগিয়ে তুলছে। তাই এই হামলার পেছনে রয়েছে ইসলামফোবিয়া বা ইসলামভীতি। ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোতে যে হারে শান্তির ধর্ম ইসলামের প্রসার-প্রচার ঘটছে, তাতে রীতিমতো তারা আতঙ্কিত। ফলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের হামলার প্রধান টার্গেটে পরিণত করা হয়েছে। অথচ দুঃখের বিষয় হলো, এমন পরিস্থিতিতেও আমরা মুসলমানরা জাতি হিসেবে নির্বিকার, চৈতন্যশূন্য ও কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়ে পড়েছি। পার্থিব ক্ষমতা, মর্যাদা ও সম্পদের মোহে আমাদের মুসলিম দেশগুলোর বেশির ভাগ ক্ষমতাবানই মেরুদণ্ডহীন। তাঁরা কোনো না কোনোভাবে অন্যান্য জাতির ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। রাসুল (সা.) অনেক আগেই উম্মতকে এ ব্যাপারে সতর্ক করে গেছেন। তিনি বলেন, “অচিরেই বিভিন্ন জাতি তোমাদের ওপর এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়বে, যেভাবে ভোজনবিলাসীরা খাবারপাত্রের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা কি সেদিন সংখ্যায় অল্প হব? তিনি জবাব দেন, না; বরং তোমরা সেদিন সংখ্যায় বেশি থাকবে। কিন্তু তোমাদের অবস্থান হবে বন্যার খড়কুটোর মতো। আল্লাহ তাআলা তোমাদের শত্রুদের অন্তর থেকে তোমাদের ভয়ভীতি ছিনিয়ে নেবেন এবং তোমাদের অন্তরে ‘ওয়াহন’ সঞ্চার করে দেবেন। ব্যক্তিটি আবার জিজ্ঞেস করল, ‘ওয়াহন’ কী? রাসুল (সা.) উত্তর দেন, ‘তা হলো দুনিয়াপ্রীতি ও মৃত্যুর প্রতি অনীহা’।” (আবু দাউদ)

পরিশেষে, নিউজিল্যান্ডের মসজিদে পরিচালিত এ নৃশংস হামলায় আমরা গভীরভাবে শোকাহত। পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলমানের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে আমরাও ধিক্কার জানাচ্ছি এই হিংস্র ঘটনার। প্রাচ্য থেকে প্রতীচ্য বিস্তীর্ণ পৃথিবীজুড়ে উম্মাহর হৃদয় আজ রক্তের দাগে লাল। রক্তের ফোঁটা ছড়িয়ে পড়ছে পৃথিবীজুড়ে। তবে বর্বর এই ঘটনায় প্রমাণিত হলো, সত্যের সামনে ওরা আসলেই অসহায়। এ হামলার মাধ্যমে পৃথিবী দেখল ইসলামফোবিয়ার নগ্নরূপ।

লেখক : কর্মকর্তা, বাংলাদেশ দূতাবাস

রিয়াদ, সৌদি আরব।

মন্তব্য