kalerkantho


কলেজে ‘ইসলাম শিক্ষা’ ঐচ্ছিক, কমছে ছাত্রসংখ্যা

মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ

১৮ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



কলেজে ‘ইসলাম শিক্ষা’ ঐচ্ছিক, কমছে ছাত্রসংখ্যা

বাংলাদেশ মুসলিম অধ্যুষিত একটি দেশ। ঐতিহ্যগতভাবে এ দেশের মানুষ ধর্মভীরু। তাই মুসলমনাদের সন্তানরা তাদের শিক্ষা-দীক্ষা ও সংস্কৃতিতে ইসলামকে জানা ও শেখার সুযোগ পাবে—এটাই স্বাভাবিক। বর্তমানে উপমহাদেশে ব্রিটিশদের প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থা চালু থাকলেও খ্রিস্টান ব্রিটিশরা এই ইসলাম শিক্ষার তাগিদ উপেক্ষা করতে পারেনি। ফলে শত বছর ধরে স্কুল ও কলেজে নতুন বহু বিষয়ের পাশাপাশি ‘ইসলাম শিক্ষা’ও পাঠ করার ব্যবস্থা ছিল। পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থার কারণে এখন আর আগের মতো মক্তবকেন্দ্রিক ধর্মীয় শিক্ষার রেওয়াজ নেই। ফলে মুসলমানদের সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগ সীমিত। বিশেষত, বেশির ভাগ শিশু যেহেতু স্কুল-কলেজে পড়ে, তাই তাদের জন্য স্কুল-কলেজ ছাড়া ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগ নেই বললেই চলে।

স্কুল-কলেজে ইসলাম শিক্ষা পড়ানোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে অনুকরণীয় মুসলমানের মতো জীবনযাপনের জন্য তৈরি করা হয়। অবাধ্য যৌবনের দুরন্তপনায় যেন নতুন প্রজন্ম অনাচার, অপরাধ ও মাদকের ছোবলে শেষ না হয়ে যায়, এ জন্যই প্রয়োজন ইসলাম শিক্ষা। এতে ইসলামের বিশ্বাস ও প্রায়োগিকতা এবং ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক ইবাদতের গুরুত্ব সম্পর্কিত বিষয় শিক্ষার্থী আত্মস্থ করতে পারে। ঈমান-আমল, ইবাদত ও আখলাকের সুস্পষ্ট ধারণা সহজ-সাধারণ সিলেবাসে শিক্ষা দিলে শিক্ষার্থী তার পরিবার, সমাজ ও জাতির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করে সহজেই ভালো-মন্দ ও ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য বুঝতে পারে। এতে শিক্ষার্থীর নৈতিক ভিত্তি দৃঢ় হয়।

প্রত্যেক মুসলমানের জন্য কতগুলো বিষয়ে জ্ঞানার্জন জরুরি। এ বিষয়গুলোর সঙ্গে বিশ্বাস ও কর্মের সম্পর্ক রয়েছে। এ জন্যই স্কুল থেকে শুরু করে কলেজ পর্যায়, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে ইসলাম শিক্ষার সিলেবাস এমনভাবে প্রণীত হয়েছে, যেন একজন শিক্ষার্থী তাওহিদ, রিসালাত, আমল, ইবাদত ও আখলাক সম্পর্কে অনুশীলনের দক্ষতা অর্জন করে।

কিন্তু বর্তমানে এই স্বতঃসিদ্ধ বিষয় ঐচ্ছিক করা হয়েছে। কলেজ পর্যায়ে ‘ইসলাম শিক্ষা’ সম্পর্কে সর্বসাধারণের ধারণা যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। অনেকে মনে করেন, এটা আরবি ভাষা-সাহিত্যের মতো কিছু, কারো কারো কাছে ইসলাম শিক্ষা হয়তো ইসলামী ইতিহাসের মতো মুখস্থনির্ভর বিষয়। আসলে ইসলাম শিক্ষা এমন কিছুই নয়। বরং ইসলাম শিক্ষা হলো সহজে প্রকৃত ইসলাম বোঝার একটি অনন্য উপায় এবং আদর্শ মানুষ তথা মুসলমান হওয়ার মাধ্যম। ইসলাম শিক্ষা সাধারণ শিক্ষিত মানুষের জন্য দুনিয়ায় শান্তি ও পারলৌকিক মুক্তির পথ দেখায়।

আশ্চর্য হলো, কলেজ পর্যায়ে ইসলাম শিক্ষা পড়ার সুফল সম্পর্কে অনেকের ধারণাই নেই। অনেকে মনে করে, ইসলাম সম্পর্কে জানতে হলে আরবি জানতে হয়, পড়তে হয় মাদরাসায়। অথচ কলেজে ইসলাম শিক্ষার মাধ্যমে বাংলা ভাষায় ইসলামের মৌলিক বিষয়াদিসহ পবিত্র কোরআন, হাদিস, ইজমা, কিয়াস ও ফিকহশাস্ত্র সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান লাভ করা সম্ভব। এ শিক্ষা আলেম হওয়ার বিকল্প উপায় নয়; বরং আদর্শ মুসলমান ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হওয়ার পথ প্রশস্ত করে।

কয়েক বছর আগেও স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের রেজাল্ট জিজ্ঞেস করলে অনেকেই বলতেন সেকেন্ড ডিভিশন, ইসলাম শিক্ষায় লেটার। অথচ নব্বইয়ের দশকে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। এখন অনেকেই ইসলাম শিক্ষাকে ভয় পায়। দুঃখজনক হলেও সত্য, ইসলাম শিক্ষায় ভালো না করায় অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর গোল্ডেন বা এ প্লাস ছুটে যাচ্ছে। ইসলাম শিক্ষার এ অবস্থার কারণ, ইসলাম শিক্ষার গুরুত্ব কমে যাওয়া। অথচ বাংলাদেশে ইসলাম শিক্ষার সোনালি অতীত রয়েছে। এই কলেজ পর্যায়ে ইসলাম শিক্ষাই ছিল মুখ্য। এর সঙ্গে ইংরেজি ও অন্য বিষয় যুক্ত করা হয়। বর্তমানে অজ্ঞাত কারণে পরিস্থিতি ঠিক এর উল্টো।

১৯১৪ সালে শামসুল উলামা অধ্যক্ষ আবু নসর ওয়াহিদের নেতৃত্বাধীন মোহামেডান এডুকেশন অ্যাডভাইজারি কমিটি ওল্ড স্কিম ও নিউ স্কিম দুই ধরনের মাদরাসা শিক্ষা পদ্ধতির ধারণা দেন। এই নিউ স্কিম পদ্ধতিতে জুনিয়র ও সিনিয়র দুই ধারার শিক্ষাব্যবস্থাকে কেন্দ্র করেই মুসলমানদের জন্য বিশেষায়িত স্কুল-কলেজ সৃষ্টি হয়। ওই সব স্কুল-কলেজে আরবি ও ইসলাম শিক্ষার পাশাপাশি ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক ছিল। তখন আরবি ও ইসলাম শিক্ষাকে একত্রে বলা হতো ‘দ্বিনিয়াত’, পরবর্তী সময়ে ‘ইসলামিয়াত’। বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে বলা হতো ‘অ্যারাবিক অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ’, যা পরবর্তী সময়ে আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ দুটি আলাদা বিষয় হয়। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে বলা হতো ‘ইসলাম শিক্ষা’। এখন স্কুলে বিষয়টির নাম ‘ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা’।

নবাব সলিমুল্লাহ ও বিশিষ্ট মুসলিম নেতাদের প্রচেষ্টায় ১৯২১ সালে তিনটি অনুষদ ও ১২টি বিভাগ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রাকালেই ছিল ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি বিভাগ। এ জন্যই তৎকালীন কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীরা বলতেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়; বরং মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়!

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলাম শিক্ষা সগৌরবে স্থান করে নিয়েছিল আমাদের স্বতন্ত্র জাতীয় অস্তিত্ব, স্বাধীন পরিচিতির অপরিহার্যতা বিবেচনায়। বিশেষত, একই সঙ্গে মুসলিম ও বাঙালি পরিচয়ের তাগিদে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক তাঁর রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতায় মসজিদ-মাদরাসার বাইরে ইসলাম শিক্ষার শুভ সূচনা ঘটান। ফলে স্কুল-কলেজে ইসলাম শিক্ষার ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হয়। এতে অসংখ্য আলেম-উলামারও কর্মসংস্থান হয়। ব্রিটিশ ভারতে ‘মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনে’র অন্যতম সংগঠন ছিলেন শেরেবাংলা। ১৯২৪ সালে ছয় মাসের জন্য তিনি শিক্ষামন্ত্রী হন। তিনিই মুসলিম ‘এডুকেশন ফান্ড’ গঠন করে ছাত্রবৃত্তি প্রবর্তন করেন। পরবর্তী সময় হক সাহেব মুসলমান শিক্ষার্থীর স্বার্থে বাংলায় পৃথক মুসলিম শিক্ষা পরিদপ্তর গঠন করলেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুসলমান শিক্ষার্থীর জন্য আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করলেন। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক বাংলায় মুসলমান শিক্ষার্থীর জন্য কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ (বর্তমানে মওলানা আজাদ কলেজ), লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজ কলকাতা, বরিশালের চাখারে ওয়াজিদ মেমোরিয়াল গার্লস হাই স্কুল, চাখার কলেজসহ অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

আমি কলেজে ২৬ বছর ‘ইসলাম শিক্ষা’ বিষয়ে অধ্যাপনা করাচ্ছি। কিন্তু ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে চালু হওয়া বিষয় কাঠামো নিয়ে শঙ্কায় আছি, তবে কি আস্তে আস্তে বিষয়টি বিলুপ্ত হয়ে যাবে? নীতিমালা অনুযায়ী বাংলা, ইংরেজি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি—এ তিনটি বিষয় সব শাখার জন্য বাধ্যতামূলক এবং মানবিক শাখার বিষয়বিন্যাস হলো—

অনুরূপ বিন্যাসের সুবাদে ‘ইসলাম শিক্ষা’ স্রেফ ঐচ্ছিক বিষয়। এতে আশঙ্কাজনক হারে বিষয়টিতে ছাত্রসংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে, ফলে হয়তো আপনা থেকে তা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার জন্য আর কিছুই করতে হবে না! দুঃখজনক হলো, ২০১২-২০১৩ শিক্ষবর্ষেও বিষয়টি (‘ক’, ‘খ’ গুচ্ছবিন্যাস অনুসারে) তৃতীয় বা চতুর্থ হিসেবে নেওয়ার সুযোগ ছিল।

অভিজ্ঞতায় দেখেছি, আগে সব গ্রুপেই সবাই বিষয়টি নিত, ফলে ১৯৯৮ বা আরো আগ থেকে বিষয়টি আবশ্যিকের গুরুত্ব রাখত। কিন্তু এ সুযোগ সংকুচিত হতে হতে প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে!

এখন ইসলাম শিক্ষার মতো তত্ত্বীয় বিষয়ের চেয়ে ব্যাবহারিক সংশ্লিষ্ট বিষয়ের প্রতি শিক্ষার্থীর ঝোঁক। এটি শুধু বেশি নম্বরের আশায়। এখানে আবেগ-অনুভূতির চেয়ে বাস্তবতাই বিবেচ্য। অন্যদিকে যে বিষয়গুলো মানবিক শাখার জন্য আবশ্যিক, তার প্রায় সবই আবার ঐচ্ছিক হিসেবেও নেওয়ার সুযোগ রয়েছে! এতে মানবিক শাখার যারা কম মেধাবী, তাদের পক্ষে সহজ বিষয় নিয়ে সহজে ভালো ফলের পথও রুদ্ধ হয়ে যায়।

কলেজ থেকেই যদি ইসলাম শিক্ষার শিক্ষার্থীর জোগান ঠিক না থাকে, তাহলে অচিরেই বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা হারিয়ে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। ইসলাম শিক্ষার মতো জীবনঘনিষ্ঠ, জনপ্রিয় বিষয় উচ্চ মাধ্যমিকে ঐচ্ছিক হওয়ার সুবাদে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে অনাগ্রহ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি আবশ্যিক বিষয়গুলোতে ভর্তিযুদ্ধে অসম প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঐচ্ছিক হওয়ার ফলে ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে ‘অধ্যাপনা’কে পেশা হিসেবে গ্রহণের সুযোগও শেষ বা সীমিত হচ্ছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, ধর্মমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সবিনয় অনুরোধ, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ‘ইসলাম শিক্ষা’ সব গ্রুপের সবাইকে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক অথবা ন্যূনতম আগের নিয়মে ‘খ’ গুচ্ছ হিসেবে তৃতীয় বা চতুর্থ বিষয় হিসেবে নেওয়ার সুবিধা বহাল রাখা হোক।

ইসলামী শিক্ষার প্রসারে বর্তমান সরকার অত্যন্ত আন্তরিক। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, নিতান্তই ভুলবশত ইসলাম শিক্ষা ঐচ্ছিক করা হয়েছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় ইসলাম শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই এবং তা বাধ্যতামূলক হওয়াই জরুরি ও সময়ের দাবি।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান

ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর।



মন্তব্য