kalerkantho


মুতাজিলা সম্প্রদায়ের ভিন্নমত

মাওলানা জসিম শফিক   

৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



(গত সংখ্যার পর)

মুতাজিলা সম্প্রদায়ের মূলনীতি পাঁচটি। মতবাদগুলো হলো—এক. তাওহিদ। মুতাজিলা সম্প্রদায় আল্লাহর গুণাবলি অস্বীকার করে। তারা মনে করে, আল্লাহর গুণাবলি স্বীকার করলে আল্লাহর গুণাবলিকেও আল্লাহর সত্তার মতো চিরন্তন সাব্যস্ত করতে হয়, ফলে চিরন্তন সত্তার একাধিকত্ব অবধারিত হয়ে

যায়।

দুই. আদল। এর অর্থ ইনসাফ। মুসলমান মাত্রই আল্লাহ তাআলাকে ন্যায়পরায়ণ বলে জানেন, আল্লাহর ন্যায়পরায়ণ হওয়ার ব্যাপারে মুতাজিলা সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। তাদের বক্তব্য হলো, আল্লাহ ন্যায়পরায়ণ বলে পাপীকে শাস্তি দেওয়া ও নেককারকে সওয়াব দেওয়া আল্লাহর জন্য অপরিহার্য। তাই তিনি কোনো অন্যায়ের ইচ্ছা করেন না, আদেশও দেন না। আল্লাহর জন্য বৈধ নয় যে তিনি কোনো অন্যায়ের আদেশ দেবেন, অতঃপর বান্দাকে সে অন্যায়ের কারণে শাস্তি দেবেন। কেননা এমন করা ইনসাফ পরিপন্থী। এ ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের বক্তব্য হলো, আল্লাহ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। অতএব, তিনি যেমন ইচ্ছা তেমন আদেশ করেন, যেমন ইচ্ছা তেমন হস্তক্ষেপ করবেন, তাঁর আদেশে বাধা দেওয়ার কেউ নেই। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ যা চান, তা-ই করেন। (সুরা : হজ, আয়াত : ১৮)

তিন. আল ওয়াদু ওয়াল ওয়ায়িদ। আল-ওয়াদু হলো প্রতিশ্রুতি আর আল ওয়ায়িদ অর্থ ভয় প্রদর্শন। মুতাজিলা সম্প্রদায়ের এই আকিদার মূল কথা হলো, আল্লাহ তাআলা ভালো কাজের জন্য সওয়াবের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং খারাপ কাজের জন্য যে শাস্তির ভয় প্রদর্শন করেছেন, তা কার্যকর করা আল্লাহর জন্য অপরিহার্য। সুতরাং আল্লাহ তাআলা যাকে ইচ্ছা তাকে ক্ষমা করতে পারবেন না। নেককারকে সওয়াব দেওয়া এবং কবিরা গুনাহকারীকে শাস্তি দেওয়া আল্লাহর জন্য অপরিহার্য। এ প্রসঙ্গে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের বক্তব্য হলো, আল্লাহ তাআলার ওপর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা ওয়াজিব নয়, কারণ আল্লাহর ওপর বান্দার কোনো অধিকার নেই। তবে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা আল্লাহর বিশেষত্ব। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ওয়াদার খেলাফ করেন না।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ৩১)

তেমনিভাবে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়াও আল্লাহর জন্য জরুরি নয়। একই কারণে তারা মনে করে, কবিরা গুনাহকারীর ক্ষেত্রে কারো শাফায়াত গ্রহণ করা হবে না; কিন্তু আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের রায় হলো, কবিরা গুনাহকারীর জন্য শাফায়াত গ্রহণযোগ্য। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন, ‘নবীদের সুপারিশ সত্য। এবং গুনাহগার মুমিন ও কবিরা গুনাহকারীর জন্যও মহানবী (সা.)-এর শাফায়াত প্রমাণিত সত্য।’ (আল ফিকহুল আকবার, পৃষ্ঠা ৪১)

চার. আল মানজিলাহ বাইনাল মানজিলাতাইন। এর অর্থ দুই স্তরের মধ্যবর্তী স্তর। মুতাজিলাদের মতে, কবিরা গুনাহকারী মুমিনও নয়, কাফিরও নয়। সে ঈমান ও কুফরের মধ্যবর্তী। তাই দুনিয়ায় সে মুমিন বা কাফির নয়, বরং ফাসিক। এবং আখিরাতে সে চিরস্থায়ী জাহান্নামে যাবে। তবে তার শাস্তি অন্য জাহান্নামিদের থেকে হালকা হবে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো, কবিরা গুনাহকারী মুমিন। তবে তার ঈমান অসম্পূর্ণ। সে চিরকাল জাহান্নামে থাকবে না। তার বিষয়টা আল্লাহর ইচ্ছাধীন। তিনি চাইলে ক্ষমা করে দেবেন, আবার চাইলে অপরাধ অনুপাতে শাস্তি দেবেন। তারপর জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন। চিরকাল সে জাহান্নামে থাকবে না। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে শরিক করে। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। আর যে ব্যক্তি অংশীদার সাব্যস্ত করল আল্লাহর সঙ্গে, সে যেন অপবাদ আরোপ করল।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৪৮)

পাঁচ. আল আমর বিল মারুফ ওয়ান নাহয়ু আনিল মুনকার। মুতাজিলা সম্প্রদায়ের আকিদা হলো, সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো কাজের নির্দেশ প্রদান এবং অন্যায় কাজ থেকে বারণ করা ওয়াজিব। মৌলিকভাবে তাদের এই মতবাদের সঙ্গে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের বিরোধ নেই। কারণ ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে বারণ করা সব মুসলমানেরই মৌলিক দায়িত্ব। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত, যারা আহ্বান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভালো কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে; আর তারাই হলো সফলকাম।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১০৪)

তবে পার্থক্য এটুকু যে তারা বলে, ওয়াজিব বা অপরিহার্য কাজের আদেশ করাও অপরিহার্য এবং মোস্তাহাব কাজের আদেশ করা মোস্তাহাব। তবে মন্দ কাজে বারণ করা ওয়াজিব। কিন্তু আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের বিশ্বাস হলো, সামর্থ্য অনুসারে সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে বারণ করা সর্বক্ষেত্রেই জরুরি। (সমাপ্ত)

লেখক : বিশেষ প্রতিনিধি, ডেইলি ইসলামবিডি ডটকম



মন্তব্য