kalerkantho


মোসাফাহার সৌন্দর্য ও সৌকর্য

মুফতি আরিফুর রহমান   

৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



মোসাফাহার সৌন্দর্য ও সৌকর্য

‘মোসাফাহা’ শব্দের অর্থ হাত ধরা ও হাতের তালু হাতের তালুর সঙ্গে মিলিত করা। (আল কামুসুল মুহিত : ১/৯২)। ইবনে মানজুরের মতে, মোসাফাহা হলো, হাত মিলিত করা। (লিসানুল আরব : ২/৫১২)

ইসলামী শরিয়ত মতে, মোসাফাহা হলো পরস্পর দুই হাত মেলানো। ইমাম বুখারি (রহ.) তাঁর সুবিখ্যাত হাদিসগ্রন্থে একটি অধ্যায়ের শিরোনাম করেছেন—‘বাবুল আখজি বিল ইয়াদাইন।’ অর্থাৎ ‘উভয় হাত মেলানো সম্পর্কে অধ্যায়।’ (সহিহ বুখারি : ৫/২৩১১, হাদিস নম্বর : ৫৯০৯)

এ কথা লেখার পর তিনি উল্লেখ করেছেন যে হাম্মাদ বিন জায়েদ (রহ.) ইবনে মোবারক (রহ.)-এর সঙ্গে উভয় হাতে মোসাফাহা করেছেন। এর মাধ্যমে জানা যায়, দুই হাতে মোসাফাহা করা সুন্নত। অন্যদিকে উপমহাদেশে ইংরেজদের আমলে এক হাতে মোসাফাহার প্রচলন শুরু হয়। কালক্রমে এই রীতি মুসলমানদের মধ্যে ঢুকে গেছে। এটি করমর্দন হতে পারে—মোসাফাহা নয়। উভয় হাতে মোসাফাহা সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে পূর্ণ সনদসহ বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে তাশাহুদ শিখিয়েছেন। এমতাবস্থায় আমার হাত তাঁর উভয় হাতের মাঝামাঝি ছিল। (সহিহ বুখারি : ২/৯২৬, হাদিস নম্বর : ৫৯১০, সহিহ মুসলিম : ১/১৭৩, সুনানে নাসায়ি : ১/১৭৫)

তবে মনে রাখতে হবে, মোসাফাহা করার পর হাত চুম্বন করা মাকরুহে তাহরিমি (নিষিদ্ধ পর্যায়ের অপছন্দনীয় কাজ)। একই বিধান বুকে লাগানোর। অর্থাৎ মোসাফাহা করে বুকে হাত লাগানো যাবে না। কেননা এসবের কোনো প্রমাণ নেই। তাই এসব পরিত্যাজ্য। এ বিষয়ে ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়ায় এসেছে : ‘অজ্ঞরা যা করে থাকে যেমন—অন্যের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় হাতে চুমু খায়, এটা মাকরুহ। এ বিষয়ে সবাই একমত।’ (ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ৫/৩৬৯)

কিন্তু মোসাফাহা করার পর এমনিতেই যদি হাত বুকের সঙ্গে লাগায় এবং এটাকে সাওয়াবের কাজ বা সুন্নত মনে না করে, তাহলে এটি বিদআত হবে না এবং হারাম বা নাজায়েজ হবে না। তবে যদি সাওয়াবের কাজ মনে করে বা সুন্নত মনে করে কিংবা এটিকে মোসাফাহাসংশ্লিষ্ট সুন্নত মনে করে, তাহলে তা বিদআত হবে। আর প্রতিটি বিদআতই ভ্রষ্টতা। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আমাদের দ্বিনের মধ্যে যে ব্যক্তি নতুন বিষয় আবিষ্কার করে—যা তাতে নেই, তাহলে তা পরিত্যাজ্য।’ (আবু দাউদ, হাদিস নম্বর : ৪৬০৮, বুখারি, হাদিস নম্বর : ২৫৫০)

আরো একটি বিষয় এখানে পরিষ্কার হওয়া দরকার। বিষয়টি হলো, আজনবি বা গাইরে মুহাররম (যাদের সঙ্গে বিবাহ হারাম নয়) নারীর সঙ্গে মোসাফাহার বিধান কী? এ ক্ষেত্রে হানাফি মাজহাবের ফতোয়া হলো, নারী-পুরুষ যুবক শ্রেণির হলে তাদের পরস্পর মোসাফাহা বৈধ নয়। আর যদি উভয়ে বৃদ্ধ হয় এবং তারা নিজেদের ব্যাপারে নিরাপদ থাকে, তাহলে তাদের পরস্পরে মোসাফাহা বৈধ। যদি একজন যুবক ও অন্যজন বৃদ্ধ হয়, তাহলে নিজেদের ব্যাপারে নিরাপদ হওয়ার শর্তে মোসাফাহা বৈধ। তবে সর্বাবস্থায় নিজেদের ব্যাপারে ফিতনা থেকে নিরাপদ না হলে গাইরে মুহাররম নারী-পুরুষের মোসাফাহা বৈধ নয়। (দেখুন : বাদায়েউস সানায়ে : ৪/২৯৩; আল বাহরুর রায়েক : ৮/২১৮)

অতিশয় বৃদ্ধ নারী-পুরুষের মোসাফাহা বৈধ হওয়ার ক্ষেত্রে হানাফি মাজহাবের দলিল হলো, আবু বকর (রা.) থেকে প্রমাণিত যে তিনি বয়োবৃদ্ধ নারীদের সঙ্গে মোসাফাহা করতেন। (আল বাহরুর রায়েক : ৮/২১৯)

একইভাবে ইবনে জুবাইর (রা.) থেকেও বিষয়টি প্রমাণিত। (নাসবুর রায়া : ৪/৩০৯, নম্বর : ১৫)

ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর মতে, দুটি শর্তে গাইরে মুহাররম নারী-পুরুষের মোসাফাহা বৈধ। এক. উভয়ে ফিতনা থেকে নিরাপদ হতে হবে। দুই. হাতে কোনো কাপড় বা আবরণ থাকতে হবে। (আল মাজমু : ৪/৬৩৫)

মালেক (রহ.)-এর দৃষ্টিতে নারী-পুরুষের মোসাফাহা কোনো অবস্থাতে বৈধ নয়। (আল ফাওয়াকিহ : ২/৩২৫)

ইমাম আহমদ (রহ.)-এর মাজহাবে তিনটি অভিমত পাওয়া যায়। এক. হারাম। দুই. মাকরুহে তাহরিমি। তিন. বৃদ্ধদের সঙ্গে বৈধ। (আল ইকনা : ৩/১৫৬)

মূল কথা হলো, বয়োবৃদ্ধ নারী-পুরুষের ক্ষেত্রেও বিনা প্রয়োজনে মোসাফাহা করা অনুচিত। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আমি নারীদের সঙ্গে মোসাফাহা করি না।’ (নাসায়ি : ৭/১৪৯)

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, ‘মহানবী (সা.) বাইআত গ্রহণের সময় কখনো কোনো নারীর হাতের সঙ্গে তাঁর হাত স্পর্শ করেননি। তিনি নারীদের মৌখিকভাবে বাইআত করতেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৪৬০৯) তবে শর্ত সাপেক্ষে এর অবকাশ আছে।

লেখক : বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ



মন্তব্য