kalerkantho


ইসলামে ‘খোলা’ তালাকের বৈধতা

মুফতি মাহমুদ হাসান

১৯ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



ইসলামে ‘খোলা’ তালাকের বৈধতা

[গত ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকমে ‘তালাক বাড়ছে-শরিয়া কী বলে’ শিরোনামে একটি লেখা ছাপা হয়েছে। লেখাটিতে তালাক নিয়ে অপব্যাখ্যামূলক কথাবার্তা রয়েছে। এবং ‘খোলা’ তালাকের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আশ্চর্য হলো, এর জন্য কোরআন-হাদিসের কিছু জায়গা নিজের মতো করে উদ্ধৃত করা হয়েছে। পুরো লেখাটিতে রয়েছে তথ্যবিভ্রাট ও উদ্ধৃতির বিকৃত ব্যবহার, যা সাহাবায়ে কেরাম, তাবেইন, তাবেতাবেইন, তাফসিরবিদ ও ফিকাহবিদদের ব্যাখ্যাবিরোধী। আমরা মনে করি, লেখাটি অপরিপক্ব ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। দৈনিক কালের কণ্ঠে গত সংখ্যায় তালাকের অথরিটি ও বিধি-বিধান নিয়ে একটি লেখা ছাপা হয়েছে। এ সংখ্যায় ‘খোলা’ তালাকের বৈধতা নিয়ে ইসলামের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। (বি. স.)]

‘খোলা’ তালাক বলা হয় স্ত্রী থেকে স্বামী বিনিময় গ্রহণ করে তাকে তালাক দেওয়া; কিন্তু পশ্চিমা মিডিয়া ও ইসলামবিদ্বেষীদের অসৎ প্রপাগান্ডায় বিভ্রান্ত কিছু মুসলমান ভাইও ইসলামের ‘খোলা’ তালাকের বৈধতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে থাকে। তাদের যুক্তি হলো, এতে নারীদের প্রতি বিরূপ আচরণ করা হয়েছে। কেননা স্বামী স্ত্রীকে তালাক দিতে স্ত্রীর সম্মতির প্রয়োজন নেই। তাহলে স্ত্রী তালাক নিতে স্বামীর সম্মতির প্রয়োজন কেন?

‘খোলা’ তালাকের ইসলামী বিধান

‘খোলা’ তালাকের প্রতি ইসলামী শরিয়ত কাউকে উদ্বুদ্ধ করে না। নির্দিষ্ট সময়ে বিশেষ প্রয়োজনে শর্ত সাপেক্ষে তা বৈধ। শর্ত পাওয়া না গেলে তালাকের বিনিময় গ্রহণ করা অবৈধ। ‘খোলা’ তালাকের বিধান হলো, যদি স্বামীর অন্যায় বা দোষের কারণে স্ত্রী তালাকের আবেদন করে, এ অবস্থায় তাকে তালাক দিতে স্বামী বিনিময় চাইতে পারবে না; বরং তা তার জন্য হারাম হবে। (ফাতহুল কাদির : ৩/২০৩, ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া : ১/৫১৫)

আর যদি স্ত্রীর সীমা লঙ্ঘন বা অন্যায়ের কারণে তালাক দিতে হয়, সে ক্ষেত্রে স্বামী তার থেকে তালাকের বিনিময় গ্রহণ করতে পারবে। উভয়ে সম্মতিক্রমে যে পরিমাণ বিনিময়ের ওপর একমত হবে, তা-ই নেওয়া বৈধ। তবে এ ক্ষেত্রেও বিনিময়টি বিয়েতে ধার্যকৃত মহরের বেশি না হওয়া উত্তম। (বাদায়েউস সানায়ে : ৩/১৫০, আলবাহরুর রায়েক : ৪/৮৩)

মহান আল্লাহ এ বিষয়ে কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনরা, তোমাদের জন্য হালাল নয় যে তোমরা জোর করে নারীদের (সত্তা বা সম্পদের) উত্তরাধিকারী হবে। আর তোমরা তাদের আবদ্ধ করে রেখো না—তাদের যা দিয়েছ, তা থেকে তোমরা কিছু নিয়ে নেওয়ার জন্য। তবে যদি তারা প্রকাশ্য অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৯)

মহান আল্লাহ অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘আর তোমাদের জন্য হালাল নয় যে তোমরা তাদের যা দিয়েছ, তা থেকে কিছু নিয়ে নেবে। তবে উভয়ে যদি আশঙ্কা করে যে আল্লাহর সীমারেখায় তারা অবস্থান করতে পারবে না। সুতরাং তোমরা যদি আশঙ্কা করো যে তারা আল্লাহর সীমারেখায় অবস্থান করতে পারবে না, তাহলে স্ত্রী যা দিয়ে নিজেকে মুক্ত করে নেবে, তাতে কোনো সমস্যা নেই।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২২৯)

আয়াতদ্বয় দ্বারা প্রমাণিত হয়, স্বামীর অন্যায় আচরণ বা কোনো দোষের কারণে যদি স্ত্রী ন্যায়সংগতভাবে স্বামীর থেকে তালাকের আবেদন করে, সে ক্ষেত্রে স্বামীর উচিত হলো, কোনো বিনিময় ছাড়াই তালাক দিয়ে দেওয়া। এ অবস্থায় যদি সে বিনিময় দাবি করে, তাহলে তা তার জন্য অবৈধ হবে। আর যদি স্ত্রী প্রকাশ্যে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয়—অর্থাৎ স্ত্রী দোষী হয়, এ অবস্থায় স্বামী তাকে তালাক দেওয়ার সময় তার থেকে ন্যায্য বিনিময় দাবি করতে পারবে। এটিই ‘খোলা’ তালাক। (আহকামুল কোরআন : ২/৮৯)

হাদিস শরিফে খোলা তালাক

একাধিক হাদিসে ন্যায়সংগত ও ন্যায্য ‘খোলা’ তালাকের বিনিময়ের বৈধতার প্রমাণ পাওয়া যায়। যথা—এক. ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, সাবিত ইবনু কায়সের স্ত্রী নবী করিম (সা.)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! চরিত্রগত বা দ্বিনি বিষয়ে সাবিত ইবনু কায়সের ওপর আমি দোষারোপ করছি না। তবে আমি ইসলামের ভেতরে থেকে কুফরি করা (অর্থাৎ স্বামীর সঙ্গে অমিল) পছন্দ করছি না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তুমি তার বাগানটি ফিরিয়ে দেবে? সে বলল, হ্যাঁ। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাবিতকে বলেন, তুমি বাগানটি গ্রহণ করো এবং ওই নারীকে এক তালাক দিয়ে দাও। (বুখারি, হাদিস : ৫২৭৩)

দুই. রুবায়্যি বিনতে মুআব্বিজ (রা.)-এর ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে তার স্বামী থেকে ‘খোলা’ তালাক নিয়েছেন। তালাকের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে ঋতুস্রাব গণনার মাধ্যমে ইদ্দত পালন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১১৮৫)

উক্ত হাদিসদ্বয়ের মধ্যে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.) ন্যায়সংগত ‘খোলা’ তালাকের নির্দেশ বা তাতে সমর্থন দিয়েছেন।

একটি সংশয় ও তার নিরসন

সংশয় : মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমাদের জন্য হালাল নয় যে তোমরা জোর করে নারীদের (সত্তা বা সম্পদের) উত্তরাধিকারী হবে। আর তোমরা তাদের আবদ্ধ করে রেখো না—তাদের যা দিয়েছ, তা থেকে তোমরা কিছু নিয়ে নেওয়ার জন্য, তবে যদি তারা প্রকাশ্য অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৯)

এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, স্ত্রীকে তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্বামীর জোরপূর্বক আবদ্ধ রাখার অধিকার নেই; বরং স্ত্রী চাইলে বিয়েবিচ্ছেদ করে চলে যেতে পারবে। স্ত্রী থেকে স্বামী তার দেওয়া মহর বা অন্য কোনো সম্পদ দাবি করতে পারবে না।

নিরসন : এ আয়াতে স্ত্রীর স্বেচ্ছাপ্রণোদিত বিয়েবিচ্ছেদের অধিকার পাওয়ার বিষয়টি কোত্থেকে বোঝা গেল? বরং এতে রয়েছে যে স্ত্রী ন্যায়সংগত কারণে স্বামীর থেকে তালাকের আবেদন করলে স্বামী যেন মহর ফেরত বা অন্যান্য সম্পদ দাবি না করে। এতে ‘খোলা’ তালাকের একটি মূলনীতির বিধান দেওয়া হয়েছে, তা হলো—স্বামীর অন্যায় আচরণ বা কোনো দোষের কারণে যদি স্ত্রী ন্যায়সংগতভাবে স্বামীর কাছে তালাকের আবেদন করে, সে ক্ষেত্রে স্বামীর উচিত হলো, কোনো বিনিময় ছাড়াই তালাক দিয়ে দেওয়া। এ অবস্থায় যদি সে বিনিময় দাবি করে, তাহলে তা তার জন্য অবৈধ হবে। এটিই হলো আয়াতাংশের মর্ম; কিন্তু এর দ্বারা এটির প্রমাণ হয় না যে স্বামী কোনো অবস্থায়ই বিনিময়ের জন্য আবদ্ধ রাখতে পারে না; বরং আয়াতটির পরবর্তী অংশেই উল্লেখ রয়েছে যে ‘হ্যাঁ, যদি স্ত্রী প্রকাশ্যে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয়—অর্থাৎ স্ত্রী দোষী হয়, তাহলে তাকে স্বামী তালাক দেওয়ার সময় তার থেকে ন্যায্য বিনিময় দাবি করতে পারবে।’ কাজেই আলোচ্য আয়াত ‘খোলা’ তালাকের বিধানের পরিপূরক। এ বিধানের যথার্থতা ও যৌক্তিকতা ইনশাআল্লাহ সামনে আলোচনা করছি। (আহকামুল কোরআন : ২/৮৯)

ন্যায়সংগত ‘খোলা’ তালাকের যৌক্তিকতা

উল্লিখিত আলোচনায় আমরা জানতে পারলাম যে স্বামীর দোষের কারণে স্ত্রী তালাকের আবেদন করলে তাকে তালাক দিতে স্বামী বিনিময় চাইতে পারবে না; বরং তা তার জন্য হারাম হবে। আর যদি স্ত্রীর সীমা লঙ্ঘন বা অন্যায়ের কারণে তালাক দিতে হয়, তখন ইসলামী শরিয়ত সে ক্ষেত্রে স্বামীকে তালাকের বিনিময় গ্রহণ করার অনুমতি দিয়েছে। এর সাধারণ যৌক্তিকতা হলো, একজন পুরুষ জীবনে অনেক আশা-ভরসা করে বহু কাঙ্ক্ষিত বিয়ে করে। তাতে মহর, স্ত্রীর জন্য গয়নাগাঁটিসহ সব সরঞ্জাম ও ওয়ালিমার মেহমানদারি ইত্যাদি বিপুল পরিমাণ খরচ হয়ে থাকে।

পরে যদি স্ত্রীর সীমা লঙ্ঘন বা হেঁয়ালিপনার কারণে তালাকের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তখন স্বামী এ দাবি করতেই পারে যে তোমার পেছনে আমার এত খরচ হলো; অথচ তোমার সীমা লঙ্ঘনের কারণেই সংসারটি ভাঙতে হচ্ছে। তাই আমার বিপুল পরিমাণ ব্যয়ের ক্ষতিপূরণ দাও। এটি কোনো অযৌক্তিক দাবি নয়। (রদ্দুল মুহতার : ৩/৪৪৫, আলফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু : ৯/৩৩৮)

তালাকের পরও ইদ্দতের মধ্যে স্বামীকে খরচ দিতে হবে

কিছু ভাই ‘খোলা’ তালাকের ব্যাপারে এভাবেও আপত্তি তোলেন যে স্বামীর তালাক দিতে বিনিময় লাগে না; কিন্তু স্ত্রী তালাক চাইলে বিনিময় নেবে কেন? তা কিভাবে ন্যায়সংগত হলো? এর জবাব আমরা ওপরে বর্ণনা করেছি যে স্বামী মহর, গয়নাগাঁটিসহ সব সরঞ্জাম ও ওয়ালিমার মেহমানদারি ইত্যাদি বিপুল পরিমাণ খরচ করেছে, তথাপি আরেকটি বিষয়ও এখানে রয়েছে। তা হচ্ছে, স্বামী স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার পরও ইসলামী শরিয়ত ঋতুবতী নারীর জন্য তিন ঋতুস্রাব অতিক্রম হওয়া পর্যন্ত আর ঋতুবতী না হলে তিন মাস পর্যন্ত স্বামীর ওপর তার খাদ্য, অন্ন ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা আবশ্যকীয় করেছে। (বুখারি, হাদিস : ২১৯৯, বাদায়েউস সানায়ে : ৪/১৯৩) আর সন্তানাদি থাকলে সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত সন্তানের সব খরচ বাবার দায়িত্বে। এ ক্ষেত্রে সন্তানের কোনো খরচ মায়ের দায়িত্বে নয়। (বাদায়েউস সানায়ে : ৪/৩১)

এর পরও কি আমরা বলব যে ইসলামী শরিয়ত নারীকে ঠকিয়েছে? হায়! আমাদের বিবেকের এ কেমন বিচার?

আদর্শচ্যুত কোনো মুসলিম দেশ ইসলামের দলিল নয়

এখানে আরেকটি কথা বলে শেষ করছি যে আমাদের পূর্বোক্ত সন্দেহ পোষণকারী ভাইয়েরা ইসলামী বিধান ও শরয়ি আইনকে কটাক্ষ করতে গিয়ে বিভিন্ন মুসলিম দেশ যথা—মিসর, সৌদি আরব, তুরস্ক ইত্যাদির উদ্ধৃতি বা উদাহরণ এনে থাকেন। তাঁদের বলতে চাই, আপনাদের এ কাজ বড়ই হাস্যকর। কেননা ইসলামী আইনের ব্যাপারে উদ্ধৃতি দিতে হলে তার মূল উৎস তথা কোরআন ও হাদিস থেকে দিতে হবে। অথবা শাখা উৎস খোলাফায়ে রাশেদিন অর্থাৎ চার খলিফা বা সাহাবা, তাবেইন ও তাবেতাবেইন তথা ইসলামের সোনালি যুগের শাসন, বিচার ও আইনব্যবস্থা থেকেই উদাহরণ দিতে হবে। হাজার বছর পরের ইসলামের মৌলিক আদর্শচ্যুত কোনো খেলাফতব্যবস্থা অথবা বর্তমান সময়ের নীতিবিবর্জিত শাসনব্যবস্থার উদাহরণ দেওয়া উদ্দেশ্যমূলক ও বিভ্রান্তিকর। মহান আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।

লেখক : মুহাদ্দিস ও ফতোয়া গবেষক

 

 

 



মন্তব্য