kalerkantho


প্রতিক্ষণে আল্লাহর ধ্যান ও স্মরণ

মুহিউস সুন্নাহ হাকিম কালিমুল্লাহ    

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



আমাদের অন্তর আজ বিভিন্ন ধরনের অসুখে ভুগছে—তার পরিষ্কার ও নিরসন আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমেই হবে। আল্লাহর জিকিরে তো পানির অপবিত্রতা ও দুর্গন্ধ দূরীভূত হয়। যদি এটা বলা হয় যে আল্লাহর জিকির পানিও শ্রবণ করে এবং এর দ্বারা প্রভাবিত না হলে বিহ্বল হয়ে পড়ে।

গুণীজনরা জমজমের পানি ও সাধারণ পানির মধ্যকার পার্থক্য নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁরা নিজেদের গবেষণার দ্বারা এই সমাপ্তিতে উপনীত হয়েছেন যে অন্য পানিতে বিদ্যমান ক্ষতিকারক জীবাণু জমজমের পানিতে পাওয়া যায় না। এমনিভাবে যে  পানি মুমিন ব্যক্তি ব্যবহার করে, আর যে পানি কাফির-মুশরিকরা ব্যবহার করে, উভয়ের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য পাওয়া যায়। বিজ্ঞজনদের একটি দল মুমিনের ব্যবহৃত পানি ও কাফিরদের ব্যবহৃত পানির ওপরও গবেষণা করেছেন। এই গবেষণা কয়েকটি ধাপে করা হয়েছে। বিজ্ঞজনরা সর্বপ্রথম দুই ধরনের পানি পৃথকভাবে জমা করেন। যখন ওই পানি জমে গেল, তখন বৈজ্ঞানিক সরঞ্জামাদির মাধ্যমে তার যাচাই-বাছাই করা হয়। ওই মুহূর্তে মুমিন ব্যক্তির ব্যবহৃত পানির বরফ থেকে উজ্জ্বল কিরণ বিচ্ছুরিত হচ্ছিল, যেখানে কাফির-মুশরিকদের বরফকে ঘনত্ব ও অন্ধকার ঢেকে রেখেছিল। বিজ্ঞজনরা নিজেদের গবেষণা এ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ করেননি। তাঁরা নতুন আঙ্গিকে আবার গবেষণা করলেন। এবার তাঁরা মুমিন ও মুশরিকদের ব্যবহৃত পানি থেকে পৃথকভাবে চাল সিদ্ধ করলেন, অতঃপর ওই চাল ফ্রিজে রেখে দিলেন। কিছুদিন পর ফ্রিজ থেকে উভয় ধরনের চাল বের করা হলো। মুমিন ব্যক্তির ব্যবহৃত পানি থেকে তৈরি চাল আপন অবস্থায় রয়ে গেল। অন্যদিকে কাফির-মুশরিকদের পানি থেকে তৈরি চালের মধ্যে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হলো। আমি নিজের একটি ঘটনা বর্ণনা করছি—কোনো এক বছর আমি সঙ্গীদের সঙ্গে হেজাজ অভিমুখে ভ্রমণ করেছিলাম। এই ভ্রমণে আমার সঙ্গে আমার প্রিয় বন্ধু শিব্বির আহমদ সাহেবও ছিলেন। সফরের মধ্যে ‘ওয়াকেউর রায়েস’ নামক স্থানে গেলাম, সেখানে অবস্থিত সমুদ্রের পানি এতটাই স্বচ্ছ যে যদি এক জায়গায় জমজম ও ওই পানি রেখে দেওয়া হয়, তাহলে উভয়ের মধ্যে পার্থক্য করাটা কঠিন হয়ে যাবে। ওই সময় মুফতি শিব্বির আহমদ সাহেব ওই পানি পান করলেন, তো খুবই তিক্ত লাগল, ওই পানি কণ্ঠনালি দিয়ে নামানোটাই কঠিন। বাহ্যিকভাবে উভয় পানির আকৃতি অভিন্ন। কিন্তু দুই পানির স্বাদের মধ্যে আসমান-জমিন পার্থক্য।

জিকিরের কিছু উপকারিতা

জিকরুল্লাহর মাধ্যমে সুন্নতের প্রতি আগ্রহ জন্মায়, ইবাদতে মনোযোগ আসে, গুনাহর প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি হয়, আল্লামা ইবনে কাইয়্যিম (রহ.) একজন প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ছিলেন। তিনি জিকরুল্লাহর প্রতি গুরুত্বারোপ করতে গিয়ে এবং তার ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে একটি পুস্তিকা লেখেন, তার নাম ‘আল-ওয়াবিলুস সাইয়্যিব’। এ কিতাবে তিনি আল্লাহর জিকিরের ১০০-এর চেয়ে বেশি উপকারিতা লিখেছেন। তার মধ্য থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফায়দা তুলে ধরছি—

১. জিকির শয়তানকে রুখে দেয় এবং তার শক্তিকে ভেঙে দেয়।

২. জিকির আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম।

৩. জিকির করার দ্বারা অন্তর থেকে দুশ্চিতা দূর হয়ে যায়।

৪. জিকিরের মাধ্যমে অন্তরে প্রশান্তি, আনন্দ ও প্রফুল্লতা সৃষ্টি হয়।

৫. জিকির করার দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন হয়,

৬. আল্লাহ তাআলার জিকিরের বরকতে মুখ পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতা, মিথ্যা, অশ্লীল কথাবার্তা থেকে নিরাপদ থাকে। অভিজ্ঞতা ও গবেষণা থেকে প্রতীয়মান হয়, যে ব্যক্তির মুখ আল্লাহ তাআলার জিকিরে অভ্যস্ত হয়ে যায়, সে এসব মন্দ বিষয় থেকে বাঁচতে পারে।

৭. জিকির সহজতর ইবাদত হওয়া সত্ত্বেও সব ইবাদত থেকে উত্তম। এ জন্যই এটা সহজ, মুখকে নাড়াচাড়া করা অন্য সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নাড়াচাড়া করা থেকে সহজ।

৮. স্বয়ং আল্লাহ তাআলা জিকিরকে সত্যায়ন করেন, আর তাকে সত্যবাদী বলে অভিহিত করেন।

     আর যাকে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা সত্যবাদী বলে থাকেন, তার হাশর মিথ্যাবাদীদের সঙ্গে হতে পারে না। হাদিসে এসেছে, যখন বান্দা বলে : ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার’, তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার বান্দা সত্য বলেছে, আমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আর আমিই সবচেয়ে মহান।

৯. জবান যতক্ষণ জিকিরে নিমগ্ন থাকে, ততক্ষণ অনর্থক কথাবার্তা, মিথ্যা, পরনিন্দা ইত্যাদি  থেকে নিরাপদ থাকে। এর কারণ হলো, মুখ তো বন্ধ থাকবে না, হয়তো খোদার স্মরণে মগ্ন থাকবে, অন্যথায় অনর্থক কথাবার্তায় লিপ্ত থাকবে। অন্তরের অবস্থাও ঠিক এমনই, যদি তা আল্লাহ তাআলার মহব্বতে আচ্ছন্ন না থাকে, তাহলে সৃষ্টজীবের মহব্বত তাকে গ্রাস করে ফেলবে।

১০. শয়তান মানবজাতির প্রকাশ্য শত্রু। শয়তান মানুষকে যেকোনোভাবে অশ্লীলতায় নিমজ্জিত করতে চায়। শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। এ শত্রু দূর করার মাধ্যম জিকির ছাড়া অন্য কিছু নয়। হাদিস শরিফে এমন অনেক দোয়া আছে, যেগুলো পাঠ করলে শয়তান কাছে আসতে পারে না।

উর্দু থেকে ভাষান্তর

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ

 



মন্তব্য