kalerkantho


যে উদ্দেশ্যে রোজা ও রমজান

মুফতি মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম   

১৮ মে, ২০১৮ ০০:০০



যে উদ্দেশ্যে রোজা ও রমজান

আল্লাহ তাআলা হলেন হাকিম তথা মহাপ্রজ্ঞাময়। তাঁর কোনো কাজই প্রজ্ঞাবিহীন নয়। বলা হয়ে থাকে, ‘প্রজ্ঞাবানের কর্ম প্রজ্ঞাবিহীন হয় না।’ এ হিসেবে মুমিনদের ওপর সিয়াম বা রোজা ফরজ করার পেছনেও বিশ্বপ্রভুর একটি মহান উদ্দেশ্য নিহিত আছে।

তাকওয়ার গুণে গুণান্বিত হওয়া : আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা : আল বাকারা, আয়াত : ১৮৩)

এ আয়াতে রোজা ফরজ করার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, তাকওয়া অর্জন। তাকওয়া শব্দের আভিধানিক অর্থ সতর্ক হওয়া, ভয় করা, সংযত হওয়া, বেঁচে থাকা, পরহেজ করা, শক্তি সঞ্চয় করা, দায়িত্বশীল হওয়া, জবাবদিহির দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পাদন করা। পরিভাষায় তাকওয়া বলা হয় সতর্ক ও সচেতনতার সঙ্গে পরকালে আল্লাহ তাআলার কাছে জবাবদিহির মনোভাব নিয়ে নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী সব কাজ সম্পাদন করা এবং তাঁর সন্তুষ্টির পরিপন্থী সব কাজ বর্জন করা। তাকওয়ার বৈশিষ্ট্য হলো ছয়টি। যেমন—১. সত্যের সন্ধান, ২. সত্য গ্রহণ, ৩. সত্যের ওপর অটল থাকা, ৪. আল্লাহভীতি, ৫. দায়িত্বানুভূতি, ৬. জবাবদিহিভিত্তিক দায়িত্বশীলতার সঙ্গে যথাযথভাবে কর্তব্য সম্পাদন। আলোচ্য ছয়টি বৈশিষ্ট্যের আলোকে জীবনের সব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা, আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী সব কাজ সম্পাদন করা, তাঁর সন্তুষ্টির পরিপন্থী সব মত ও পথ পরিহার করা, যেসব কাজে তিনি অসন্তুষ্ট হন এবং যে পথে চললে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হয়, তা বর্জন করার নামই তাকওয়া।

কৃতজ্ঞতা প্রকাশ : সিয়াম সাধনার আরেকটি অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, বান্দার প্রতি প্রদত্ত আল্লাহ তাআলার অগণিত নেয়ামতের, বিশেষ করে দ্বিনের সঠিক পথের সন্ধান দানের জন্য শুকরিয়া আদায় ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। বান্দার প্রতি আল্লাহর শ্রেষ্ঠ নেয়ামত হলো দ্বিনের হেদায়েত দান। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘রমজান মাসই হলো সে মাস, যাতে নাজিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েতের ও সত্যপথযাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথনির্দেশক, আর ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাস পাবে, সে এ মাসের রোজা রাখবে, আর যে লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে, সে অন্য সময় গণনা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না। যাতে তোমরা গণনা পূরণ করো এবং তোমাদের হেদায়েত দান করার দরুন আল্লাহ তাআলার মহত্ত্ব বর্ণনা করো, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৫) এ আয়াতে সিয়াম ফরজ করার কারণ বর্ণনা করা হয়েছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ।

আল্লাহ তাআলা মুমিনদের দ্বিনের সঠিক পথ প্রদর্শন করার কারণে তাঁর শুকরিয়া আদায় করা অপরিহার্য। আর এ শুকরিয়া আদায় করা হয় সিয়াম সাধনা, তারাবি, ইফতার, সাহরি, কোরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা, জিকির-আজকার ইত্যাদির মাধ্যমে। উত্তম শুকরিয়া হলো, কর্মের মাধ্যমে তা প্রকাশ করা। আর কর্মের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কর্ম হলো সিয়াম সাধনা। আর এ জন্যই সিয়ামের বিধান প্রবর্তন করা হয়েছে।

পাশবিক ইচ্ছা ও জৈবিক অভ্যাস থেকে মুক্ত করা : আল্লামা ইবনুল কায়্যিম সিয়াম সাধনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন, সিয়ামের উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে তার পাশবিক ইচ্ছা ও জৈবিক অভ্যাস থেকে মুক্ত করা এবং জৈবিক চাহিদাগুলোর মধ্যে সুস্থতা ও স্বাভাবিকতা প্রতিষ্ঠা করা। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানুষ আত্মশুদ্ধি ও পবিত্রতা অর্জন করে চিরন্তন জীবনের অনন্ত সফলতার চূড়ায় আরোহণ করে। পশুত্ব নিস্তেজ হয়ে মনুষ্যত্ব জাগ্রত হয়। সিয়াম দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের প্রতি সহানুভূতির উদ্রেক করে মানুষের শারীরিক ও আত্মিক শক্তির উন্নতি সাধন করে এবং পাশবিক চাহিদা, যা মানুষের স্বাস্থ্যকে ধ্বংস করে, তা থেকে মুক্ত করে। তদ্রূপ সিয়াম কলবের ইসলাহ ও চরিত্র সংশোধনের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে। (জাদুল মাআদ, প্রথম খণ্ড, পৃ. ১৫২) শাহ অলিউল্লাহ দেহলভি (রহ.) ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ গ্রন্থে বলেছেন, রোজার উদ্দেশ্য হলো মানুষের মধ্য থেকে পশুত্ব দূর করা। পশুর স্বভাব মানুষের জন্য বিরাট ক্ষতিকর। এ স্বভাব দূর করার উপায় হলো সিয়াম সাধনা। তাই মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অর্থাভাবে বিবাহ করতে অক্ষম, সে যেন সিয়াম পালন করে। কারণ, সিয়াম পালনের ফলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে।’ (মিশকাত, পৃষ্ঠা ২৬৭)

জাগতিক ও দৈহিক উৎকর্ষ সাধন : আধ্যাত্মিক ও জাগতিক উৎকর্ষ সাধনে সিয়ামের ভূমিকা বর্ণনাতীত। সিয়াম সাধনায় যেমন আত্মিক পরিচ্ছন্নতা রয়েছে, তেমনি রয়েছে দৈহিক সুস্থতা ও স্বাচ্ছন্দ্য। অধ্যক্ষ ডাক্তার বি সি গুপ্ত বলেছেন, ইসলাম সিয়াম সাধনার যে বৈজ্ঞানিক নির্দেশ দিয়েছে, তা মানুষের দৈহিক ও আত্মিক মঙ্গলসাধনে সক্ষম, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ডাক্তার আর ক্যামবারড বলেছেন, সিয়াম পরিপক্ব শক্তির সহায়ক। ডক্টর এমারসন বলেন, যদি কারো স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য উপবাসের প্রয়োজন হয়, তবে সে যেন ইসলামের নির্দেশ অনুযায়ী সিয়াম পালন করে। সুতরাং এ কথা দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে সিয়াম সাধনায় দৈহিক ও আধ্যাত্মিক পরিবর্তন সাধিত হয়।

ধৈর্য ও সহানুভূতির শিক্ষা : সিয়াম সাধনা সিয়াম পালনকারীকে ধৈর্য ও সহানুভূতির শিক্ষা দান করে। আত্মসংযম ও আত্মত্যাগের মহাপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে দৈহিক, আত্মিক ও মানসিক অবস্থা পরিশুদ্ধ হয়। নিজে জঠরজ্বালা সহ্য করে এবং সমাজের গরিব-দুঃখী, ফকির-মিসকিন, যারা উপবাসে দিন কাটায়, তাদের অবস্থা অনুভব করে। তাই রমজান মাসকে বলা হয় ধৈর্য ও সহমমতার মাস।

আত্মশুদ্ধি ও রিপু দমন : সিয়াম সাধনা রিপুগুলো দমনের মাধ্যমে কামনা-বাসনার শিখা নির্বাপিত করে এবং আত্মার লালসা দূরীভূত করে মুমিনের দেহ ও মনে পরিচ্ছন্নতা আনয়ন করে। ফলে সিয়াম সাধনা আত্মশুদ্ধির অন্যতম সুযোগ। সিয়াম রিপুগুলো পুড়ে ছাই করে দিয়ে মুত্তাকি হওয়ার পরম সুযোগ করে দেয়। সিয়াম সাধনা অনর্থক কাজ, মিথ্যা বচন, প্রবঞ্চনা, পরনিন্দা, অশ্লীলতা, অসৎকর্ম, কর্কশ বাক্য ব্যবহার ইত্যাদি থেকে মুক্ত রাখে। মহানবী (সা.) বলেন, পাঁচটি জিনিস সিয়াম নষ্ট করে দেয়। তা হলো—মিথ্যা কথা, পরনিন্দা, কুটনামি, মিথ্যা শপথ ও কামভাবে দৃষ্টিপাত। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলা ও মিথ্যা কাজ করা ছাড়তে পারল না, তার পানাহার ত্যাগ তথা রোজা রাখা আল্লাহর কোনোই প্রয়োজন নেই।’ (বুখারি, হাদিস : ১৭৭০)

ঐশ্বরিক গুণে গুণান্বিত করা : সিয়াম সাধনা মানুষকে ঐশ্বরিক গুণে গুণান্বিত করে। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) ‘ইয়াহইয়াউল উলুম’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘আখলাকে ইলাহি তথা ঐশ্বরিক গুণে মানুষকে গুণান্বিত করে তোলাই সিয়ামের উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাআলা পানাহার করেন না। রোজাদার পানাহার বর্জনের ফলে আখলাকে ইলাহির গুণে গুণান্বিত হয়। তদ্রূপ সিয়াম সাধনার মাধ্যমে রোজাদার ফেরেশতার গুণে গুণান্বিত হয়। ফেরেশতারা যেমন পানাহার করে না, রোজাদারও পানাহার করে না। ফলে পানাহার ও কামাচার বর্জনের দিক দিয়ে ফেরেশতা ও রোজাদার সমগুণে গুণান্বিত হয়। ফলে রোজাদার এমন মর্যাদাসম্পন্ন হয় যে তার মুখের গন্ধ আল্লাহ তাআলার কাছে মৃগনাভির সুঘ্রাণের চেয়েও উত্তম। (মুসলিম, হাদিস : ১৯৪৫)

নফসকে বিবেকের শাসন মানতে বাধ্য করা : মানব দেহের মূল হলো নফস বা আত্মা। এই আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং মন্দ চিন্তা থেকে মুক্ত রাখার একমাত্র পন্থা হলো সিয়াম পালন। নফস বা প্রবৃত্তিকে বিবেকের শাসন মানতে অভ্যস্ত করে তোলাই সিয়ামের উদ্দেশ্য। প্রবৃত্তি ও বিবেক এই দুয়ের জয়-পরাজয় নিয়েই মানুষের মধ্যে পশুত্ব ও সততার জয়-পরাজয় সূচিত হয়ে থাকে আর সিয়াম পালনের মাধ্যমেই পশুত্বের ওপর সততা ও অন্যায়ের ওপর ন্যায় বিজয়ী হয়।

পাপমুক্ত রাখা : সিয়াম সাধনা নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাখার শ্রেষ্ঠ পন্থা। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজান মাস পেল অথচ গুনাহগুলো মাফ করিয়ে নিতে পারল না, সে ধ্বংস হোক। (আদারুল মুদরাবাদ, ইমাম বুখারি) এ মাসের প্রতিটি মুহূর্তে দোয়া কবুল হয়। বিশেষ করে ইফতারের সময়, শেষ রাতে, কদরের রাতে, জুমার দিনে। এ মাসের দানে ৭০০ গুণ সওয়াব পাওয়া যায়। একটি নফল আদায় করলে ফরজের সমান সওয়াব পাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা নিজে সিয়াম পালনকারীর প্রতিদান প্রদান করবেন বলে ঘোষণা করেছেন। (মুসলিম, হাদিস : ১৯৪৫)

জান্নাতে একটি দরজার নাম রাইয়ান, যা দিয়ে শুধু রোজাদাররাই প্রবেশ করবেন। এ মাসের প্রথম ১০ দিন রহমতের, মধ্য ১০ দিন মাগফিরাতের এবং শেষ ১০ দিন নাজাতের। অতএব, সব দিক বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয় যে নিজেকে পাপমুক্ত রাখার এবং অধিক পুণ্য লাভের মুখ্য সময় হলো এ মাহে রমজান।

লেখক : প্রধান ফকিহ, আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী।



মন্তব্য