kalerkantho


ওয়াক্ফভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা

ইকবাল কবীর মোহন   

২ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



মানবসেবা ও জনকল্যাণের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ওয়াক্ফ পরিকল্পিত। আর সফল জীবন লাভ ও অফুরন্ত সওয়াব হাসিলের গুরুত্বপূর্ণ একটি হাতিয়ার হলো ওয়াক্ফ। তাই আল্লাহর নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সময়কাল থেকে ওয়াক্ফর কার্যক্রম চলে আসছে। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম ওয়াক্ফ হলো মসজিদুল কোবা। মহানবী (সা.)-এর মদিনায় হিজরতের সময় ৬২২ খ্রিস্টাব্দে এটি মদিনায় নির্মিত হয়। এর ছয় মাস পর মদিনায় নির্মিত হয় নবীর মসজিদ—মসজিদে নববী। এটি ওয়াক্ফর দ্বিতীয় উদাহরণ। এভাবে মহানবী (সা.)-এর জীবদ্দশায় আরো অনেক ওয়াক্ফ কার্যক্রম সংঘটিত হয়। মদিনায় মুসলমানদের জন্য পানির তীব্র সংকট দেখা দিলে হজরত ওসমান (রা.) এক ইহুদির কাছ থেকে রুমা কুয়ো কিনে ওয়াক্ফ করে দেন। ফলে পানির সমস্যা দূরীভূত হয়। খোলাফায়ে রাশেদার আমলেও ওয়াক্ফ বিস্তৃতি লাভ করে। আজও মুসলিম বিশ্বের দেশে দেশে অজস্র ওয়াক্ফপ্রতিষ্ঠান সেবা ও জনকল্যাণকর কাজের মাধ্যমে সমাজের সমৃদ্ধি ও উন্নয়নে অবদান রেখে চলছে।

বাংলাদেশে ওয়াক্ফর অবস্থা

বাংলাদেশ পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র। এখানেও ওয়াক্ফ কার্যক্রম চালু আছে। ব্যক্তিপর্যায় থেকে শুরু করে সাংগঠনিক পর্যায় পর্যন্ত নানাভাবে ওয়াক্ফ কার্যক্রম দ্বারা এ দেশের মানুষ ও সমাজ উপকৃত হচ্ছে। ১৯৮৬ সালের এক তথ্য মতে, বাংলাদেশে মোট ১,৫০,৯৫৩টি ওয়াক্ফ স্টেট রয়েছে। এর ৯৭,০৪৬টি রেজিস্ট্রিকৃত, ৪৫,৬০৭টি রেজিস্ট্রিবহির্ভূত এবং ৭,৯৪০টি ব্যবহারিক। বাংলাদেশে মোট ২,১৪,৫৭৫.৪৬ একর ওয়াক্ফ সম্পত্তি আছে। এসব সম্পত্তির ২,০০,৮৪১.০৭ একর কৃষিজমি এবং ১৩,৭৩৪.৩৯ একর অকৃষিজমি। ওয়াক্ফ প্রতিষ্ঠানের আয় থেকে মসজিদ, মাদরাসা, ঈদগাহ, কবরস্থান, এতিমখানা, দাতব্য চিকিৎসালয় ও ধর্মীয় উৎসব পরিচালিত হচ্ছে। এক হিসাবে দেখা যায়, ওয়াক্ফ প্রশাসন বর্তমানে ১৫০০টি মসজিদ, ৭০০টি মাদরাসা, ১০০টি এতিমখানা, পাঁচটি দাতব্য চিকিৎসালয় ও নওমুসলিমের জন্য কল্যাণ তহবিল পরিচালনা করছে। ১৯৮৩ সালের এক হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১,৩১,৬৪১টি মসজিদ রয়েছে, যার মধ্যে ১,২৩,০০৬টি মসজিদ ওয়াক্ফ সম্পত্তির ওপর স্থাপিত।

পৃথিবীর অন্যান্য মুসলিম দেশের মতো বাংলাদেশেও ওয়াক্ফ অনেকাংশে মসজিদ, মাদরাসা, কবরস্থান ও এতিমখানায় সীমাবদ্ধ রয়েছে। যদিও ওয়াক্ফ একসময় সারা দুনিয়ার মুসলিম সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সেবা এবং কল্যাণের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। তাই ওয়াক্ফ ব্যবস্থার প্রতি আমাদের আরো বেশি মনোযোগী হতে হবে। ওয়াক্ফকে ব্যাপ্ত, সার্বিক ও জনপ্রিয় করে তুলতে পারলে এটি দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে বিরাট অবদান রাখতে পারে।

ভারত ও পাকিস্তানে ওয়াক্ফ

ভারত ১৩২ কোটি ৪১ লাখ (২০১৬) মানুষের দেশ। দেশটিতে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ২৫ কোটি। এই অঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে মুসলিম শাসন কায়েম ছিল। ফলে ইসলামী বিধান সমাজে নানাভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। ওয়াক্ফর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিধানও তখন চালু ছিল। কালের পরিক্রমায় মুসলিম শাসনের অবসান হলেও সেখানকার মুসলিম মানস ও ব্যবহারিক কর্মকাণ্ডে ইসলামী বিধান এখনো অটুট রয়েছে। ভারতের মুসলমানরা অসংখ্য ওয়াক্ফ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। সেগুলো আজও চালু আছে। ১৯৭৬ সালের এক হিসাব মতে, ভারতে সবচেয়ে বেশি ওয়াক্ফ সম্পত্তির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। দেশটিতে প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজারের বেশি ওয়াক্ফ সম্পত্তি বা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ভারতের ওয়াক্ফ ট্রাস্টিরা প্রায় দুই হাজার ৫০০ ওয়াক্ফ স্কুল, কলেজ এবং এতিমখানা পরিচালনা করছে। তা ছাড়া ৬০ হাজার মাদরাসা ও দুই লাখ মসজিদ তারা পরিচালনা করছে। মুসলিম দেশ পাকিস্তান ২০ কোটি ৯৯ লাখ (২০১৬) জনসংখ্যার দেশ, যার ৯৬.৪ শতাংশই মুসলমান। ফলে দেশটিতে ওয়াক্ফ সম্পত্তির পরিমাণও কম নয়। এখানে দীর্ঘদিন ধরে ওয়াক্ফ পরিচালিত হয়ে আসছে। ১৯৮৪ সালের এক তথ্য মতে, দেশটির পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তান মিলে ওয়াক্ফ সম্পদের মধ্যে রয়েছে ৩৪৪টি তীর্থস্থান, ৬৪৮টি মসজিদ, ৩১ হাজার ৯১৩ একর কৃষিজমি, ৪৮ হাজার ১৮৮ একর অনাবাদি জমি, দুই হাজার ২১৫টি দোকান ও এক হাজার ৮৬৯টি বাড়ি। 

ক্যাশ (নগদ) ওয়াক্ফর পরিচিতি

‘ক্যাশ ওয়াক্ফ’ ওয়াক্ফর একটি ভিন্ন রূপ। বিভিন্ন পণ্ডিত ক্যাশ ওয়াক্ফর বিভিন্ন সংজ্ঞা দিয়েছেন। মালিকি মাজহাবের পণ্ডিত আল তাসুলি তাঁর ‘তুহফাত আল-হুক্কাম’-এ ক্যাশ ওয়াক্ফর সংজ্ঞায় বলেছেন, ‘ক্যাশ ওয়াক্ফ হলো নগদ অর্থকে ওয়াক্ফ হিসেবে উৎসর্গ করার একটি পদ্ধতি, যা নির্দিষ্ট গ্রাহককে সুদ ব্যতিরেকে ঋণ দেওয়া হয়।’ (আল-তাসুলি, ১৯৯৮, ভলিউম-২, পৃষ্ঠা ৩৬৯)

হানাফি মাজহাবের বিশেষজ্ঞ পণ্ডিত জাফর ইবনে আল হুজাইল (১১০-১৫৮ হিজরি) ‘ক্যাশ (নগদ) ওয়াক্ফর সংজ্ঞায় বলেন, ‘ক্যাশ ওয়াক্ফ হলো, ওয়াক্ফ হিসেবে দানকৃত সেই নগদ অর্থ, যা বিনিয়োগ করা হয় এবং সেই বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে উৎসর্গ বা সদকা করা হয়।’ (ইবনে নুজায়েম, ভলিউম ৫, পৃষ্ঠা ২১৯)

ওপরে বিভিন্ন ইসলামী পণ্ডিত ওয়াক্ফর যে সংজ্ঞা দিয়েছেন, তাতে কিছুটা তফাত দেখা গেলেও সব ইসলামী বিশেষজ্ঞের মতে ‘ক্যাশ ওয়াক্ফ’ একটি বৈধ দান হিসেবে স্বীকৃত।

কোরআন পাকের অনেক জায়গায়  মহান আল্লাহ তাঁর পথে সম্পদ ব্যয় করার কথা বলেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে। যারা এ কারণে গাফেল হয়, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত। আমি তোমাদের যে রিজিক (ধন-সম্পদ) দিয়েছি, তা থেকে মৃত্যু আসার আগেই ব্যয় করো।’ (সুরা : মুনাফিকুন, আয়াত : ৯)

কোরআনের ওই আয়াতে ‘ধন-সম্পদ’ বলতে স্থাবর-অস্থাবর উভয়কেই বোঝানো হয়েছে। ধন-সম্পদ স্বর্ণরৌপ্য বা কোনো খনিজদ্রব্য যেমন হতে পারে, তেমনি তা নগদ অর্থ বা টাকা-পয়সাও হতে পারে।

১৯৬২ সালের ওয়াক্ফ আইনের দুই নম্বর ধারার দুই উপধারায় ওয়াক্ফর যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তাতেও ক্যাশ ওয়াক্ফর কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং স্থাবর ও অস্থাবর উভয় সম্পদের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। ধারাটি হলো—‘স্বত্বভোগী’ অর্থ ওয়াক্ফ থেকে কোনো আর্থিক বা অন্যান্য বাস্তব সুবিধা পাওয়ার অধিকারী ব্যক্তি ও ‘স্বত্বভোগী’ বলতে অনুরূপ কোনো সুবিধা পাওয়ার অধিকারী কোনো প্রতিষ্ঠান, যেমন মসজিদ, মাজার, দরগাহ, খানকাহ, স্কুল, মাদরাসা, ঈদগাহ বা কবরস্থানকে বোঝাবে।’

এই আইনের একই ধারার ১০ উপধারায় ওয়াক্ফ সম্পর্কে আরো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে : ‘ওয়াক্ফ বলতে ইসলাম ধর্মীয় কোনো ব্যক্তির দ্বারা স্থাবর কিংবা অস্থাবর সম্পত্তি মুসলিম আইনে স্বীকৃত যেকোনো ধার্মিক, ধর্ম সম্পর্কিত অথবা দাতব্য উদ্দেশ্যে চিরতরে উৎসর্গ করাকে বোঝাবে।’  

ইমাম ইবনে শিহাব জুহুরি (রহ.) ও ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) নগদ অর্থ (দিনার বা দিরহাম) ওয়াক্ফ করার ব্যাপারে মত দিয়েছেন। ১৪২৫ হিজরি সাল তথা ২০০৪ সালে ওমানের রাজধানী মাসকাটে ওআইসি ফিকহ একাডেমির ১৫০০তম অধিবেশনে গৃহীত ১৫/১/৪০ নম্বর সিদ্ধান্তে ‘নগদ অর্থ ওয়াক্ফ’ বৈধ হওয়ার পক্ষে ফতোয়া দেওয়া হয়।  

১৯৯৫ সালে জেদ্দার ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ওয়াক্ফ বিষয়ে Structural Adjustments and Islamic Voluntary Sector with Special reference to Awqaf in Bangladesh একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. এম এ মান্নান রচিত এই গবেষণাপত্রে তিনি প্রমাণ করেছেন যে ইসলামে ‘ক্যাশ ওয়াক্ফ’ স্বীকৃত।  

ওয়াক্ফ হিসেবে স্থাবর সম্পত্তি যেমন—জমি, দালান, বই-পুস্তক বা গবাদি পশু ইত্যাদি দান করার চেয়ে নগদ বা ক্যাশ ওয়াক্ফ বেশি উপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ। ক্যাশ ওয়াক্ফর প্রচলন শুরু হয় অটোমান শাসনকাল থেকে। তখন বুরশা শহরের অনেক ধনবান ও বিত্তশালী লোক দরিদ্র মানুষকে নগদ অর্থ ওয়াক্ফ হিসেবে দান করত। চিজাককা (১৯৯৫) উল্লেখ করেন যে ক্যাশ ওয়াক্ফ তখনকার সময় বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল এবং ব্যক্তি ও সামাজিক উন্নয়নে তা অভাবনীয় ভূমিকা রেখেছিল। সেই সময় স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সমাজসেবায় ক্যাশ ওয়াক্ফর অবদান ছিল ঈর্ষণীয়। ১৬ শতকের শেষ দিকে এসে ক্যাশ ওয়াক্ফ আনাতোলিয়া ও ইউরোপের ইসলামী প্রদেশগুলোতে খুবই জনপ্রিয় ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিল বলে জানা যায়। ওয়াক্ফ প্রশাসনে তুরস্কেরও দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তুরস্কে ক্যাশ ওয়াক্ফ আর্থিক কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

লেখক : শিশুসাহিত্যিক ও উপপরিচালক, ইসলামী ব্যাংক


মন্তব্য