kalerkantho


যে বার্তা নিয়ে নবীরা এসেছেন

মুফতি মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম

৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আবুল বাশার তথা আদি পিতা হজরত আদম (আ.) থেকে শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত নবুয়তের ধারাবাহিকতায় অসংখ্য ও অগণিত নবী-রাসুল পৃথিবীতে এসেছেন।

নবী-রাসুলদের সংখ্যা : নবী-রাসুলদের সংখ্যা আল্লাহ তাআলা ছাড়া কেউ জানেন না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আর প্রেরণ করেছি অনেক রাসুল, যাদের কথা আমি আপনাকে আগে বলেছি এবং অনেক রাসুল, যাদের কথা আপনাকে বলিনি। আর আল্লাহ মুসার সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন।’ (সুরা : নিসা : আয়াত : ১৬৪)

প্রত্যেক উম্মতের জন্য নবী-রাসুল পাঠানো হয়েছে। কোনো উম্মত নবী-রাসুল ছাড়া ছিল না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে রাসুল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগুত থেকে নিরাপদ থাকো।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৩৬) তবে নবী-রাসুলদের সংখ্যা নিয়ে মতভেদ আছে। হজরত আবু যর গিফারি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একদা আরজ করলাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল! নবী-রাসুলদের সংখ্যা কত? তিনি প্রত্যুত্তরে বলেন, নবী হলেন, এক লাখ চব্বিশ হাজার, আর রাসুল হলেন ৩১৩ জন।’ (কুরতুবি, ষষ্ঠ খণ্ড, ১৫ পৃষ্ঠা) হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি আট হাজার নবীর নিদর্শনের ওপর প্রেরিত হয়েছি, তন্মধ্যে চার হাজার হলো বনি ইসরাঈল গোত্র থেকে এসেছেন।’

কাবুল আহবার বলেন, নবী ছিলেন দুই কোটি দুই লাখ। মাকাতিল (রহ.) বলেন, নবী ছিলেন এক কোটি চার লাখ ২৪ হাজার। (কুরতুবি, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫) ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনার আলোকে প্রতীয়মান হয়, নবী-রাসুলদের সঠিক সংখ্যা একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন। পবিত্র কোরআন মজিদে মাত্র ২৫ জন নবী-রাসুলের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা হলেন—১. হজরত আদম (আ.), তাঁর জীবনকাল ৯৬০ বছর, ২. হজরত ইদরিস (আ.), ৩৫০ বছরের সময় তাঁকে আকাশে উঠিয়ে নেওয়া হয়, ৩. হজরত নুহ (আ.), তাঁর জীবনকাল এক হাজার বছর, ৪. হজরত হুদ (আ.), ৫. হজরত সালেহ (আ.), তাঁর জীবনকাল ৫৮ বছর, ৬. হজরত ইবরাহিম (আ.), তাঁর জীবনকাল ৫৭৫ বছর, ৭. হজরত লুত (আ.), ৮. হজরত ইসমাঈল (আ.), ৯. হজরত ইসহাক (আ.), তাঁর জীবনকাল ১৮০ বছর, ১০. হজরত ইয়াকুব (আ.), তাঁর জীবনকাল ১৪৭ বছর, ১১. হজরত ইউসুফ (আ.), তাঁর জীবনকাল ১২০ বছর, ১২. হজরত আইউব (আ.), তাঁর জীবনকাল ৯৩ বছর, ১৩. হজরত শুয়াইব (আ.), ১৪. হজরত মুসা (আ.), তাঁর জীবনকাল ১২০ বছর, ১৫. হজরত হারুন (আ.), ১৬. হজরত ইউনুস (আ.), ১৭. হজরত দাউদ (আ.), তাঁর ১০০ বছর। রাজ্য পরিচালনা করেন ৪০ বছর, ১৮. হজরত সুলাইমান (আ.), ১৯. হজরত ইলিয়াস (আ.), তিনি দীর্ঘ জীবন লাভ করেন, ২০. হজরত আল-ইয়াসা (আ.), ২১. হজরত জাকারিয়া (আ.), ২২. হজরত ইয়াহিয়া (আ.), ২৩. হজরত জুলকিফল (আ.), তাঁর জীবনকাল ৭৫ বছর, ২৪. হজরত ঈসা (আ.), তাঁর পার্থিব জীবনকাল ৩৩ বছর, ২৫. হজরত মুহাম্মদ (সা.), তাঁর জীবনকাল ৬৩ বছর।

আরব ভূমিতে প্রেরিত হয়েছেন মাত্র পাঁচজন নবী-রাসুল। তাঁরা হলেন—১. হজরত হুদ (আ.), ২. হজরত সালেহ (আ.), ৩. হজরত ইসমাঈল (আ.), ৪. হজরত শুয়াইব (আ.) ও ৫. হজরত মুহাম্মদ (সা.)।

১৩ বা ১৪ জন নবী-রাসুল খতনা অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছেন। যেমন—১. হজরত আদম (আ.), ২. হজরত শীশ (আ.), ৩. হজরত ইদরিস (আ.), ৪. হজরত নুহ (আ.), ৫. হজরত সাম (আ.), ৬. হজরত যাকারিয়া (আ.), ৭. হজরত লুত (আ.), ৮. হজরত ইউসুফ (আ.), ৯. হজরত মুসা (আ.), ১০. হজরত শুয়াইব (আ.), ১১. হজরত সুলাইমান (আ.), ১২. হজরত ইয়াহিয়া (আ.), ১৩. হজরত ঈসা (আ.), ১৪. হজরত মুহাম্মদ (সা.)। (তাফসিরে কুরতুবি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা নম্বর ৭৬)

হাদিসে বিদ্যমান নবী-রাসুলদের নাম :  বহু নবী-রাসুলের নাম পবিত্র কোরআনে উল্লেখ নেই। হাদিস শরিফে মাত্র কয়েকজনের নাম পাওয়া যায়। তাঁরা হলেন-১. হজরত ইউশা বিন নুন (আ.), ২. হজরত হিজকিল (আ.), ৩. হজরত সামুয়াল (আ.), ৪. হজরত দানিয়াল (আ.), ৫. হজরত ইয়ারমিয়া (আ.) প্রমুখ।

দুইবার প্রেরিত নবী : একমাত্র হজরত শুয়াইব (আ.) দুইবার প্রেরিত হয়েছেন। একবার মাদইয়ানে, দ্বিতীয়বার আসহাবে আইকার কাছে। (ইতকান, দ্বিতীয় খণ্ড, ৩০২ পৃষ্ঠা)

নবী প্রেরণের উদ্দেশ্য : নবী-রাসুলরা হলেন পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি। পৃথিবীতে আল্লাহ তাআলার মিশন বাস্তবায়ন করাই নবী-রাসুলদের কাজ। নবী-রাসুলদের আনুগত্য মূলত আল্লাহরই আনুগত্য। তাঁদের প্রেরণের উদ্দেশ্য হলো—

সত্যের দিকে আহ্বান : নবী-রাসুলদের প্রধান কাজ হলো সত্য ও ন্যায়ের দিকে আহ্বান। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘বলুন! এটাই আমার পথ। আমি (মানুষকে) আল্লাহর দিকে ডাকব।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ১০৮)

দ্বিনকে বিজয়ী করা : পৃথিবী আল্লাহর, ফলে পৃথিবীতে আইন চলবে একমাত্র আল্লাহর। এ লক্ষ্যে নবী-রাসুলরা কাজ করেছেন। আর এ পথে তাঁরা আজীবন পরিশ্রম করেছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তিনি ওই সত্তা, যিনি তাঁর রাসুলকে হেদায়েত ও সত্য দ্বিন দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যাতে সব বাতিল ধর্মের ওপর ইসলামকে বিজয়ী করতে পারে।’ (সুরা : সফ, আয়াত : ৯)

জান্নাতের সুসংবাদ দান ও জাহান্নামের ভয় প্রদর্শন : আল্লাহ তাআলা নবী-রাসুলদের জান্নাতের সুখ-শান্তির সুসংবাদদাতা এবং জাহান্নামের কঠিন আজাবের ভয় প্রদর্শনকারী হিসেবে প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘সত্যসহ আপনাকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে পাঠিয়েছি।’ (সুরা : ফাতির, আয়াত : ২৪)

আল্লাহর ইবাদত ও তাগুতকে বর্জন করার নির্দেশ : আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে তাঁর ইবাদত করার ও তাগুতকে বর্জন করার নির্দেশ দেওয়ার জন্য নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন। যেমন আল্লাহর বাণী—‘আল্লাহর ইবাদত করার ও তাগুতকে বর্জন করার নির্দেশ দেওয়ার জন্য আমি প্রত্যেক জাতির কাছে রাসুল পাঠিয়েছি।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৩৬)

লেখক : প্রধান ফকিহ

আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী।

 



মন্তব্য