kalerkantho


মহানবী (সা.)-এর ভাষণে মানবতার জয়গান

জসিম বিন শফিক

২৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মুহাম্মদ (সা.) জীবদ্দশায় সময়ের প্রয়োজনে বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন সময়ে ভাষণ প্রদান করেছেন। কখনো সাফা উপত্যকায় দাঁড়িয়ে, কখনো কাবা প্রাঙ্গণে, ভাষণ দিয়েছেন মদিনা তাইয়েবায়, মসজিদে কুবায়, মক্কা বিজয়ের দিন কিংবা তাবুকে অথবা বিদায় হজে।

বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করা গেছে যে মুহাম্মদ (সা.)-এর ভাষণে বরাবরই উচ্চারিত হয়েছে মানবতার জয়গান। মানুষের মর্যাদার কথা। মানুষের অধিকারের কথা।

মানবতার জন্য মুহাম্মদ (সা.)-এর শ্রেষ্ঠ পদক্ষেপ ছিল, তিনি বিশ্বমানবতাকে মানুষের দাসত্ব থেকে একমাত্র শরিকবিহীন আল্লাহর ইবাদতের দিকে নিয়ে গেছেন। মানুষকে আল্লাহ ছাড়া আর সব কিছুর গোলামি থেকে মুক্তি দিয়েছেন। সাফা উপত্যকায় ভাষণে তিনি বলেন, ‘হে মানুষ, আমি তোমাদের অবগত করছি যে চিরসত্য ও চিরপবিত্র আল্লাহ সারা দুনিয়ার স্রষ্টা ও মালিক। তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নাই। হে মানুষ! তোমাদের কী হলো, তোমরা মহাপবিত্র আল্লাহকে ছেড়ে অসহায় সত্তার ইবাদত করছ। তোমরা নিতান্ত অকৃতজ্ঞ। হায়! এটা কি উত্তম নয় যে শেষ ফয়সালার দিন আসার আগে আমরা সব দিক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একমাত্র তাঁর হয়ে যাই এবং একমাত্র তাঁরই ইবাদত করি?’ (মহানবীর ভাষণ : পৃষ্ঠা ১৪-১৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

ঐক্য ও পারস্পরিক সহযোগিতার ফলে সমাজে মানবতা ব্যাপ্তি লাভ করে। মুহাম্মদ (সা.) মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্বের পূর্ণাঙ্গ নমুনা পেশ করেন। দুর্গে আবি তালিবে তাঁর ভাষণ শুনুন!

‘হে মানুষ! নিঃসন্দেহে সব মুসলমান পরস্পর ভাই ভাই। সব মুসলমান এক ব্যক্তিসদৃশ। তার শিরঃপীড়া উপস্থিত হলে সর্বশরীর বেদনায় জর্জরিত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। এক মুসলমান অন্য মুসলমানের জন্য এক ভিত্তিস্বরূপ, যার এক অংশ অন্য অংশের বোঝা বহনে সাহায্যকারী। আমি তোমাদের নসিহত করছি, প্রত্যেক মুসলমান পরস্পর ভাই, তাই কেউ যেন কাউকে জুলুম না করে এবং  কাউকে যেন একাকী বন্ধুহীন বা সাহায্যহীন ছেড়ে দেওয়া না হয়। যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করবে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করে দেবেন। যেকোনো মুসলমানের কষ্ট দূর করবেন, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার কষ্ট দূর করে দেবেন। যে ব্যক্তি অন্যের ত্রুটি গোপন করবে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তার ত্রুটিও গোপন রাখবেন।’ (মহানবীর ভাষণ, পৃষ্ঠা ১৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

ভেদাভেদ গুছিয়ে মুহাম্মদ (সা.) মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। দৃঢ় কণ্ঠে তিনি ঘোষণা করেন, মানুষের ওপর মানুষের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, মূল সৃষ্টি, অধিকার ও কর্তব্যের ক্ষেত্রে সবাই সমান। শ্রেষ্ঠত্ব বিবেচিত হবে শুধু ইনসাফ ও তাকওয়া তথা বিশ্বাস ও আল্লাহভীতির নিরিখে।’

সব মানুষের সমান মর্যাদা ঘোষণা করে বৈষম্যের মূলোৎপাটন করতে বিদায় হজের ভাষণে তাঁর উচ্চারণ : ‘হে জনমণ্ডলী! এতে কোনো সন্দেহ নেই যে তোমাদের রব এক ও তোমাদের পিতা এক। তোমরা সবাই আদম থেকে এবং আদম মাটি থেকে সৃষ্ট। আল্লাহ তাআলার কাছে সে অধিক সম্মানিত, যে অধিক তাকওয়ার অধিকারী। মনে রেখো, কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবীয়র শ্রেষ্ঠত্ব নেই, না কোনো আরবীয়র ওপর কোনো অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব, না কোনো শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের, না কোনো কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের। শ্রেষ্ঠত্বের বুনিয়াদ শুধু তাকওয়া। (মহানবীর ভাষণ : পৃষ্ঠা ৫৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

পবিত্র কোরআনে মানবতার নবী (সা.)-এর উদ্দেশে বলা হয়েছে, ‘আমি তো আপনাকে গোটা সৃষ্টির জন্য রহমতরূপে প্রেরণ করেছি।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ১০৭)

মহানবী (সা.)-এর এই রহমত, অনুকম্পা ও দয়া ছিল মানুষের প্রতি, যুদ্ধবন্দির প্রতি, বৃক্ষের প্রতি—এমনকি বাকহীন পশুর প্রতি। কাবা প্রাঙ্গণের ভাষণে তিনি বলেন, “হে মানুষ, আমি তোমাদের রহম ও করমের নসিহত করছি এবং উত্তম কথা দিয়ে শুরু করছি। আমি যা বলছি, তা মনোযোগের সঙ্গে শোনো। আমার রব বলেন, ‘আমি দয়া ও অনুগ্রহ পছন্দ করি, যে দয়াহীন, সে আমার রহমত থেকে বঞ্চিত।’ যে মহামহিম আল্লাহর হাতে আমার জীবন, তাঁর শপথ করে বলছি—রহমশীল ছাড়া কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে আল্লাহ তাআলা তাদের আজাব দেবেন, যারা দুনিয়ায় মানুষকে কষ্ট দেয়।”

‘হে মানুষ! যে বিধবা ও মিসকিনের সাহায্যের জন্য চেষ্টা করে এবং তাদের প্রতি রহম করে, সে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর ও রাত জেগে নামাজ আদায়কারীর সমতুল্য। আমি তোমাদের এতিমের প্রতি রহম করার হেদায়েত করছি।’

‘হে মানুষ! বাকহীন পশুর প্রতিও রহম করো। যখন তোমরা এদের সফরে নিয়ে যাও, তখন তাদের ওপর সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দিয়ো না। ...পিপাসার্ত হলে তাদের পানি দিয়ো। প্রত্যেক পিপাসার্ত প্রাণীকে পানি পান করানো পুণ্যের কাজ। যেখানেই হোক, ছায়াদানকারী গাছ কাটবে না, কেননা তা সৃষ্ট জীবের উপকার সাধন করে। ...আমি তোমাদের বলছি, কোনো প্রাণী আগুনে পোড়াবে না। কাউকে নির্দয়ভাবে প্রহার কোরো না। কারো হাত, পা, নাক, কান কাটবে না। যেসব বন্দি তোমাদের অধীন, তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার কোরো না। তারা তোমাদের ভাই। তোমরা যা খাও, তা তাদের খেতে দাও, যা তোমরা পরিধান করো, তা তাদেরও পরতে দাও। যখন তোমরা বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধ করো, তখন তাদের সন্তানদের ওপর রহম করো। বিকলাঙ্গ ও অক্ষম মানুষকে সম্মান করবে। দুনিয়ার সব লোক আল্লাহর মাখলুক, আল্লাহর মাখলুকের সঙ্গে যে ভালো ব্যবহার করে, সে আল্লাহর প্রিয়।’ (মহানবীর ভাষণ : পৃষ্ঠা ২২, ২৩ ও ২৪ থেকে, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

জুলুম ও বেইনসাফি মানবতার ভিত্তিমূল নড়বড়ে করে দেয়। এ জন্য অহেতুক রক্তপাত নিষেধ করে দুর্গে আবি তালিবের ভাষণে মুহাম্মদ (সা.) আরো বলেন, ‘হে মানুষ! মুসলমানের প্রত্যেক জিনিস অপর মুসলমানের জন্য হারাম। পরস্পরের রক্ত, ইজ্জত-আবরু, সম্পদের ক্ষতি সাধন তোমরা কোরো না। (মহানবীর ভাষণ : পৃষ্ঠা ১৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রকাশিত)

অমানবিকতার প্রাচীর ভেঙে মুহাম্মদ (সা.) নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন। পুরুষের মতো তাদেরও অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছেন। বিদায় হজের ভাষণে তিনি বলেন, ‘অতঃপর হে জনমণ্ডলী! তোমাদের স্ত্রীদের ওপর তোমাদের অধিকার ও তোমাদের ওপর তোমাদের স্ত্রীদের অধিকার রয়েছে।’ ‘স্ত্রীদের সম্পর্কে আমি তোমাদের অছিয়ত করছি যে তাদের সঙ্গে তোমরা উত্তম আচরণ করো।’ (মহানবীর ভাষণ : পৃষ্ঠা ৫৭-৫৮)

এমন রাষ্ট্রনায়ক আর কোথায় পাব, যাঁর কণ্ঠে এত বিপুল শক্তিতে ধ্বনিত হয়েছে মানুষের কথা, মানবতার কথা? জরাজীর্ণ এই পৃথিবীতে যখন সর্বত্রই চলছে অশান্তি, অনাচার, অসাম্য, বিভেদ, হিংসা, হানাহানি, অরাজকতা আর খুনোখুনি, তখন মুহাম্মদ (সা.)-এর ঘোষিত আদর্শ অনুসরণ ও বাস্তবায়নই হতে পারে মানবতার রক্ষাকবচ।

 

লেখক : মাদরাসা শিক্ষক


মন্তব্য