kalerkantho


পুণ্যময় হোক বছরের প্রথম প্রহর

মুহাম্মাদ মিনহাজ উদ্দিন

২৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



দিন যায়। রাত আসে। সময়ের চাকা ক্রমাগত ঘুরতে থাকে। বিরামহীন বইতে থাকে কালের স্রোত ও গতিপ্রবাহ। সে ধারাবাহিকতায় একটি বছর সমাপ্ত হয়ে নতুন আরেকটি বছরের সূচনা হতে চলেছে। আগামী ৩১ ডিসেম্বর রবিবার অর্ধরাত থেকে শুরু হবে নববর্ষের ক্ষণ গণনা। এভাবেই সূচিত হবে পুরানের বিদায় ও নতুনের অভিষেক।

মানুষের পার্থিব জীবনকে বিরতিহীন ও ফিরতিহীন ধাবমান রেলগাড়ির (ঘড়হংঃড়ঢ় ধহফ হড়হ ত্বঃঁত্হধনষব ঃত্ধরহ) সঙ্গে তুলনা করা হয়। যার যাত্রাকাল ও যাত্রাস্থান (ঞরসব ধহফ ংঃধত্ঃরহম ঢ়ড়রহঃ ড়ভ লড়ঁত্হু) জানা থাকলেও শেষ গন্তব্য ও যাত্রার সমাপ্তিকাল (ঊহফরহম ঢ়ড়রহঃ) আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।

মহাকালের মিছিলে অবিরাম টুকরো টুকরো ক্ষণ-মুহূর্ত, দিন-রাত, সপ্তাহ, মাস ও বছর পেরিয়ে মানুষ একদিন পৌঁছে যায় অনিবার্য মৃত্যুর দোরগোড়ায়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘কিন্তু তিনি তাদের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিলম্ব করান। অতএব, যখন তাদের মৃত্যুর নির্দিষ্ট সময় আসে, তখন সামান্য কালক্ষেপণও করে না আবার ত্বরান্বিতও করে না।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৬১) 

তাই বছরের আগমন ও প্রস্থানে প্রত্যেক বিবেকবান মুমিনের কর্তব্য হলো আত্মসমালোচনা করা। অনুতাপ ও অনুশোচনার মাধ্যমে অতীতের কাজকর্ম পর্যালোচনা করা। অর্থাৎ বিগত বছর যতটুকু সময় আল্লাহর সন্তুষ্টিমতো চলার তাওফিক হয়েছে, তার শোকর আদায় করা। আর যে সময়টুকু গুনাহ-নাফরমানি, গাফিলতি ও আল্লাহর অসন্তুষ্টিতে নষ্ট হয়েছে, তার জন্য অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করা।

অবশ্য এটা মুমিনের প্রাত্যহিক ও আবশ্যিক কাজ। তবু ভালো-মন্দের হিসাব, ভবিষ্যত্জীবনের জন্য নতুনভাবে সংকল্পবদ্ধ হওয়া পরিশুদ্ধ জীবন বিনির্মাণের আবশ্যিক শর্ত। প্রতি রাত-দিন, সপ্তাহ, মাস ও বছরের আগমন ও প্রস্থান আমাদের সে শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তিনি সেই সত্তা, যিনি দিন ও রাতকে পরস্পরের অনুগামী করে সৃষ্টি করেছেন। এসব বিষয় শুধু তার উপকারে আসে, যে উপদেশ গ্রহণ করতে ইচ্ছুক কিংবা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে চায়।’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৬২)

বছরের সূচনালগ্নে যখন প্রতিটি মুমিন উপস্থিত হয়, তখন তার অনুভূতি হওয়া উচিত, ‘যে দিনগুলো আমার শেষ হয়ে গেল, তা আমার জীবনেরই একটি মূল্যবান অংশ। একটি বছর শেষ হওয়ার সরল ও সহজ অর্থ হলো, আমার জীবনমাল্য থেকে ৩৬৫ দিনের ৩৬৫টি পুষ্প ঝরে পড়েছে। আমার জীবন আরো সংকুচিত হয়ে এসেছে। মৃত্যু আমার আরো কাছে চলে এসেছে। এত আনন্দ ও উল্লাসের কিছু নেই। বরং হিসাব-নিকাশ করে জীবনের হালখাতা করা উচিত।’

একজন ঈমানদারের প্রতিটি দিন-রাত খুশি ও আনন্দের। বছরের প্রতিটি মুহূর্ত তার জন্য মূল্যবান। বিশেষ করে থার্টিফার্স্ট নাইট বা বছরের শেষ রাত আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাত। এ রাতে অনুশোচনা (বিগত বছরের পর্যালোচনা) ও আত্মসমালোচনা করে আগামী বছরের পরিকল্পনা গ্রহণ করা এবং তাওবা-ইস্তেগফার, দোয়া-দরুদ, নফল নামাজ ইত্যাদি ভালো কাজের মাধ্যমে রাত অতিবাহিত করা উচিত।

বছর শেষে প্রকৃত মুসলমানের অনুভূতি শুধু আনন্দ-উচ্ছ্বাসের নয়; বরং এর সঙ্গে মিশে আছে রাশি রাশি বেদনার স্ফুলিঙ্গ। কাজেই বছরের বিদায়-মুহূর্তে দাঁড়িয়ে মুমিনের এ কথা ভেবে চিন্তামগ্ন হওয়া উচিত যে একটি বছর তো আমি সমাপ্ত করেছি, কিন্তু যে মহান উদ্দেশ্যে (তাঁর ইবাদত-বন্দেগির নিমিত্ত) মহান আল্লাহ তাআলা আমাকে সৃষ্টি করলেন, সে উদ্দেশ্য আমি কতটুকু বাস্তবায়ন করেছি? পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষের হিসাবের সময় ঘনিয়ে এসেছে, অথচ তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে আছে।’ (সুরা : আম্বিয়া : ০১)

ইসলামের মহান খলিফা ওমর (রা.) একবার তাঁর খুতবায় ঐতিহাসিক একটি উক্তি উপস্থাপন করেছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমার কাছে হিসাব চাওয়ার আগে নিজের হিসাব করে নাও, তোমার কাজ পরিমাপ করার আগে নিজেই নিজের কাজের পরিমাপ করে নাও।’ (তিরমিজি : ৪/৬৩৮)

তাই নতুন বছরে হওয়া উচিত পরিশুদ্ধ আমলের ও ইবাদতের নিষ্ঠাবিধৌত প্রতিশ্রুতি ও জীবনকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর দৃপ্ত অঙ্গীকার।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভেবে চিন্তিত হয় না। উল্টো এক শ্রেণির মানুষ বছরের শুরুর দিনগুলোতে আনন্দে বল্গাহারা হয়ে যায়। অনেকে অত্যধিক খুশিতে দিশা হারিয়ে পাগলপ্রায় হয়ে ওঠে। চৈতন্য হারিয়ে তারা দিনগুলোকে কলুষিত করে। তাদের মতো আমরাও অনেকে ভুলে যাই, নববর্ষে একটি বছরের সূচনার আনন্দের সঙ্গে আরেকটি বছর হারানোর বেদনাও জড়িয়ে আছে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের মতো এখানেও আমরা অতীতকে ভুলে যাই। অথচ আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের জন্যই প্রয়োজন ছিল তীব্র আত্মসমালোচনা ও অত্যধিক অনুশোচনার।

আমাদের দেশের অনেক জায়গায় নববর্ষকে বরণ করে নিতে আয়োজন করা হয় বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানের।

‘থার্টিফার্স্ট নাইট’ অভিধায় নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর নামে বছরের শেষ দিন রাতে দেশে অশ্লীলতার হিড়িক পড়ে। বিভিন্ন অসামাজিক ও অনৈতিক কার্যকলাপ বহুগুণে বেড়ে যায়। গ্রাম ও শহরের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ নগরীতে অশ্লীলতার মাত্রা বেশি দেখা যায়। বিভাগীয় শহরগুলোতে অভিজাত ক্লাবসহ বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট, আবাসিক হোটেল ও বিভিন্ন স্পটে রাতভর অসামাজিক কার্যকলাপ চলে। এতে থার্টিফার্স্ট নাইটের আড়ালে বছরের প্রথম প্রহর পঙ্কিল ও কদর্যপূর্ণ হয়। যে জাতি ও সমাজ বছরের প্রথম প্রহর অশ্লীলতা ও পাপাচারে লিপ্ত হয়, তাদের পরবর্তী দিনগুলো কতটা সুখকর ও কল্যাণমুখর হবে, তা সহজেই অনুমেয়।

ইসলাম সুস্থ বিনোদনচর্চায় উৎসাহিত করে, কিন্তু অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, নোংরামি ও প্রবৃত্তির অনুসরণের সঙ্গে ইসলাম কখনো আপস করে না। কাজেই প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য হলো, অতীত পাপের জন্য আল্লাহর দরবারে ক্ষমা চাওয়া ও ভবিষ্যৎ দিনগুলো যাতে সুন্দর-সমৃদ্ধ, পুণ্যময় হয়, সে জন্য দোয়া করা। পাশাপাশি নিজেকে শুধরে নেওয়ার অঙ্গীকার করা। মহান আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, ‘মাসিক আল-হেরা’ ও

উপসম্পাদক, ডেইলি মাইনিউজ



মন্তব্য