kalerkantho


শুরাভিত্তিক সমাজ গঠনের তাগিদ

ইকবাল কবীর মোহন

২৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



‘শুরা’ শব্দটির সঙ্গে মুসলিম মাত্রই পরিচিত। শুরা অর্থ পরামর্শ। ইসলামী পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় শুরার গুরুত্ব অনেক বেশি। কোরআনে শুরাভিত্তিক সমাজকাঠামোর ওপর সবিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে। মুসলিম দেশগুলোতে শুরা বর্তমানে খুব স্বাভাবিক একটি নিয়ম হিসেবে চালু আছে। যেসব মুসলিম দেশে একনায়কতন্ত্র, রাজতন্ত্র বা সামরিক স্বৈরশাসন চলছে, সেখানেও ‘শুরা কমিটি’, ‘শুরা কাউন্সিল’ বা ‘মজলিসে শুরা’ নামমাত্র চালু আছে। একই অবস্থা দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও মসজিদের মতো সংস্থাগুলোতে। তবে পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুসলিম অভিবাসীদের মধ্যে সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক অস্তিত্বের প্রয়োজনে যেসব কমিউনিটি গড়ে উঠছে, সেখানে শুরার উপস্থিতি দৃশ্যমান।   

কোরআনের আলোকে শুরার গুরুত্ব : মুসলিম জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে শুরার বিধান গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় শুরার গুরুত্ব অনেক বেশি। খেলাফত বা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে পরামর্শ নেওয়ার জন্য খলিফারা নির্দিষ্টসংখ্যক লোকের সমন্বয়ে ‘মজলিসে শুরা’ গঠন করতেন। কেননা আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের গুণাবলির কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন, ‘এবং তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শের ভিত্তিতে কর্ম সম্পাদন করে।’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ৩৮)

কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, মুসলিম উম্মাহ ‘মধ্যম উম্মত’। কোরআনের ভাষায়, ‘আর এভাবেই আমি তোমাদের মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা মানুষের ওপর সাক্ষী হও এবং রাসুল সাক্ষী হন তোমাদের ওপর।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৪৩) আর এই জাতির কর্ম সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘তারা এমন, যাদের আমি জমিনে ক্ষমতা দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, জাকাত দেবে এবং সৎ কাজের আদেশ দেবে ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৪১)

হাদিসে শুরার গুরুত্ব : পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করার মধ্যে যে কল্যাণ ও উপকারিতা নিহিত রয়েছে, তা মহানবী (সা.)-এর কথায়ই প্রমাণিত। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, ‘যদিও আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পরামর্শের কোনো প্রয়োজন নেই, তবুও আল্লাহ তাআলা আমাকে পরামর্শের নির্দেশ দিয়েছেন, এতে বহু রহমত ও বরকত রয়েছে। যারা পরামর্শ করে কাজ করবে, তারা কখনো উত্তম দিকনির্দেশনা থেকে বঞ্চিত থাকবে না। আর যারা পরামর্শ করে কাজ করবে না, তারা কখনো ভ্রান্তি থেকে নিষ্কৃতি পাবে না।’ (বায়হাকি)

মহানবী (সা.)-এর ও খলিফাদের জীবনে শুরা : আল্লাহর নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) অব্যাহত ওহির জ্ঞানে সমৃদ্ধ ছিলেন এবং আল্লাহ তাঁকে উন্নত নৈতিক গুণাবলি দ্বারা পরিচালিত করেছেন। তার পরও মহান আল্লাহ তাঁর নবীকে সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘এবং কাজকর্মে তুমি তাদের সঙ্গে পরামর্শ করবে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)

আল্লাহর নবী (সা.) তাঁর জীবনে শুরা বা পরামর্শের নীতি গ্রহণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.)-এর চেয়ে নিজ সঙ্গী-সাথিদের সঙ্গে অধিক পরামর্শকারী আমি আর কাউকে দেখিনি।’ (ফাতহুল করীম ফী সিয়ামাতিন নাবিয়্যিল আমিন : পৃষ্ঠা ২৪)

আল্লাহর নবীর জীবনে শুরাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূরি ভূরি প্রমাণ আছে। ওহুদ যুদ্ধের আগে মদিনা নগরীর বাইরে গিয়ে, না ভেতর থেকে যুদ্ধ মোকাবেলা করা হবে, তা নিয়ে মহানবী (সা.) তাঁর সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করেন।

মহানবী (সা.)-এর পর খলিফারা পরামর্শের ভিত্তিতে খেলাফত পরিচালনা করেছেন এবং দেশের সংকটকালে জ্ঞানী, বিচক্ষণ, দূরদর্শী ও ফকিহদের সঙ্গে পরামর্শ বৈঠক করতেন। হজরত আবু বকর (রা.) তাঁর খেলাফতকালে আনসার ও মুহাজির সাহাবিদের নিয়ে পরামর্শ করতেন। এসব বৈঠকে হজরত ওমর (রা.), ওসমান (রা.), আলী (রা.), আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.), মুয়াজ ইবন জাবাল (রা.) প্রমুখ সাহাবিরা উপস্থিত থাকতেন। হজরত ওমর (রা.)-এর সময় রাষ্ট্রের যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রথমে মজলিসে শুরায় উপস্থাপিত হতো। এখানে চুলচেরা বিশ্লেষণের পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতো। হজরত ওমর (রা.) বলেন, ‘পরামর্শ ছাড়া খেলাফত ব্যবস্থা চলতে পারে না।’ (মাআরেফুল কুরআন : পৃষ্ঠা ২১৪)

অন্যান্য খলিফার আমলেও মজলিসে শুরা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হতো। পরবর্তীকালে ইসলামী শাসনামলে এর প্রয়োজন মোটেও ফুরিয়ে যায়নি। তবে কার্যকর শুরাব্যবস্থার জন্য এর সদস্যদের অবশ্যই যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হবে। আর যোগ্যতার প্রকৃত মাপমাঠি হবে ইসলামী শরিয়ার ব্যুৎপত্তি ও তাকওয়া। হজরত ওমর (রা.) মজলিসে শুরায় এই যোগ্যতার লোকদের স্থান দিতেন বলে জানা যায়। এ বিষয়ে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলোতে ওই সব লোকের সঙ্গে পরামর্শ করবে, যারা আল্লাহকে ভয় করে।’ (মুসতাদরাকে হাকেম)

তা ছাড়া পরামর্শদাতারা স্বাধীন চিন্তা, মত প্রকাশ, তীক্ষ ধীশক্তি ও খোলাখুলি মতামত দেওয়ার অধিকার ভোগ করবেন। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই ইসলাম ও অন্যের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করা যাবে না। পরামর্শদাতা নেক নিয়তে, কল্যাণের স্বার্থে ও তাকওয়ার নিরিখে তাঁর মতামত ব্যক্ত করবেন। তিনি অবশ্যই মহানবী (সা.) প্রদর্শিত নীতি অবলম্বন করবেন।

স্বাধীন মতামত প্রকাশ করার বিষয়টি নবীজির সঙ্গে একজন অবিবাহিত মেয়ের কথোপকথন থেকে তুলে ধরা যায়। এক সাহাবি নবীজির কাছে এসে একটি মেয়েকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিলে মহানবী (সা.) মেয়েটিকে ওই সাহাবির সঙ্গে বিয়ের কথা বলেন। মেয়েটি তখন বলল, ‘হে আল্লাহর রসুল (সা.)! এটি কি আপনার নির্দেশ, না পরামর্শ?’ মহানবী (সা.) বললেন, ‘এটি আমার পরামর্শ।’ এরপর মেয়েটি দৃঢ়তার সঙ্গে বলল, ‘আমি কখনো ওই লোকটিকে বিয়ে কবর না।’ মেয়েটির কথা শুনে মহানবী (সা.) মোটেও রাগ করলেন না বা আহত হলেন না। এটিই ছিল মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা, যা মেয়েটি কার্যকর করেছে। আল্লাহর নবীর শিক্ষা হলো, কোনো মেয়েকে তার মতামত না নিয়ে বিয়ে দেওয়া যাবে না।

শুরা কি বাধ্যতামূলক?

প্রশ্ন হলো, শুরা কতটা বাধ্যতামূলক? এটা নিয়ে মুসলিম সমাজে বিভ্রান্তির শেষ নেই। আক্ষরিক অর্থে শুরা পরামর্শ করা বোঝায়। ব্যক্তিপর্যায়ে এক বন্ধু তার আরেক বন্ধুর কাছে কাউকে বিয়ের ব্যাপারে পরামর্শ চাইতে পারে। এ ক্ষেত্রে বন্ধুর পরামর্শ যা-ই হোক না কেন, তা বাধ্যতামূলক নয়। একজন আজীবন কার সঙ্গে ঘর-সংসার করবে, সেই ব্যক্তিগত বিষয়ে পরামর্শ মানা মোটেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তবে ব্যক্তিগতভাবে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ যখন কোরআনের আলোকে নির্দেশিত হয়ে থাকে, সে ক্ষেত্রে শুরা জরুরি। মহানবী (সা.)-কে নবী হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে সামরিক, রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বেলায় শুরার জন্য আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে শুরার দুটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে—এক. শুরা একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা, যা কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়। দুই. শুরা কোনো ভালো সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি উপায়, যে বিষয়ে আল্লাহর সরাসরি কোনো নির্দেশনা নেই। অতএব, ইসলামী সমাজের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সামগ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বেলায় শুরা বাধ্যতামূলক।

মূল কথা হলো, ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রে শুরাব্যবস্থা কায়েমের প্রয়োজন মেনে নিয়ে তা কিভাবে কতটা সফল ও কার্যকর করা যায়, তার উদ্যোগ থেকে বিরত থাকার কোনো সুযোগ নেই। কেননা শুরার মধ্যেই কল্যাণ। আর শুরা ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রাণ—এ কথা ভুলে গেলে চলবে না। বর্তমান দুনিয়ায় ইসলামী অনেক জরুরি বিধানের মতো এই বিষয়টিও গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে। আল্লাহপাক আমাদের শুরার গুরুত্ব বুঝে এ ব্যবস্থার কার্যকর প্রতিবিধানের তৌফিক দিন। আমিন।

লেখক : শিশুসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড



মন্তব্য