kalerkantho


১৯৭০ সালের নির্বাচনে ইসলাম প্রসঙ্গ

মাওলানা কাসেম শরীফ

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



১৯৭০ সালের নির্বাচনে ইসলাম প্রসঙ্গ

১৯৭০ সালের নির্বাচনের পথ ধরে আমাদের মহান স্বাধীনতার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল। বিবিধ কারণে ওই নির্বাচন বাঙালির জীবনে গুরুত্বপূর্ণ। সে সময় মহান স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কার্যক্রম কেমন ছিল, সেদিকে চোখ ফেরানো যাক। বঙ্গবন্ধু ধর্মের বিরুদ্ধে কখনো লড়াই করেননি। ইসলামের বিরুদ্ধে কখনো তাঁর অবস্থান ছিল না। তিনি লড়াই করেছেন জুলুম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে। তাঁর অবস্থান ছিল শোষণের বিরুদ্ধে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে বেগমগঞ্জের জনসমাবেশে শেখ মুজিব দেশবাসীর উদ্দেশে ঘোষণা করেন, ‘শোষক ও জালিমের বিরুদ্ধেই আমার জিহাদ।’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭০)

বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর একটি হাদিস স্মরণীয়। তিনি বলেছেন, ‘জালিম শাসকের সামনে সত্য কথা প্রকাশ করাই সর্বোত্তম জিহাদ।’ (আবু দাউদ : ৪৩৪৪, ইবনে মাজাহ : ৪০১১, তিরমিজি :  ২৩২৯)

১৯৭০ সালের ২৮ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু যে নির্বাচনী ভাষণ দিয়েছিলেন, তা বেতার-টেলিভিশনের মাধ্যমে সম্প্রচারিত হয়। সে ভাষণের শুরুর দিকে তিনি বলেছেন, ‘প্রিয় দেশবাসী ভাই-বোনেরা, আস্সালামু আলাইকুম! জনগণের মুক্তির জন্য যেসব বীর শহীদান রক্ত দিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন যেসব বীর সন্তান, তাঁদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে আমি আমার বক্তব্য শুরু করছি...।’

লক্ষণীয় যে একজন ঈমানদারের পক্ষেই শুধু সালাম বিনিময় ও মাগফিরাত কামনা করা সম্ভব।

এ ভাষণের অন্য জায়গায় বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘আমরা এ শাসনতান্ত্রিক নীতির প্রতি অবিচল ওয়াদাবদ্ধ যে কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশিত ইসলামী নীতির পরিপন্থী কোনো আইন এ দেশে পাস হতে বা চাপিয়ে দেওয়া যেতে পারে না।’ (মযহারুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব,  বাংলা একাডেমি, পৃষ্ঠা ৬০১ ও ৬১২)

আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে আওয়ামী লীগ ওই নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বঙ্গবন্ধু যে বিবৃতি দিয়েছেন, সেটিও স্মরণীয়। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের জনগণ এক ঐতিহাসিক রায় প্রদান করিয়াছে। তাহারা এক অবিরাম সংগ্রামের মধ্যে দিয়া তাহাদের এই রায় প্রদানের অধিকার অর্জন করিয়াছে আর সেই অবিরাম সংগ্রামে হাজার হাজার মানুষ জীবন উৎসর্গ করিয়াছে এবং অগণিত মানুষ বৎসরের পর বৎসর ধরিয়া নিপীড়ন সহ্য করিয়াছে। জনগণের সংগ্রামকে উহার বিরাট বিজয়ে মণ্ডিত করার জন্য আমরা সর্বশক্তিমান আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞ।’ (মযহারুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, বাংলা একাডেমি, পৃষ্ঠা ৬৪৩)

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে পাকিস্তান বেতারে জাতির উদ্দেশে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তাতে ইসলামের চিরন্তন কল্যাণকামী রূপের প্রতি তিনি কতটুকু মোহিত, তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন—‘আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে, আমরা ইসলামে বিশ্বাসী নই। এ কথার জবাবে আমাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য—আমরা লেবাসসর্বস্ব ইসলামে বিশ্বাসী নই। আমরা বিশ্বাসী ইনসাফের ইসলামে। আমাদের ইসলাম হজরত রাসুলে করিম (সা.)-এর ইসলাম, যে ইসলাম জগদ্বাসীকে শিক্ষা দিয়েছে ন্যায় ও সুবিচারের অমোঘ মন্ত্র। ইসলামের প্রবক্তা সেজে পাকিস্তানের মাটিতে বারবার যারা অন্যায়-অত্যাচার, শোষণ-বঞ্চনার পৃষ্ঠপোষকতা করে, আমাদের সংগ্রাম সেই মুনাফিকদের বিরুদ্ধে, যে দেশের ৯৫ শতাংশ মুসলমান, সে দেশে ইসলামবিরোধী আইন পাসের ভাবনা ভাবতে পারেন তাঁরাই—ইসলামকে যাঁরা ব্যবহার করেন দুনিয়াটা শায়েস্তা করার জন্য।’

বঙ্গবন্ধু তাঁর এ অমূল্য ভাষণে ইসলাম, ইসলামের সুমহান শিক্ষা, অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে ইসলামের আপসহীন অবস্থানের প্রতি তাঁর সুদৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।

নির্বাচনের পর বঙ্গবন্ধুর ঈমানদীপ্ত শপথ

১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি পৌষের হাড়কাঁপানো শীত উপেক্ষা করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অগ্নিসাধক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ডাকে বাংলার দশ দিগন্ত থেকে বানের স্রোতের মতো লাখ লাখ মানুষ সমবেত হয় ঢাকার রেসকোর্স (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ময়দানে। নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি, স্বাধিকারের প্রশ্ন ও সংবিধান প্রণয়নে বাংলার মানুষের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ গণপ্রতিনিধিদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান গণ-মহাসমুদ্রের রূপ ধারণ করে। শপথবাক্য পাঠ করানোর প্রাক্কালে দুপুর ২টা ১০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মঞ্চে আরোহণ করেন। বঙ্গবন্ধুর ডানে ও বাঁয়ে যথাক্রমে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত সদস্যরা আর সম্মুখপানে যত দূর দৃষ্টি যায়, জনতার মহাসমুদ্র। ডান হাত ওপরে তুলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা যখন অন্যায়-অবিচার বিদূরিত করে সত্য-ন্যায় প্রতিষ্ঠার নিরলস সংগ্রামের মন্ত্র উচ্চারণ করছিলেন, তখন জনসমুদ্র ছিল স্তব্ধ-নীরব, পিনপতন-নিস্তব্ধ। শপথনামার প্রতিটি শব্দ-বাক্য তাঁদের মননে ও চৈতন্যে প্রোথিত করেছিল প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। কী অঙ্গীকার, কী প্রতিশ্রুতি আর কী প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছিল সেদিনের সেই শপথনামায়? ড. আতিউর রহমান লিখেছেন—

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আল্লাহর অনুগ্রহে বঙ্গবন্ধুর দল বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি দলের মনোনয়নে বিজয়ী কেন্দ্রীয় পরিষদের ১৫১ এবং প্রাদেশিক পরিষদের ২৬৭ জন সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা বাস্তবায়নের শপথ নেন। এই শপথ অনুষ্ঠান তিনি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে সম্পন্ন করেন। এই ঘটনার সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল। (আতিউর রহমান, মুক্তিযুদ্ধের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ : ১৯৯৭, পৃষ্ঠা ১০৬)

এ প্রসঙ্গে আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন, “হলফ্নামা একটি ছাপা দলিল। আল্লাহর নামে এই হলফ্নামার শুরু হয়েছিল। আরবি ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’-এর হুবহু বাংলা তরজমা করিয়া লেখা হইয়াছিল : পরম করুণাময় আল্লাহর নামে হলফ্ করিয়া আমি অঙ্গীকার করিতেছি যে আমাদের নির্বাচনী ওয়াদা ছয় দফা অনুসারে শাসনতান্ত্রিক সংবিধান রচনা করিব।” (আবুল মনসুর আহমদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, খোশরোজ কিতাব মহল, বাংলাবাজার, ঢাকা, পৃষ্ঠা ৫৪১)

অধ্যাপক মযহারুল ইসলামের লেখায় ওই হলফনামার বিবরণ পাওয়া যায়। দৈনিক পাকিস্তান, ০৪-০১-১৯৭১-এর বরাতে তিনি লিখেছেন, ‘আমরা জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগ দলীয় নির্বাচিত সদস্যবৃন্দ শপথ গ্রহণ করিতেছি পরম করুণাময় ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলার নামে। আমরা শপথ গ্রহণ করিতেছি সেই সব বীর শহীদের ও সংগ্রামী মানুষের নামে, যাঁহারা আত্মাহুতি দিয়া ও চরম নির্যাতন-নিপীড়ন ভোগ করিয়া আজ আমাদের প্রাথমিক বিজয়ের সূচনা করিয়াছেন; আমরা শপথ গ্রহণ করিতেছি এই দেশের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, মেহনতি মানুষ তথা সর্বশ্রেণির জনসাধারণের নামে, জাতীয় সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে এই দেশের আপামর জনসাধারণ আওয়ামী লীগের কর্মসূচি ও নেতৃত্বের প্রতি যে বিপুল সমর্থন ও অকুণ্ঠ আস্থা জ্ঞাপন করিয়াছেন, উহার মর্যাদা রক্ষাকল্পে আমরা সর্বশক্তি নিয়োগ করিব। ছয় দফা ও এগারো দফা কর্মসূচির ওপর প্রদত্ত সুস্পষ্ট গণরায়ের প্রতি আমরা একনিষ্ঠরূপে বিশ্বস্ত থাকিব এবং শাসনতন্ত্র ও বাস্তব প্রয়োগে ছয় দফা কর্মসূচিভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন ও এগারো দফা কর্মসূচির প্রতিফলন ঘটাইতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করিব। আওয়ামী লীগের নীতি, আদর্শ, উদ্দেশ্য ও কর্মসূচির প্রতি অবিচল আনুগত্য জ্ঞাপনপূর্বক আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে অঞ্চলে অঞ্চলে ও মানুষে মানুষে বিরাজমান চরম রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের চির অবসান ঘটাইয়া শোষণমুক্ত এক সুখী সমাজের বুনিয়াদ গড়িবার এবং অন্যায়-অবিচার বিদূরিত করিয়া সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলস প্রচেষ্টা চালাইয়া যাইব; জনগণ অনুমোদিত আমাদের কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির প্রয়াসী যেকোনো মহল ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে আমরা প্রবল প্রতিরোধ আন্দোলন গড়িয়া তুলিব এবং সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাকল্পে যেকোনোরূপ ত্যাগ স্বীকারকরত আপসহীন সংগ্রামের জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত থাকিব। আল্লাহ আমাদের সহায় হউন। জয় বাংলা। জয় পাকিস্তান।’ (মযহারুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, বাংলা একাডেমি, পৃষ্ঠা ৬৫১-৬৫২)

১৯৭১ সালে আওয়ামী লীগের খসড়া সংবিধানে ধর্মীয় মূল্যবোধ

১৯৭০ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আওয়ামী লীগ সংবিধান কমিটি ছয় দফা ভিত্তিক যে খসড়া সংবিধান প্রণয়ন করেছিল, তাতে ইসলাম ধর্মকে দেওয়া হয়েছিল আলাদা মর্যাদা। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্রে বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে এভাবে—

‘ক. ৩য় ভাগ-নির্দেশমূলক রাষ্ট্রীয় মূলনীতি

১. ইসলাম

১. পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর আজ্ঞাগুলোর খেলাপি কোনো আইন প্রণয়ন করা হবে না।

২. পাকিস্তানের মুসলমানদের পবিত্র কুরআন ও ইসলামিয়াত শিক্ষার সর্বসুযোগ প্রদান করতে হবে।

৩. পাকিস্তানের মুসলমানদের ধর্মীয় কর্মগুলো পালনে নৈতিক মান উন্নয়ন সাধন করতে হবে।’

(হাসান হাফিজুর রহমান, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা : ৭৯৩)

এই দীর্ঘ আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে মহান স্বাধীনতার সর্বাধিক শক্তিশালী প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল যে সত্তরের নির্বাচন, তার সঙ্গে ইসলামের বৈরিতা নেই, আছে বন্ধুত্ব। বলতে দ্বিধা নেই যে বাঙালির মননে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও মানবতার ধর্ম ইসলাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

লেখক : তাফসিরকারক ও সাংবাদিক

kasemsharifcu@gmail.com



মন্তব্য