kalerkantho


মুহাম্মদ (সা.)-এর হিজরতের স্মৃতিবিজড়িত বাংলা সন

ড. মুহাম্মদ আবদুল হাননান

২১ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



(গত সংখ্যার পর)

সিরাজির কৃতিত্ব হলো, সন তৈরি করতে তিনি হিজরি সনের মর্যাদা ক্ষুণ্ন না করেই তার ওপর ভিত্তি করে নতুন সৌর সন তৈরি করেছেন। এতে ফারসি গুরগানি পদ্ধতি যেমন ব্যবহার করেন, তেমনি ভারতীয় শকাব্দের থেকেও দিন ও মাসের নামগুলো গ্রহণ করেন।

আগের ইলাহি সনে বছরের প্রথম দিনটি নওরোজ উৎসবের দিন বলে গৃহীত হয়েছিল, এটি ছিল ফারসি বর্ষপঞ্জির প্রভাব। বাংলা সনেও এর প্রভাব চলে এলো পহেলা বৈশাখ ও নববর্ষ উৎসবের দিন।

সিরাজি বাংলা সনের নামগুলো গ্রহণ করেছিলেন প্রাচীন ভারতীয় শকাব্দ থেকে। বঙ্গাব্দ ও শকাব্দের এখানেই সেতুবন্ধ। শকাব্দের বর্ষ শুরু হয় চৈত্র মাসে, বঙ্গাব্দের বর্ষ শুরু হয় বৈশাখ মাসে। তবে বর্ষ গণনার প্রথম দিকে বাংলা সন শুরু হয়েছিল অগ্রহায়ণ মাস থেকে। অগ্রহায়ণ অর্থেও রয়েছে বর্ষ শুরু। বছরের অগ্রে যে যায়, সে হলো অগ্রহায়ণ। (বাংলা সনের জন্মকথা পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা-২১)

এটা ধান উৎপাদনের মাসও।

সিরাজি যেহেতু ফসলি সন করেছিলেন বঙ্গাব্দকে, সেদিক থেকে তিনি ঠিকই করেছিলেন অগ্রহায়ণ দিয়ে বর্ষ শুরু করে। বর্তমানে বাংলা সনে অগ্রহায়ণ অষ্টম মাস।

বাংলা মাসের নামগুলো একটি বাদে সবই এসেছে নক্ষত্রের নাম থেকে। যেমন—বিশাখা থেকে বৈশাখ, জ্যেষ্ঠা থেকে জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়া থেকে আষাঢ়, শ্রবণা থেকে শ্রাবণ, ভাদ্রপাদ থেকে ভাদ্র, আশ্বিনী থেকে আশ্বিন, কৃত্তিকা থেকে কার্তিক, (ব্যতিক্রম হলো) অগ্রহায়ণ, পুষা থেকে পৌষ, মঘা থেকে মাঘ, ফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন, চিত্রা থেকে চৈত্র।

এখানে শুধু অগ্রহায়ণ মাসটিই নক্ষত্রের নামে নয়। ‘হায়ণ’ অর্থ বছর, অগ্রহায়ণ মানে বছরের আগে বা বছরের শুরু। পরে ফসলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বৈশাখ মাসকে প্রথম মাস করা হয়। আগে বৈশাখ মাসে চৈতালি ফসল তোলা হতো বলে কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন। (মুহম্মদ আবু তালিব, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা-২৬)

তবে আবহাওয়ার নানা রকম বিবর্তনে ঋতুবৈচিত্র্যেও পরিবর্তন ঘটেছে। অনেক কিছুতেই বিষয় ও ফলাফলের মিল পাওয়া যাবে না। যেমন—আমাদের অভিধানে ‘মধু মাস’ নামে একটি শব্দ আছে; কিন্তু এর অর্থ দেওয়া আছে ‘চৈত্র’ মাস। (বাংলা একাডেমি সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান, সম্পাদক আহমদ শরীফ, ঢাকা ১৯৯৬, পৃষ্ঠা ৪৪৬-৪৪৭)। হয়তো একসময় চৈত্র মাসেই রসাল ফলগুলো প্রকাশিত হতো, তাই চৈত্র মাসকে মধু মাস বলা হতো; কিন্তু এখন রসাল ফল বাজারে আসে প্রধানভাবে জ্যৈষ্ঠ মাসে। ফসলি সনের হিসাবে এমনি ঘটনা থাকতে পারে। অগ্রহায়ণ মাস প্রথম স্থান থেকে অষ্টম স্থানে চলে যায়, সে স্থান দখল করে নেয় বৈশাখ মাস।

বাংলা সনের প্রাথমিক যুগে এমন কিছু ভাঙাগড়া হয়েছে। দুনিয়ার বিভিন্ন সনের ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা আছে। খ্রিস্টীয় সন আগে শুরু হতো মার্চ মাস দিয়ে, পরে জানুয়ারির প্রথম মাস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

বাংলা সন প্রথম থেকেই রাশি ও তিথি মেনে চলে। বারোটি রাশি : মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ, কন্যা, তুলা, বিছা, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীন। বাংলা সন তিথিও মেনে চলে। এগুলোর মধ্যে অমাবশ্যা ও পূর্ণিমা গুরুত্বপূর্ণ। ২৪ ঘণ্টায় এক দিন এবং সাত দিনে (সপ্ত অহের সমাহারে) সপ্তাহ নির্ধারিত রয়েছে এ সনে। তবে চার সপ্তাহে এক মাস কখনো বলা হয় না, বলা হয় ৩০ দিনে এক মাস। ১২ মাসে এক বছর। এখানে বৈচিত্র্য হলো মাস গণনা হয় চান্দ্র পদ্ধতিতে কিন্তু সন সৌর। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও নৃগোষ্ঠীর ধর্মাবলম্বীরা ধর্মীয় ও বিয়ে এবং অন্য অনুষ্ঠানাদিতে এভাবেই হিসাব করে চলে। বাংলা সন তাই অনেকটা মিশ্ররীতির সনও।

উপসংহার

আমির ফতেহ উল্লাহ সিরাজি ছিলেন এই বাংলা সনের জনক। তাঁর সৃজনশীল চিন্তা ও মননশীলতায় দুনিয়ার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে, যা আজও টিকে আছে। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে একদল পণ্ডিত সিরাজীর সনের সামান্য সংশোধন করেন। এতে অতিবর্ষ (লিপইয়ার) পদ্ধতি যুক্ত হয়ে বাংলা সন অপেক্ষাকৃত বিজ্ঞানভিত্তিক রূপ লাভ করেছে।

এখন বঙ্গাব্দের ১৪২৩ বিদায়ের পর ১৪২৪-এর যাত্রা শুরু হয়েছে। বছরের প্রথম দিনে উৎসবে মেতে উঠেছে গোটা জাতি। কিন্তু একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, বাংলা সনটি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর স্মৃতিবিজড়িত একটি ঘটনার সঙ্গে জড়িত। হিজরি সনের মতোই বাংলা সনটিকে তাই পবিত্র মনে করতে হবে। প্রতিবছরই নববর্ষ পালনের নামে আমরা যেসব উৎসব করি, তাতে নতুন নতুন নানা রকম আপত্তিকর বিষয় যুক্ত হচ্ছে। আগে এ রকমটা ছিল না, এসব বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। সাপ, বিচ্ছু, কচ্ছপ—এসবের প্রতিকৃতি নিয়ে মিছিল ও উন্মাদনা প্রকাশের ঘটনা বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে মানায় না। এসব অপসংস্কৃতির সঙ্গে বখাটেরা যুক্ত হয়ে নানা অপঘটনার জন্ম দিচ্ছে। এর পবিত্রতার দিনটি ম্লান করে দিচ্ছে। আমাদের ঠাণ্ডা মাথায় বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার।   (সমাপ্ত)

 

লেখক : বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক

drhannapp@yahoo.com


মন্তব্য