kalerkantho


মেরাজের তাৎপর্য ও শিক্ষা

মুফতি মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম

২১ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক যুগেই নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন। কোনো যুগ নবী-রাসুল থেকে খালি ছিল না। তাঁদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী হলেন আমাদের প্রিয় নবী (সা.)। তিনি সাইয়্যেদুল আম্বিয়া তথা নবী-রাসুলদের সর্দার। আল্লাহ তাআলা  ইরশাদ করেন, ‘হে রাসুল! আমি আপনাকে গোটা মানবজাতির জন্য রাসুল হিসেবে প্রেরণ করেছি। ’ (সুরা : সাবা, আয়াত : ২২) মহানবী (সা.)-এর নবুয়তকে শক্তিশালী করার জন্য অন্য নবী-রাসুলদের মতো তাঁকেও দেওয়া হয়েছে অগণিত মুজিজা। তন্মধ্যে মেরাজ অন্যতম।

ইসরা ও মেরাজের  মধ্যে পার্থক্য : ইসরা অর্থ নৈশভ্রমণ, রাত্রিকালীন ভ্রমণ। আর মেরাজ অর্থ সিঁড়ি, ঊর্ধ্বলোকে গমন, সোপান, মই। মেরাজ তথা ঊর্ধ্বলোকে গমনের কথা হাদিস দ্বারা আর ইসরা তথা নৈশভ্রমণের কথা কোরআন মজিদ দ্বারা প্রমাণিত। ইসরাকে অস্বীকারকারী কাফির হবে, কিন্তু মেরাজকে অস্বীকারকারী কাফির হবে না, তবে মহাপাপী হবে।

মেরাজ কখন সংঘটিত হয় : মেরাজ কখন সংঘটিত হয় এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। হজরত মুসা ইবনে ওকবা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে মিরাজের ঘটনা হিজরতের ছয় মাস আগে সংঘটিত হয়। ইমাম নববী ও কুরতুবির মতে, মিরাজের ঘটনা মহানবী (সা.)-এর নবুয়তপ্রাপ্তির পাঁচ বছর পর ঘটেছে। ইবনে ইসহাক বলেন, মিরাজের  ঘটনা তখন ঘটেছিল, যখন ইসলাম আরবের সব গোত্রে ছড়িয়ে পড়েছিল। ইমাম হরবি বলেন, ইসরা ও মিরাজের ঘটনা রবিউস সানি মাসের ২৭ তারিখ রাতে হিজরতের এক বছর আগে ঘটেছিল। ইবনে কাসেম সাহাবি বলেন, নবুয়তপ্রাপ্তির ১৮ মাস পর এ ঘটনা ঘটেছে। বেশির ভাগ মতে, নবুয়তের দশম বর্ষে রজব মাসের ২৭ তারিখে মিরাজের  ঘটনা সংঘটিত হয়। তিবরানি (রহ.) বলেছেন, যে বছর মহানবী (সা.)-কে নবুয়ত দেওয়া হয়, সে বছরই মেরাজ  সংঘটিত হয়। কারো মতে হিজরতের ১৬ মাস আগে রমজান মাসে মেরাজ সংঘটিত হয়। (আর রাহিকুল মাখতুম)

ভ্রমণের সূচনা : হাদিসের ভাষ্য মতে, মিরাজের সূচনা হয় মসজিদে হারাম থেকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) রজব মাসের ২৭-এর রজনীতে আল্লাহ তাআলার ঘরের হিজরের মাঝে শায়িত ছিলেন, এমন সময় হজরত  জিবরাইল (আ.) এসে জাগ্রত করে তাঁর বক্ষ মুবারক বিদীর্ণ করে দূষিত রক্ত বের করে আবার জোড়া লাগিয়ে দেন। অতঃপর বোরাকে করে সশরীরে বায়তুল মাকদাসে নিয়ে যান। বোরাক হলো এমন একটি প্রাণী, যা গাধা ও খচ্চরের মাঝামাঝি আকৃতির একটি জন্তু। তার দুই উরুতে রয়েছে দুটি পাখা। তা দিয়ে সে পেছনের পায়ে ঝাপটা দেয়, আর সামনের দৃষ্টির শেষ সীমায় পা ফেলে। প্রিয় নবী (সা.) বায়তুল মাকদাসের দরজায় খুঁটির সঙ্গে বোরাকটি বেঁধে যাত্রাবিরতি করেন এবং সব নবীর ইমাম হয়ে নামাজ আদায় করেন। (আর রাহিকুল মাখতুম)।

ঊর্ধ্ব গমন : বায়তুল মাকদাসে দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ নামাজ আদায় করার পর সিঁড়ি আনা হয়, যাতে নিচ থেকে ওপরে যাওয়ার জন্য ধাপ বানানো ছিল। তিনি সিঁড়ির সাহায্যে প্রথমে প্রথম আকাশে, অতঃপর অবশিষ্ট আকাশগুলোয় গমন করেন। এ সিঁড়িটি কী এবং কেমন ছিল, তার প্রকৃত স্বরূপ আল্লাহ তাআলাই জানেন। প্রতিটি আকাশে সেখানকার ফেরেশতারা তাঁকে অভ্যর্থনা জানান এবং প্রত্যেক আকাশে অবস্থানরত পয়গম্বরদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। প্রথম আকাশে হজরত আদম (আ.)-কে, দ্বিতীয় আকাশে হজরত ইয়াহিয়া ও ঈসা (আ.)-কে, তৃতীয় আকাশে হজরত ইউসুফ (আ.)-কে, চতুর্থ আকাশে হজরত ইদরিস (আ.)-কে, পঞ্চম আকাশে হজরত হারুন (আ.)-কে, ষষ্ঠ আকাশে হজরত মুসা (আ.)-কে এবং সপ্তম আকাশে হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে দেখতে পান। তিনি সাহাবায়ে কেরামের কাছে হজরত ঈসা ও মুসা (আ.)-এর আকৃতিও বর্ণনা করেছেন। নবীদের স্থানগুলো অতিক্রম করে এক ময়দানে পৌঁছেন। যেখানে ভাগ্যলিপি লেখার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। তারপর তিনি সিদরাতুল মুনতাহা গমন করেন, যেখানে আল্লাহ তাআলার নির্দেশে স্বর্ণের প্রজাপতি এবং বিভিন্ন রঙের প্রজাপতি ইতস্তত ছোটাছুটি করছে। ফেরেশতারা স্থানটি ঘিরে রাখছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) সেখানে হজরত জিবরাইল (আ.)-কে তাঁর স্বরূপে দেখেন। তাঁর ছয় শ পাখা। সেখানে তিনি একটি দিগন্তবেষ্টিত সবুজ রঙের ‘রফরফ’ দেখতে পান। রফরফ হলো সবুজ রঙের গদিবিশিষ্ট পালকি। রফরফের মাধ্যমে তিনি স্বীয় রবের কাছে গমন করেন। এ সফরে তাঁকে কয়েকটি জিনিস দেখানো হয়। তাঁকে দুধ ও মদ দেওয়া হয়েছিল। তিনি দুধ গ্রহণ করেন। এটা দেখে হজরত জিবরাইল (আ.) বলেন, আপনি স্বভাবগত বস্তু গ্রহণ করেছেন। আপনি মদ গ্রহণ করলে আপনার উম্মত পথভ্রষ্ট হয়ে যেত। তাঁকে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখানো হয়। জাহান্নামিদের শাস্তিও তিনি অবলোকন করেন। জাহান্নামের দারোগা মালেককে দেখেছেন, তিনি হাসেন না। তাঁর চেহারায় হাসির কোনো চাপও নেই।

মেরাজ কি সশরীরে হয়েছে না আত্মিক হয়েছে : মহানবী (সা.)-এর মেরাজ সশরীরে হয়েছে। তাঁর দেহ ও আত্মা উভয়ই মিরাজে গমন করেছে। কেননা আল্লাহ তাআলা প্রিয় নবী (সা.)-এর মেরাজ গমনকে তাঁর এক বিশেষ মুজিজা হিসেবে গুরুত্ব সহকারে কোরআন মজিদে বর্ণনা করেছেন। যদি মেরাজ গমন কেবল আত্মিক হতো, তবে তা তার মুজিজা হতো না। কেননা মুজিজা কখনো গাইরে নবী থেকে প্রকাশ পেতে পারে না। অথচ বেহেশত, দোজখ, আরশ, কুরসি পর্যন্ত কোনো কোনো আউলিয়াও আত্মিকভাবে সফর করতে পারেন। অবশ্য কোনো অলি সশরীরে তথায় গমন করতে অক্ষম। সুতরাং মেরাজ গমন সশরীরে সংঘটিত হয়েছে বলে স্বীকার করলেই তা মুজিজা হিসেবে গণ্য হয়। কোরআন  মজিদে বর্ণিত আয়াতের শব্দের প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় যে মহানবী (সা.)-এর মেরাজ গমন সশরীরেই সংঘটিত হয়েছিল। যেমন—‘সব দুর্বলতা থেকে পবিত্র ওই আল্লাহ, যিনি নিজের (সর্বশ্রেষ্ঠ) ‘আবদ’-কে—অর্থাৎ বান্দাকে রাতারাতি মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত নিয়ে গেছেন। ’ এখানে বিশ্বনবীর নাম মুবারকের স্থলে আল্লাহর বিশেষ আবদ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা মহানবীর একটি বিশেষণ। ‘আবদ’ শব্দের অর্থ হলো বান্দা, এই আবদ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে ইবাদত থেকে। ইবাদত অর্থ বন্দেগি। রুহবিহীন দেহ ‘আবদ’ নয় এবং দেহবিহীন রুহও আবদ নয়। বরং আবদ হতে হলে রুহ ও দেহ দুটিই সম্মিলিতভাবে থাকতে হয়। কাজেই মিরাজের  ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা যখন আপন ‘আবদ’-কেই নিয়ে গেছেন বলে উল্লেখ আছে, তখন প্রমাণিত হয়েছে যে রুহ ও দেহ উভয়ই নিয়ে গেছেন।

আকাশের অগ্নি, শীত ইত্যাদি পরিমণ্ডল কিভাবে অতিক্রম করেছেন : যে মহাশক্তির মালিক আল্লাহ, তাঁর এই ক্ষমতাও আছে যে তিনি ক্ষণিকের জন্য তাঁর হাবিবকে ওই সব পরিমণ্ডল পার করার সময় শীতমণ্ডল সাময়িকভাবে গরম করতে পারেন এবং অগ্নিমণ্ডল ঠাণ্ডা করতে পারেন। যেমন হজরত  ইবরাহিম (আ.)-এর জন্য নমরুদের অগ্নিকুণ্ড ঠাণ্ডা করে দিয়েছিলেন। যেমন আল্লাহ তাআলা  বলেন, ‘আমি বলেছিলাম, হে আগুন, তুমি ইবরাহিমের জন্য (ক্ষণিকের তরে) ঠাণ্ডা ও নিরাপদ হয়ে যাও। ’ অধিকন্তু, এটি সবার পরীক্ষিত বিষয় হলো—বেশি ঠাণ্ডা অথবা জ্বলন্ত অগ্নিশিখা খুব দ্রুত অতিক্রম করলে ঠাণ্ডা বা গরম তাকে স্পর্শ করতে পারে না। যেমন জ্বলন্ত চেরাগের অগ্নিশিখার মধ্যে কেউ দ্রুত আঙুল সঞ্চালন করলে তার আঙুল পুড়ে যায় না, এমনকি তার লোমও জ্বলে না। অনুরূপভাবে মহানবী (সা.)-কে তাঁর প্রতিপালক আল্লাহ তাআলা শীতমণ্ডল ও অগ্নিমণ্ডল এত দ্রুত পার করে নিয়ে গেছেন যে তাঁকে আগুন স্পর্শই করতে পারেনি। আর বিশ্বনবী (সা.)-এর চলার গতি ছিল বিদ্যুতের গতি থেকেও দ্রুত।

মিরাজের শিক্ষা : মিরাজের ঘটনা থেকে মুমিন খুঁজে পায় সঠিক পথের দিশা, লাভ করে আল্লাহর অপার অনুগ্রহ ও দ্বিনের অবিচলতা। আমাদের প্রিয় নবী (সা.) যে আল্লাহ তাআলার কাছে কত দামি ও মর্যাদার অধিকারী, তা এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়। তাঁকে এমন মর্যাদা দান করা হয়েছে, যা অন্য কোনো নবীকে দান করা হয়নি। এ ঘটনার ফলে মুমিনের ঈমান মজবুত হয় এবং হূদয়ে বিশ্বনবী (সা.)-এর ভালোবাসা সুগভীর হয়।

 

লেখক : প্রধান ফকিহ, আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী


মন্তব্য