kalerkantho


কী পড়ানো হয় কওমি মাদরাসায়

আরিফুর রহমান   

২১ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



কী পড়ানো হয় কওমি মাদরাসায়

কওমি মাদরাসায় দরসে নিজামিয়া নামক ঐতিহাসিক পাঠ্যক্রমের অনুসরণ করা হয়। মুসলিম শাসনামলে মুসলমানদের পাঠ্যসূচিতে বাগদাদের দরসে নিজামিয়া সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিল। সেলজুকি সুলতান আলপ আরসালান ও মালিক শাহের স্বনামধন্য মন্ত্রী ছিলেন ‘নিজামুল মুলক তুসি’। তিনি ১০৬৫ সালে দুই লাখ দিনার ব্যয় করে বাগদাদে নিজামিয়া নামে একটি পাঠশালা স্থাপন করেন। এ প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তী কয়েক শ বছর মুসলিম বিশ্বে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান বিস্তারে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পালন করে। এতে যে শিক্ষাপদ্ধতি প্রবর্তিত হয় এবং যে পাঠ্যসূচি অনুসৃত হয়, সেটিই দরসে নিজামিয়া নামে পরিচিত। এই পাঠ্যসূচির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এতে ধর্মীয় ও লৌকিক উভয় বিষয়ের জ্ঞান-বিজ্ঞান অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেখানে ধর্মতত্ত্ব, যুক্তিবিদ্যা, মনোদর্শন, ইতিহাস, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, ব্যাকরণ, হাদিস, ইসলামী আইন, তাফসির ইত্যাদি ছিল উল্লেখযোগ্য। সে সময় পাঠ্যসূচি বলতে শুধু দরসে নিজামিয়া ছিল।

উপমহাদেশে দরসে নিজামিয়া যেভাবে এলো

সপ্তদশ শতকে শাহ আবদুর রহিম (রহ.) উপমহাদেশে ভিন্ন ধারার ধর্মীয় শিক্ষা প্রচলন করেন। অষ্টাদশ শতকের শুরুতে তাঁরই পুত্র শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) (১৭০২-১৭৬০) পিতার অনুকরণে উপমহাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আরো উন্নত করতে প্রয়াসী হন। এরই সঙ্গে লখনউতে মোল্লা নিজামুদ্দীন (রহ.) নতুন দরসে নিজামিয়া  প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে ঐতিহাসিক বিভ্রান্তি দূর করার জন্য এ বিষয়টি উল্লেখ করা জরুরি যে আধুনিক ভারতের প্রচলিত দরসে‘ নিজামিয়া’র প্রকৃত উদ্ভাবক হলেন মোল্লা কুতুবুদ্দীন শহীদ (রহ.)। ১৬৯১ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইন্তেকাল করেন। কিন্তু তাঁর পুত্র নিজামুদ্দীন শাহ ওয়ালিউল্লাহ ও পিতা কুতুবউদ্দীনের শিক্ষাব্যবস্থার সমন্বয়ে ওই পাঠ্যসূচিকে আরো উন্নত করেন। অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ থেকে তাঁর নামেই দরসে নিজামিয়া প্রবর্তিত ও প্রচারিত হয়। লখনউর দরসে নিজামিয়ায় আদি প্রধান বিষয় ও প্রতি বিষয়ে পাঠ্যপুস্তকের সংখ্যা ছিল নিম্নরূপ :

১. আরবি ব্যাকরণ (ক) সরফ (শব্দ প্রকরণ)-৭;

(খ) নাহ্উ (বাক্য প্রকরণ)-৫

২. মানতিক (তর্কশাস্ত্র)-৮

৩. হিকমত (দর্শন ও বিজ্ঞান)-৩

৪. রিয়াদি ও হাইআত (গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা)-৫

৫. বালাগাত (অলংকারশাস্ত্র)-২

৬. ফিক্হ (ইসলামী আইন)-৩

৭. উসুলুল ফিক্হ (ইসলামী আইনের নীতিমালা)-৪

৮. কালাম (স্রষ্টা ও ধর্মতত্ত্ব)-৪

৯. তাফসির (কোরআনের ব্যাখ্যা)-২

১০. হাদিস-১

এটাও সত্য যে বাগদাদের দরসে নিজামিয়া  আর লখনউর দরসে নিজামিয়ার মধ্যে সামঞ্জস্য ছিল। কিন্তু দুটি শিক্ষাব্যবস্থাই পদ্ধতিগতভাবে স্বতন্ত্র ছিল। (বিস্তারিত দেখুন : G.M.D Suffi Al-Minhaj, Lahore, 1914, p.72; A. K. M Ayub Ali, History of Islamic Education in Bangladesh, Dhaka, 1983, pp.35-36)

এই দরসে নিজামিয়া পাঠ্যসূচির বৈশিষ্ট্য হলো, সব বিষয়ের সহজতম গ্রন্থ থেকে শুরু করে ক্রমে কঠিন ও ব্যাপকতর গ্রন্থ তালিকাভুক্ত ছিল। এতে ছাত্ররা সে বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জনে সক্ষম হতো। প্রথম দিকে দরসে নিজামিয়ার শিক্ষার মাধ্যম ছিল সরকারি ভাষা ফারসি। আর উচ্চশিক্ষায় আরবি ভাষার ব্যাপক চর্চা হতো। গবেষক আবদুল্লাহ আল-মাসুম লিখেছেন : ‘মুসলিম আমলে বাংলার পাঠ্যক্রম শুধু জনপ্রিয়তাই লাভ করেনি, মানের ক্ষেত্রেও উন্নতির শিখরে আরোহণ করেছিল। সমসাময়িক বর্ণনায় এর প্রমাণ পাওয়া যায়। উইলিয়াম অ্যাডাম বাংলার আরবি উচ্চশিক্ষার মাদরাসাগুলোর পাঠ্যসূচির প্রশংসা করে বলেন, আরবি বিদ্যালয়ে ব্যাকরণ পাঠ অনেক বেশি সুসংহত। দর্শনশাস্ত্র, তর্কশাস্ত্র ও আইন নিয়মিত পঠিত হয়। ইসলাম সম্পর্কে এখানে সুগভীরভাবে আলোচনা হয়। ইউক্লিডের জ্যামিতি, টলেমির জ্যোতিষশাস্ত্র ও প্রাকৃতিক দর্শন সম্পর্কেও চর্চা করা হয়। অধ্যয়নরত ছাত্রদের জ্ঞানার্জনে সর্বোচ্চ সফলতা লাভের জন্য সমগ্র পাঠ্যসূচি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে অধিবিদ্যার গবেষণামূলক গ্রন্থ দ্বারা আবৃত ছিল। তিনি আরো বলেন, মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের আগে ভারতীয় মুসলমানদের জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চা ইউরোপীয়দের মতো উন্নত ছিল। ’ (ব্রিটিশ আমলে বাংলার মুসলিম শিক্ষা : সমস্যা ও প্রসার, বাংলা একাডেমি, ২০০৮, পৃষ্ঠা-৪২৩)

আর এটা অস্বীকারের সুযোগ নেই যে শত শত, বরং হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাব্যবস্থার উত্তরাধিকার ধারণ করে আছে কওমি মাদরাসা। কী পড়ানো হয় কওমি মাদরাসায়—এ প্রশ্নের জবাব পেতে দারুল উলুম দেওবন্দের সিলেবাস নিয়ে আলোচনা করা যায়। কওমি মাদরাসার সূতিকাগার দারুল উলুম দেওবন্দের জন্য কিছু পরিবর্তন-পরিমার্জন করে দরসে নেজামির সিলেবাস অনুমোদন করা হয়। ১২৮৩ হিজরিতে দ্বিতীয়বার সংস্কার করা হয়। ফারসি-উর্দু পাঠ্যক্রমকে আরবি থেকে পৃথক করা হয়। এরপর ১২৯০ হিজরিতে আবারও আরবি পাঠ্যক্রমকে আট বছর মেয়াদি করা হয়। পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের আংশিক পরিবর্তন করা হয়।

পাঠ্যসূচির ক্ষেত্রে এই শিক্ষা ধারাকে প্রথমে দুই স্তরে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রথম স্তরকে বর্তমান পরিভাষা অনুযায়ী ইবতেদায়ি কিংবা প্রাইমারি মাদরাসা বলা উচিত। এই স্তরের পাঠ্যক্রমে সেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা মানবজীবনে প্রয়োজন হয়।

দারুল উলুম দেওবন্দে ‘উর্দু-দ্বীনিয়াত-ফারসি’ বিভাগের ছয় বছর মেয়াদি পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত বিষয়াদি  জ্ঞান, মৌলিক আকায়েদ বা বিশ্বাস, পাটিগণিত, কোরআন নাজেরা (দেখে পড়া), উর্দু, ফারসি ভাষা, দ্বীনিয়াত, শব্দজ্ঞান, নামাজের প্রশিক্ষণ ও আমলের অনুশীলন, হিন্দি ভাষা, ইংলিশ, ভূগোল, ইতিহাস, অঙ্ক, সাধারণ জ্ঞান ইত্যাদি। (সিলেবাস, প্রাইমারি কোর্স, দেওবন্দ)

আরবি বিভাগের জন্য আট বছর মেয়াদি পরিমার্জিত দরসে নিজামিকেই রাখা হয়েছে।

আরবি প্রথম বর্ষ : সিরাতে রাসুল (মহানবীর জীবনী), সরফ (শব্দশাস্ত্র), নাহু (বাক্য), আরবি অনুশীলন, তাজবিদ (কোরআন পাঠের নীতি), আমপারা হিফজ (মুখস্থ)।

আরবি দ্বিতীয় বর্ষ : নাহু, সরফ, আরবি অনুশীলন, ফিকহ, মানতিক, তাজবিদ, মশকে আমপারা ও সুন্দর হস্তাক্ষর।

আরবি তৃতীয় বর্ষ : তরজমায়ে কোরআন (কোরআন অনুবাদ), হাদিস, ফিকহ, নাহু, আরবি সাহিত্য, আরবি অনুশীলন, ইসলামী আখলাক (চরিত্র গঠন), মানতিক (তর্কশাস্ত্র)।

আরবি চতুর্থ বর্ষ : তরজমায়ে কোরআন (কোরআন অনুবাদ), হাদিস, বালাগাত (আরবি অলংকারশাস্ত্র), উসুলে ফিকহ (ইসলামী আইনের মূলনীতি), মানতিক (তর্কশাস্ত্র), খেলাফতে বনি উমাইয়া, খেলাফতে আব্বাসিয়ার ইতিহাস, জুগরাফিয়ায়ে আলম (বিশ্ব মানচিত্র) ও জাজিরাতুল আরব, তাজবিদ।

আরবি পঞ্চম বর্ষ : তরজমায়ে কোরআন, ফিকহ, উসুলে ফিকহ, ইলমে আদব (সাহিত্য), আকায়েদ, মানতিক (সুল্লাম) তাজবিদ, হিন্দুস্তানে মুসলিম শাসকদের ইতিহাস (সুলতান মাহমুদ গজনভি থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত)।

আরবি ষষ্ঠ বর্ষ : তাফসিরে জালালাইন শরিফ, ফিকহ, উসুলে তাফসির (তাফসির মূলনীতি), উসুলে ফিকহ, আকায়েদ (মূল বিশ্বাস), ফালসাফা (দর্শন), সিরত মুতালাআ (মহানবীর জীবনী পাঠ)।

আরবি সপ্তম বর্ষ : হাদিস শরিফ, উসুলে হাদিস (হাদিসের মূলনীতি), ফিকহ, আকায়েদ (মৌলিক বিশ্বাস), ফরায়েজ (উত্তরাধিকার আইন), তাজবিদ, মুতালাআ : আল-মাজাহিবুল ইসলামিয়া।

আরবি অষ্টম বর্ষ : হাদিস গ্রন্থসমূহ : বুখারি শরিফ, মুসলিম শরিফ, তিরমিজি শরিফ, আবু দাউদ শরিফ, নাসাঈ শরিফ, ইবনে মাজাহ শরিফ, তাহাবি শরিফ, শামায়েলে তিরমিজি শরিফ, মুয়াত্তা ইমাম মালেক, মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ, তাজবিদ বা কোরআন আবৃত্তি।

এটিই দারুল উলুম দেওবন্দের আট বছর মেয়াদি আরবি বিভাগের রূপরেখা। দারুল উলুম দেওবন্দে দাওরায়ে হাদিস পাস করার পর সনদ দেওয়া হয়। দাওরায়ে হাদিস-পরবর্তী বিশেষ বিশেষ উচ্চতর বিভাগের সংযোজন করা হয়েছে। যেমন—উচ্চতর ফিকহ (ইসলামী আইন) ও ফতওয়া প্রশিক্ষণ বিভাগ, উচ্চতর তাফসির বিভাগ, বিজ্ঞান বিভাগ, সাহিত্য বিভাগ, উচ্চতর আরবি সাহিত্য বিভাগ, উচ্চতর হাদিস গবেষণা বিভাগ। শিক্ষা সমাপ্তির পর শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করা হয়েছে এক বছর মেয়াদি কম্পিউটার ট্রেনিং কোর্স, দুই বছরের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ। এ তো গেল দারুল উলুম দেওবন্দের সিলেবাস। তবে বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাগুলোয় এই সিলেবাসের হুবহু অনুসরণ হয় না, যদিও এর বেশির ভাগই অনুসরণ করা হয়। বরং বলা যায়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিভিন্ন কওমি মাদরাসায় দারুল উলুম দেওবন্দের চেয়েও বেশি কিতাব পড়ানো হয়। বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাগুলোর একাধিক বোর্ড আছে। সেগুলোতে পাঠ্যক্রমে সামান্য পার্থক্যও আছে। তবে মৌলিকভাবে কওমি মাদরাসাগুলোতে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে : (১) কোরআন, (২) তাজবিদ বা  কোরআন পঠননীতি, (৩) ইলমুল কিরাআত বা কোরআনের উচ্চারণনীতি, (৪) তাফসির বা কোরআনের ব্যাখ্যা, (৫) উসুলে তাফসির বা কোরআন ব্যাখ্যার নীতিমালা, (৬) উলুমুল কোরআন বা কোরআনের শাস্ত্রীয় জ্ঞান, (৭) হাদিস, (৮) উলুমুল হাদিস বা হাদিসের শাস্ত্রীয় জ্ঞান, (৯) ফিকহ বা ইসলামী আইন, (১০) উসুলে ফিকহ বা ইসলামী আইনের নীতিমালা, (১১) ফিকহে মুক্বারান—তুলনামূলক ইসলামী আইন, (১২) ইলমুল ফারায়েজ—উত্তরাধিকার সম্পদ বণ্টন আইন, (১৩) ইলমুল আকাইদ বা ঈমানবিষয়ক জ্ঞান, (১৪) মানতিক বা যুক্তিবিদ্যা, (১৫) ফালসাফা বা দর্শনশাস্ত্র, (১৬) আরবি ভাষা ও সাহিত্য, (১৭) উর্দু, (১৮) বালাগাত বা শব্দালংকার, (১৯) ফাসাহাত বা বাক্যালংকার, (২০) ইলমে মাআনি বা শব্দতত্ত্ব, (২১) ইলমে বয়ান বা বাক্যতত্ত্ব, (২২) ইলমে বাদি বা বাচনিক তত্ত্ব, (২৩) ইলমে নাহু বা বাক্য প্রকরণ, (২৪) ইলমে সরফ বা শব্দ প্রকরণ, (২৫) ইলমে লুগাহ বা শব্দকোষ, (২৬) ইলমে তারিখ বা ইতিহাস, (২৭) সিরাত বা রাসুল (সা.)-এর জীবনী। এ ছাড়া প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের বাংলা, অঙ্ক, ইংরেজি, সমাজ, বিজ্ঞান ও ফারসি শিক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন মাদরাসায় কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণকেন্দ্র আছে।

বিভিন্ন কওমি মাদরাসায় সাপ্তাহিক, মাসিক ও সমসাময়িক ইস্যুতে সেমিনারের আয়োজন করা হয়। শিক্ষকদের উপস্থিতিতে ছাত্ররা সেখানে আলোচনা করে। অনেক মাদরাসায় এর জন্য ছাত্রদের পুরস্কৃত করার ব্যবস্থা আছে। আবার অনেক মাদরাসায় কবিতাচর্চা, মুনাজারা বা বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। এভাবেই হাজার বছরের পথ ধরে চলছে কওমি মাদরাসা।

 

লেখক : ইতিহাস গবেষক


মন্তব্য