kalerkantho


ইবাদত ব্যক্তি ও সমাজের সেতুবন্ধ

মুফতি হুমায়ুন রশিদ   

১৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



প্রতিটি মানুষই মহান আল্লাহর ইবাদতের ব্যাপারে আদিষ্ট। কিন্তু ইবাদত শুধু ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়, বরং প্রতিটি ইবাদতের সঙ্গে অন্য ইবাদতের যোগসূত্র আছে।

ইসলামের বেশির ভাগ ইবাদতই ব্যক্তি ছাড়িয়ে সমাজ ও মানবতার জয়গান রচনা করে।

ইসলামের প্রতিটি ইবাদতই সামষ্টিকভাবে আদায়ের বিধান দেওয়া হয়েছে। যেমন—নামাজের ক্ষেত্রে প্রতিটি ফরজ নামাজকে জামাতের সঙ্গে আদায় করার জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আর ফরজ ছাড়া অন্যান্য নামাজের মধ্যে কোনো কোনোটিতে যেমন—তারাবির নামাজ জামাতের সঙ্গে পড়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে। আর অন্য নামাজের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে পড়তে উৎসাহিত করা হলেও এর জন্য সবার ক্ষেত্রে একই ধরন ও কারণ এবং একই সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। যেমন—মসজিদে প্রবেশের নামাজ, তাহিয়্যাতুল অজুর নামাজ ইত্যাদি। এ ছাড়া সপ্তাহে একদিন জুমার নামাজ, বছরে দুই দিন ঈদের নামাজ, মৃত ব্যক্তির জন্য জানাজার নামাজ ইত্যাদিকে সামষ্টিকভাবে আদায়ের বিধান দেওয়া হয়েছে।

রোজার ক্ষেত্রেও বিশ্বব্যাপী সব মুসলিমের জন্য ফরজ রোজা আদায়ের অভিন্ন সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, যাতে বিশ্বময় এটি সুষ্ঠুভাবে আদায়ের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে সবাই একে অন্যের সহায়ক হতে পারে।

এ ছাড়া বছরব্যাপী যেসব ঐচ্ছিক রোজা রয়েছে, তাতেও সময়কালের দিক থেকে সবার মঙ্গে একটা চমৎকার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন—প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবারের রোজা, ‘আইয়্যামে বিজ’-এর  (প্রতি চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ) রোজা, আশুরার রোজা, শাওয়াল মাসের ছয় রোজা, আরাফা দিবসের রোজা ইত্যাদি।

জাকাতের ক্ষেত্রে এই সামষ্টিকতার চিত্র আরো স্পষ্ট। কেননা এটি ফরজই করা হয়েছে ধনী ও গরিবের ব্যবধান কমিয়ে আনার জন্য। সুখে ও দুঃখে একে অপরের অংশীদার হওয়ার জন্য। তা ছাড়া এ ক্ষেত্রে ধনী যেন গরিবের প্রতি কৃপা করেছে বলে মনে করতে না পারে এবং গরিবও যেন ধনীর কাছে নিজেকে দায়গ্রস্ত মনে না করে, সে জন্য জাকাতের অর্থ আদায় ও বণ্টনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ইসলামী সরকারকে। এভাবে জাকাতের বাইরেও পরস্পরকে সহযোগিতা করার জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দান করে খোঁটা না দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। সেই সঙ্গে পরিবার-পরিজনের জন্য যা ব্যয় করা হয়, তাকে উত্তম সদকা ও অতীব পুণ্যের কাজ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবেশীদের ব্যাপারেও খোঁজ-খবর রাখতে বলা হয়েছে। তাদের অভুক্ত রেখে নিজে পেট পুরে খাওয়াকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করা হয়েছে।

ইসলামের আরেকটি মৌলিক ইবাদত হলো হজ। এটি বিশ্ব মুসলিম সম্মিলন। সারা দুনিয়ার বাছাইকৃত মুসলিম বান্দারা একই সময়ে একই নিয়মে একই স্থানে এটি আদায় করেন। নিজের সুবিধামতো সময়ে, নিয়মে কিংবা স্থানে এটি আদায় করা যায় না। আবার নিজের ফরজ হজ আদায় করা থাকলে অসুস্থ কিংবা মৃত ভাইয়ের পক্ষ হয়েও হজ করা যায়। এভাবে ইসলামের সব মৌলিক ইবাদতে ব্যক্তির সঙ্গে সমষ্টিকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রাখা হয়েছে। ইসলামের ইবাদতগুলো শুধু ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, বরং সামষ্টিক। যেমন—নিজে সৎ কাজ করা এবং অন্যকে তা করতে বলা, নিজে অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকা এবং অন্যকেও বিরত রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করা মুসলিম উম্মাহর একটি জাতিগত দায়িত্ব। এ প্রসঙ্গে কোরআনুল হাকিমের অত্যন্ত সুস্পষ্ট ঘোষণা হলো—‘তোমরা হলে শ্রেষ্ঠ উম্মত, যাদের মানবতার কল্যাণে বের করা হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের আদেশ করবে, অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে আর আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে। ’

সুতরাং এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, ইবাদত হলো ব্যক্তি ও সমষ্টির মধ্যে সেতুবন্ধ। ইবাদতের মাধ্যমে গোটা মুসলিম জাতিকে এক নিবিড় আত্মিক সম্পর্কে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। একে অন্যের ভাই ভাই হয়ে সবাই মিলে এক দেহতুল্য হওয়ার ক্ষেত্রে ইবাদতই হলো প্রকৃষ্ট মাধ্যম।

লেখক : শিক্ষক, দারুল আরকাম, টঙ্গী, গাজীপুর


মন্তব্য