kalerkantho


মুসলমান হয়েও সমাজবিচ্ছিন্ন বেদে সম্প্রদায়

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা

১৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



মুসলমান হয়েও সমাজবিচ্ছিন্ন বেদে সম্প্রদায়

বাংলাপিডিয়া লিখেছে, বেদে সাধারণভাবে বাদিয়া বা বাইদ্যা নামে পরিচিত একটি ভ্রাম্যমাণ জনগোষ্ঠী। কথিত আছে, ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে শরণার্থী আরাকানরাজ বল্লাল রাজার সঙ্গে তারা ঢাকায় আসে।

পরবর্তী সময়ে তারা ইসলাম ধর্মে দীক্ষা নেয়। তারা প্রথমে বিক্রমপুরে বসবাস শুরু করে এবং পরে সেখান থেকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, এমনকি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামেও তারা ছড়িয়ে পড়ে। বেদের আদি নাম মনতং। যুদ্ধ ও শিকারে অতিশয় দক্ষ বেদেরা কষ্টসহিষ্ণু ও সাহসী। তাদের গাত্রবর্ণ ও আকৃতি বাঙালিদের মতোই।

বেদেদের নিজস্ব ভাষা আছে। ওই ভাষার নাম ঠেট বা ঠের। স্বগোত্রীয়দের সঙ্গে কথা বলার সময় তারা ওই ভাষা ব্যবহার করে থাকে। তবে বাংলা ভাষাভাষীদের সঙ্গে তারা বাংলা ভাষা ব্যবহার করে।

গোত্রপ্রীতি প্রবল বলে সদস্যরা একে অন্যকে নানাভাবে সাহায্য করে থাকে। বেদেদের সমাজ পিতৃপ্রধান হলেও মেয়েরা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

নৌকাই তাদের জীবন-জীবিকার সব। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে, এক নগর থেকে আরেক নগরে ঘুরে বেড়ায় নৌকা দিয়ে। তাই নৌকা তাদের জীবনে অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ।

বেদেরা সাপ ধরে খেলা দেখায় এবং সাপের বিষ বিক্রি করে। এ ছাড়া তারা তাবিজ-কবচও বিক্রি করে। বছরের বেশির ভাগ সময় বিশেষ করে ফসল তোলার মৌসুমে ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে তারা বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জে পরিভ্রমণ করে। এই পরিভ্রমণকে বেদেদের ভাষায় গাওয়াল বলে। মহিলারাই বেশি গাওয়ালে যায়।

আমাদের অঞ্চলের জিপসিরা বেদে নামেই পরিচিত, বেদে মানে ভ্রমণশীল বা ভবঘুরে। নদীনির্ভর বাংলাদেশে বেদেদের বাহন তাই হয়ে ওঠে নৌকা। নৌকায় সংসার, আবার নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো দেশ-দেশান্তরে। ঢাকার সাভার, মুন্সীগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, গাজীপুরের জয়দেবপুর, চট্টগ্রামের হাটহাজারী, মিরসরাই, তিনটুরী, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, চান্দিনা, এনায়েতগঞ্জ, চাঁদপুরের মেহের, ফেনীর সোনাগাজী, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় এসব বেদের আবাস। সুনামগঞ্জের সোনাপুরে বাস বেদেসমাজের বৃহত্তর একটি অংশের। যাযাবর বলেই এদের জীবন বৈচিত্র্যময়। অঞ্চলভেদে বাংলাদেশে তারা বাদিয়া, বেদিয়া, বাইদিয়া, বেদে, বেদেনি, বাইদ্যা, বাইদ্যানি, সাপুড়ে, সাপুড়িয়া ইত্যাদি নামে পরিচিত। সমাজসেবা অধিদপ্তরের হিসাবে এদের সংখ্যা প্রায় ৬৩ লাখ। যার মধ্যে দলিত ৪০ লাখ, বেদে আট লাখ এবং হরিজন ১৫ লাখ।

বিয়ের ব্যাপারে বেদে যুবক-যুবতীর পূর্ণ স্বাধীনতা থাকে। বিয়ের পর স্বামী স্ত্রীর ঘরে যায় এবং স্ত্রীকে স্বামী ও সন্তানের লালন-পালনের জন্য ওয়াদা করতে হয়। বেদেদের নাচ-গানের আসরে বহিরাগত কেউ উপস্থিত থাকলে তাকে প্রলুব্ধ করে বেদে তরুণীকে বিয়ে করার জন্য উৎসাহিত করা হয়। বিয়ে হয়ে গেলে তাকে নিজেদের গোত্রে রেখে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বহিরাগত কোনো যুবক বেদে যুবতীকে ফুসলিয়ে বিয়ে করলে তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। এদের সমাজে বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ ও যৌথ পরিবার প্রথা নেই। বিধবা বিবাহে কোনো বাধা নেই। মুসলমান হলেও বেদে মেয়েরা পর্দা করে না। মহিলারা অত্যন্ত স্বাধীনচেতা ও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ছাড়াছাড়ি হলে সম্পত্তি, এমনকি পুত্র-কন্যারও বিভাজন হয়, যার বেশির ভাগ পায় স্ত্রী।

বাংলাদেশের বেদেরা এ দেশেরই নাগরিক। ভোটাধিকারসহ সব ধরনের নাগরিক সুবিধা তাদের প্রাপ্য। বাংলাদেশে এরা বরাবরই ক্রমহ্রাসমান একটি জনগোষ্ঠী। সময়ের পরিবর্তনে বেদেদের মধ্যে কেউ কেউ শিক্ষা ও অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে পেশা বদল করছে বা অন্য জাতির সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে স্বকীয় কৌম পরিচয় হারিয়ে ফেলছে।  

আমাদের দেশে বিশ শতকের মাঝামাঝি কিছু গবেষক বাংলাদেশের বেদে সম্প্রদায় সম্পর্কে আলোচনার সূত্রপাত ঘটান। তাঁদের মধ্যে কাজী আবদুর রউফ অন্যতম। তিনি এই জাতিগোষ্ঠীকে নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করেন। ১৯৮৭ সালে তিনি ‘বাংলাদেশের বেদে সম্প্রদায় : একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী সমীক্ষা’ নামে এমফিল থিসিস সমাপ্ত করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ২০০১ সালে ‘বাংলাদেশের বেদে সম্প্রদায় প্রতিবেশ সমাজ সংস্কৃতি ও অর্থনীতি’ নামে পিএইচডি থিসিস সমাপ্ত করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কিন্তু দুটি থিসিসই অপ্রকাশিত। তিনি বেদেদের মোট ১৭টি গোত্রের কথা উল্লেখ করেন। বেদে সম্প্রদায় নিয়ে এমফিল থিসিস করেছেন আরেক গবেষক নাজমুন নাহার লাইজু। তিনিও তাঁর অভিসন্দর্ভ ‘বাংলাদেশের বেদে সম্প্রদায়’-এ পূর্ববর্তী গবেষকদের নীতি অনুসরণ করেছেন। ফলে বেদেদের নৃতাত্ত্বিক উৎস সম্পর্কে জটিলতা থেকেই গেছে। কাজী আব্দুর রউফ জানান, বেদেরা রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় কারণে বা যুদ্ধের প্রয়োজনে বা নিজেদের অস্তিত্বের জন্য ঘরবাড়ির মায়া ত্যাগ করে দেশান্তরী হয় এবং বনে-জঙ্গলে আশ্রয় নেয়।

জাহানারা হক চৌধুরী Pearl-Women of Dhaka বইতে শান্দার বেদেনিদের প্রসঙ্গে আলোকপাত করেছেন, কিন্তু তিনিও বেদে সম্প্রদায়ের শেকড়ের সন্ধানটি দিতে পারেননি। তিনি বেদেদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আলোচনা করতে গিয়ে তাদের বক্তব্যকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। They claim that the word ‘Bedey’ has Originated Srom ‘Bedouin’.They further add that as a result of their war with king Abraham (Abraha?) they were expelled from Arabia.

এই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, বাংলাদেশের বেদে সম্প্রদায়ের উত্পত্তি সম্পর্কে বেদেবিষয়ক গবেষকরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টানতে তো পারেনইনি, এমনকি একমতও হতে পারেননি।

কেউ বলেছেন, বেদেরা আরাকানের মনতং মান্তা নৃগোত্র থেকে এসেছে। কেউ বলেছেন, না, খ্রিস্টীয় সাত শতকের শেষ দিকে তারা আরবের আলবাদিয়া নামক স্থান থেকে এ দেশে এসেছে। কেউ বলেছেন, খ্রিস্টীয় এগারো শতকে ইরানে তাদের উপস্থিতি ছিল।

বেদে জাতির নাম, যাযাবরি ও লড়াকু জীবনাচারের আলোকে আমরা মনে করি, আরবের আলবাদিয়া বা মরুভূমি থেকে বেদে জাতির আগমন ঘটেছে। আর তারা যে মুসলমান, এ ব্যাপারেও কারো সন্দেহ নেই। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, মুসলমানরা তাদের খবর রাখে না। তারাও মুসলমানদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে না। অনেক মুসলমান জানেও না যে বেদেরা মুসলমান। অথচ ইসলাম এমন ধর্ম, যেখানে শ্রেণিবৈষম্য সর্বাত্মকভাবে নির্মূল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ধর্ম, জাতি ও বর্ণবৈষম্যের কারণে হারিয়ে যায় মানবিক মূল্যবোধ। শুরু হয় মানুষের মধ্যে হানাহানি, কাটাকাটি, মারামারি। আজকের বিশ্বে তা কেবলই নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এসবের অবসানকল্পে মহানবী (সা.) বিদায় হজের ভাষণে বলেন, ‘হে মানবমণ্ডলী! তোমাদের রব একজন। তোমাদের আদি পিতা একজন। প্রত্যেকেই আদমের সন্তান। আর আদম মাটির তৈরি। আল্লাহ পারস্পরিক পরিচিতির সুবিধার্থে বিভিন্ন সমাজ ও গোত্রে তোমাদের বিভক্ত করেছেন। আরবের ওপর যেমন অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, তেমনি অনারবের ওপর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই আরবের। একইভাবে শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের আর কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব বা বৈশিষ্ট্য নেই। শ্রেষ্ঠত্ব, বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদার একমাত্র ভিত্তি হলো তাকওয়া তথা আল্লাহর আনুগত্যের মধ্যে। ’

আমরা আশা করি, বাংলাদেশের মুসলমানরা যার যার জায়গা থেকে বেদে সম্প্রদায়ের প্রতি বিশেষ নজর দেবেন। ইসলামী ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে তাদেরও আবদ্ধ করবেন।

 

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক


মন্তব্য