kalerkantho


আয়ারল্যান্ডে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ শিশুদের গণকবর

জাহেলি যুগের চিহ্ন?

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা   

১০ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



গণকবরের ধুলা সরিয়ে উঠে এলো আয়ারল্যান্ডের এক ভয়ংকর অধ্যায়। এ যেন ইতিহাসের ধুলা ঝেড়ে বেরিয়ে পড়া এক কঙ্কাল। কারণ অবিবাহিত মায়েদের সন্তানদের অগণিত কঙ্কাল মিলল দেশটির ছোট্ট শহর টুয়ামের এক গণকবরে। ২০১৪ সালেই সে খবর জানিয়েছিলেন স্থানীয় গবেষক ক্যাথরিন করলেস। তবে সে কথায় বিশেষ নজর দিতে চায়নি আয়ারল্যান্ড সরকার।  

অবশেষে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার চাপে সম্প্রতি ব্যাপারটি নিয়ে আবার ভাবতে বাধ্য হয়েছে আয়ারল্যান্ড। একটি কমিশন গঠন করে ওই গণকবরের খননকাজও শুরু করা হয়। গত শুক্রবার কমিশন সেই কলঙ্কিত অধ্যায়ের রিপোর্ট পেশ করেছে।

জানা গেছে, পশ্চিম আয়ারল্যান্ডের গ্যালওয়ে কাউন্টির টুয়ামের প্রসূতি ভবনের নিচে ধামাচাপা পড়েছিল সেই গণকবর। ওই ভবনের বিল্ডিংয়ের নিচে সেপটিক ট্যাংকের মধ্যে রয়েছে ১৭টি কুঠুরি। তাতেই মিলেছে অসংখ্য শিশুর কঙ্কাল।

এগুলো অনাকাঙ্ক্ষিত শিশুদের কঙ্কাল। নিজের গবেষণাপত্রেও এমনটাই দাবি করেছিলেন ক্যাথরিন। তিনি তখন জানিয়েছিলেন, ‘অবিবাহিত অন্তঃসত্ত্বারাই থাকতে আসতেন সেখানে। প্রসবের পর কিছুদিন থেকে সেখান থেকে চলে গিয়ে নতুন জীবনে পা রাখতেন। তবে প্রায় কেউই সদ্যোজাত সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন না। কী হয়েছিল সেই সন্তানদের তা কেউ জানে না। ’

ক্যাথরিনের গবেষণার কথা নিজের ব্লগে উল্লেখ করেন ওয়াশিংটন পোস্টের ব্লগার টেরেন্স ম্যাকয়। দীর্ঘদিনের গবেষণার পর ক্যাথরিনের বিশ্বাস, ওই গণকবরে অন্তত ৭০০ থেকে ৮০০ শিশুর কঙ্কাল রয়েছে। গোটা ঘটনা ধামাচাপা দিতে কোনো ধরনের সৌধফলক ছাড়াই তাদের ফেলে দেওয়া হয় ওই সেপটিক ট্যাংকে। এরপর তাতে আবর্জনা আর মাটিচাপা দিয়ে দেওয়া হয়।  

প্রথম দিকে গণকবরের ঘটনাটা সবাই ভুয়া খবর বলে উড়িয়ে দিলেও আন্তর্জাতিক স্তরে এখন তা নিয়ে সাড়া পড়েছে। গণকবরে ১৯২৫ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত সময়কালের কঙ্কাল মিলেছে। কমিশন জানিয়েছে, ওই গণকবরে খননকাজের পর কার্বন ডেটিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কঙ্কালগুলোর পরীক্ষা শুরু করা হয়েছে। তাতে উঠে এসেছে আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য। ওই কঙ্কালগুলোর বয়স ৩৫ সপ্তাহ থেকে তিন বছরের মধ্যে। (সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন অনলাইন : ৫ মার্চ, ২০১৭)

শিশুহত্যার অন্যতম দিক হলো ভ্রূণহত্যা। জ্যাফি ও ড্রাইফুজ নামক দুজন মার্কিন গবেষক অনিচ্ছাকৃতভাবে গর্ভবতী হয়ে পড়া তরুণীদের ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করেন। তাঁরা দেখতে পান, এসব তরুণীর ৩৮ শতাংশ গর্ভপাত তথা ভ্রূণহত্যার আশ্রয় নেয়। [সূত্র : Courtship, Marriage and Family : American Style, pp-87]

উত্তর আমেরিকার একটি উন্নত দেশ কানাডাও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। ১৯৭০ সাল থেকে দেশটিতে গর্ভপাত হু হু করে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। এই বছর ‘বৈধভাবে’ ভ্রূণ হত্যা করা হয় ১১ হাজার। ১০ বছর পর ১৯৮০ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ছয় গুণ—অর্থাৎ ৬৬ হাজার। আরো ১০ বছর পর ১৯৯০ সালে এসে আমরা ৯৪ হাজার গর্ভনাশের কথা অবগত হই। যুক্তরাষ্ট্রের মতো এই দেশটিতেও গর্ভঘাতিনীদের বেশির ভাগই ছাত্রী এবং তাদের ৭৪ শতাংশের বয়স ২০ বছর বা তদপেক্ষা কম। [সূত্র : Teen Trends, Pp-43]

২০০৭ সালে নিউজিল্যান্ডে ১৮ হাজার ৩৪০টি গর্ভপাত ঘটানো হয়। Statistics Newzealand, 08.01.2009]

ইউরোপীয় সভ্যতার মশালবাহী ইংল্যান্ডে ২০০৬ সালে এক লাখ ৯৩ হাজার ৭০০টি গর্ভপাত ঘটানো হয়। [সূত্র : Abortion Statistics, England and Wales : 2006]

অবাধ যৌনতার ব্যাপারে পাশ্চাত্যের ‘উদারতা’ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তার প্রভাব গর্ভপাতের ক্ষেত্রেও লক্ষ করা যায়। বিপুলসংখ্যক তরুণী যখন গর্ভবতী হয়ে পড়ছে, তখন এটাকে আইনগত বৈধতা না দিয়ে আর উপায় কী। সুতরাং গর্ভের শিশুটিকে মরতেই হবে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এ ক্ষেত্রে পথ প্রদর্শন করেছে। তারা ১৯২০ সালে গর্ভপাতকে বৈধতা দিয়ে আইন প্রণয়ন করে। এরপর ১৯৪৮ সালে জাপান, ১৯৫০-এর দশকে পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো এবং ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে বাকি ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলো গর্ভসহ শিশুকে হত্যা করার বৈধতা দিয়েছে। [The Encarta Encyclopedia, Abortion]

ভ্রূণহত্যা সমর্থনকারীরা আবার যুক্তিবাদী। এ বিষয়ে তাদের প্রধান যুক্তি হলো ব্যক্তিস্বাধীনতা। দেহটা যেহেতু নারীর নিজের, তাই এটার ব্যাপারে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার তার আছে। এটা যাকে খুশি সে দান করতে পারে। দান করতে গিয়ে এর মধ্যে যদি নতুন প্রাণসঞ্চার হয়, তাহলে তা বাঁচিয়ে রাখা বা না রাখাও তার ইচ্ছাধীন! কী সর্বনাশা স্বাধীনতা!

প্রশ্ন হলো, বিজ্ঞান কি এমন গর্হিত কাজ স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছে? জ্যানেট ডেলিং ও তাঁর সহযোগী গবেষকরা এক হাজার ৮০০ জন নারীর ওপর গবেষণা পরিচালনার পর জোর দিয়ে বলেছেন, গর্ভপাত যে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে, এ ব্যাপারে তাঁদের হাতে জোরালো প্রমাণ আছে। গর্ভঘাতিনী নারীর ৪৫ বছর বয়ক্রমের মধ্যে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ১৮ বছর বা তদপেক্ষা কম বয়স্ক তরুণী যদি আট সপ্তাহ পর গর্ভপাত করে, তবে তার স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় ৮০০ শতাংশ। [সূত্র : Journal of the National Cancer Institute, Vol.86. pp-1584]

এ তো গেল গর্ভঘাতিনী নারীর শারীরিক সমস্যার কথা। মানসিকভাবেও তারা কম সমস্যার সম্মুখীন হয় না। তাদের মানসিক সমস্যা সম্পর্কে মার্কিন মনোবিজ্ঞানী ডা. ওয়ান্ডা ফ্রান্জ বলেন, ‘যেসব নারী গর্ভপাত থেকে সৃষ্ট নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কথা জানায়, তারা ঠিকই জানে তাদের সমস্যাটা কী। তারা ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের কথা উল্লেখ করে, যাতে তারা দেখতে পায়, শিশুরা আবর্জনার স্তূপ থেকে দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও রক্তের মধ্য থেকে তাদের ডাকছে। যখন তাদের গর্ভপাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, তখন এই নারীরা আবার সেই অভিজ্ঞতা লাভ করে ভয়ানক মানসিক যাতনা সহকারে। তারা নিজেদের অকর্মণ্য ও অসহায় বলে মনে করে, কারণ তারা সর্বাপেক্ষা স্বাভাবিক মানবীয় কাজটি করতে ব্যর্থ হয়েছে। আর তা হলো মাতৃত্বের ভূমিকা। ’ [সূত্র : Medical and Psychological Impact of Abortion.]

লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস নামক বিখ্যাত পত্রিকা ১৯৮৯ সালে গর্ভপাতের ওপর এক মতামত জরিপ করে। এই জরিপে দেখা যায়, গর্ভপাত করেছে এমন নারীদের ৫৬ শতাংশ এ জন্য অপরাধবোধে ভুগছে। ২৬ শতাংশ এ কাজের জন্য অত্যন্ত অনুতপ্ত। [সূত্র : The Sacramento Bee, March, 1989; pp-A7]

সম্মানিত পাঠক! আমরা জানি, জাহেলি যুগে অন্যায়ভাবে কন্যাশিশুদের হত্যা করা হতো। বর্তমানে জাহেলি যুগ পেরিয়ে আমরা আধুনিক যুগে পদার্পণ করেছি। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, সত্যিই কি আমরা জাহেলিয়াত থেকে মুক্তি পেয়েছি, নাকি আধুনিক সভ্যতায়ও জাহেলি যুগের চিহ্ন লেগে আছে?

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক


মন্তব্য