kalerkantho


চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে বাদশাহ আলমগীর মসজিদ

আল আমিন আশরাফি

৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে বাদশাহ আলমগীর মসজিদ

চাৎঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের কৈয়ারপুল বাস স্টপেজ থেকে তিন মাইল দক্ষিণে একটি সুন্দর দিঘি আছে। দিঘিটির ৫০০ গজ দূরত্বে দুটি প্রাচীন মসজিদ আছে। একটি মসজিদের নাম শাহ সুজা মসজিদ, অন্যটির নাম শাহি বা আলমগীরি মসজিদ। এখানে আমরা আলমগীরি মসজিদ নিয়ে আলোচনা করব।

আলমগীরি মসজিদ চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ থানার অন্তর্গত অলিপুর গ্রামে অবস্থিত। এ মসজিদ বাদশাহ আওরঙ্গজেবের শাসনামলে স্থানীয় প্রশাসক আব্দুল্লাহ ১৬৯২ (১১০৪ হিজরিতে) নির্মাণ করেন। (প্রত্ননিদর্শন : কুমিল্লা, আয়শা বেগম)

১৯৬৫ সালে যখন পাক-ভারত যুদ্ধ হয়, তখন ভারতবর্ষে মুসলিম শাসকদের কীর্তিগাথা ও স্থাপিত বিভিন্ন স্থাপনা নিয়ে গ্রন্থ রচনার উদ্যোগ নেয় ততকালীন পাকিস্তান সরকার। এর ধারাবাহিকতায় বিস্মৃতির অতল অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসে অলিপুর নামের লোকালয়টি।

অলিপুর আলমগীরি মসজিদ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নজরে আসে ৩১ বছর পর। ১৯৯৬ সালের ১৬ মার্চ আঞ্চলিক পরিচালক, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর অলিপুর এ মসজিদ সংস্কারের কাজ হাতে নেন। মসজিদের ৬০ ফুট পূর্বে রয়েছে একটি বড় পুকুর।

এই পুকুর মসজিদ নির্মাণকারী কর্তৃপক্ষই খনন করেছিল।

সাধারণ মোগল স্থাপত্যরীতির তাৎপর্যপূর্ণ ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হয় এ মসজিদে। সাধারণত মোগলরা তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদই তৈরি করতেন। কিন্তু এ মসজিদের আছে পাঁচ গম্বুজ। মসজিদের প্রধান দরজার ওপর স্থাপিত রয়েছে ১.১০ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ১১ ইঞ্চি প্রস্থের ফারসি ভাষায় লিখিত শিলালিপি। এ শিলালিপির কয়টি লাইনের অনুবাদ হচ্ছে : (১) পরম দয়ালু ও দাতা আল্লাহর নামে, (২) আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) তাঁর নবী, (৩) মহামতি সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে (যাঁর সুদৃঢ় প্রতিরক্ষায় অনেক রাজন্য আশ্রয় নিত), (৪) উপাসনালয়ের গুণাবলি প্রকাশের জন্য পৃথিবীতে অনেক ঘটনাই ঘটে। আমি যখন এর প্রতিষ্ঠার কথা জানতে চাইলাম, অকস্মাৎ একটি কণ্ঠস্বর আমাকে এর সাল জানাল, (৫) মসজিদটি নির্মিত হয় আমি আল্লাহ কর্তৃক, (৬) যে চার সঙ্গী—আবু বকর, ওমর, ওসমান ও আলীর অনুগামী।

মসজিদের নির্মাতা আবদুল্লাহ সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়নি। তবে অনুমান করা হয়, তিনি একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছিলেন। মসজিদের ১০০ মিটার পূর্বে একটি পুরনো ইটের মাজার আছে। এখানে আছে আবদুল্লাহর সমাধি।

১৯৬৫ সালের ৪ নভেম্বর পাকিস্তান সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কর্মকর্তা জনাব এ কে এম আমজাদ হোসেন ‘Concept of Pakistan’ সাময়িকীতে একটি গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ লিখেছেন। সেখানে তিনি অলিপুরের এ মসজিদকে ‘আলমগীরি মসজিদ’ হিসেবে অভিহিত করেন।

আলমগীরি মসজিদের দৈর্ঘ্য ৫২.৮ ফুট ও প্রস্থ ২৯.৯ ফুট। মোগল স্থাপত্যের সাধারণ রীতি অনুযায়ী এ মসজিদের চারটি অষ্টকোণাকার মিনার রয়েছে। মসজিদের ছাদে দুই পাশে দুটি করে চারটি ছোট গম্বুজ এবং মাঝে একটি বড় গম্বুজসহ মোট পাঁচটি গম্বুজ রয়েছে। পশ্চিম পাশের দেয়ালে তিনটি মিহরাব রয়েছে। ইমাম সাহেব মধ্যবর্তী মিহরাবে অবস্থান করে নামাজ পড়ান, সেটিই বড় এবং দুই পাশের দুটি ছোট। মসজিদের ভেতরে রয়েছে অষ্টভুজাকৃতির দুটি বিশাল (স্থূল) স্তম্ভ (পিলার)। যেগুলোর পরিধি কমপক্ষে আট হাত। আর মসজিদের দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় আড়াই হাত (প্রায় ৪ ফুট)। মসজিদটিতে মূলত কোনো জানালা ও ভেন্টিলেটর নেই। পূর্ব দেয়ালে তিনটি দরজা রয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে দুটি করে যে চারটি দরজা ছিল, সেগুলো বর্তমানে জানালায় রূপান্তর করা হয়েছে। মসজিদের চারদিকের দেয়ালের মধ্যে পূর্ব দেয়াল ছাড়া তিন দিকের দেয়ালই সমতল। পূর্ব দিকের দেয়ালে একসময় ছিল নানা কারুকাজ।

আয়তাকার মসজিদের (১৫.২৪মি – ৮.২৩মি) পূর্ব দিকের সম্মুখ ভাগের মধ্যবর্তী স্থানে অষ্টভুজাকার ক্ষুদ্র বুরুজসহ একটি উদ্গত ফ্রেমে আয়তাকার প্রধান প্রবেশপথ উঁচু খিলান ও অর্ধগম্বুজ শোভিত। প্রধান প্রবেশপথের দুই পাশে অর্ধগম্বুজের নিচে বহির্গত খিলানসহ আরো দুটি প্রবেশপথ রয়েছে। উত্তর-দক্ষিণের প্রতিটি দেয়ালে রয়েছে এক জোড়া খিলানযুক্ত প্রবেশপথ। সুতরাং মসজিদটিতে সর্বমোট সাতটি খিলানপথ রয়েছে; পূর্ব দিকে তিনটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে দুটি করে।   (বাংলাপিডিয়া)

১৯৯৮ সালের বন্যার পর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মসজিদটিকে এর পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য সংস্কার করেছে। মসজিদের ভেতরে বৈদ্যুতিক আলো ও পাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার সুবিধার্থে প্রচুর ওয়াক্ফ সম্পত্তি ছিল। বর্তমানে এর সবটুকুই ক্রমান্বয়ে নানাজনের দখলে চলে গেছে। সেগুলো আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

আওরঙ্গজেব ৪৯ বছর দিল্লির সম্রাট ছিলেন। তাঁর আমলে অলিপুর এলাকায় বর্ধিষ্ণু লোকালয় ছিল। অমাত্যদের নামাজ আদায়ের জন্য এ মসজিদ নর্মাণ করা হয়।

লেখক : ইতিহাস গবেষক


মন্তব্য