kalerkantho


তুরস্কের সুলাইমানিয়া মসজিদ

ইসলামী স্থাপত্যশিল্পের অনন্য শোভা

মুহাম্মদ মিনহাজ উদ্দিন   

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ইসলামী স্থাপত্যশিল্পের অনন্য শোভা

তুরস্কের ওসমানি শাসনামলের খলিফা সুলাইমান আল-ক্বানুনি। (রাজত্বকাল : ৯২৬-৯৭৪ হিজরি) তিনি ইতিহাসখ্যাত শাসক ছিলেন। মৃত্যুর আগে তাঁর অভূতপূর্ব ঘোষণা মানুষকে বেশ আশ্চর্যান্বিত ও ভাবনায় ফেলে দিয়েছিল। এতে তিনি মানুষের জন্য দারুণ শিক্ষা ও পয়গাম রেখে গেছেন। মৃত্যুর আগে তাঁর উজিরকে তিনি বলেন, ‘মৃত্যুর পর আমাকে কাফন দেওয়া হলে তোমরা আমার দুই হাত বের করে দিয়ে আমাকে সারা শহর প্রদক্ষিণ করাবে। যাতে মানুষ বুঝতে পারে, আমি এত বড় রাজত্বের অধিকারী হয়েও পরকালে যাচ্ছি শূন্য হাতে। রাজত্বের কিছুই নিয়ে যেতে পারছি না। ’

তাঁর আমলে ওসমানিয়া খিলাফত প্রভূত উন্নতি লাভ করে। তিনি রাজ্যের পরিধি বৃদ্ধিসহ আরো বহু বিখ্যাত কর্মকীর্তি রেখে যান। ইতিহাসের গ্রন্থগুলোয় তাঁর বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়। তুরস্কের প্রাচীন শহর ইস্তাম্বুলে নির্মিত সুলাইমানিয়া মসজিদ তাঁর সেসব কর্মকীর্তির অন্যতম অংশ।

সুলাইমানিয়া মসজিদের নির্মাণকাল : খ্রিস্টাব্দ ১৫৫০ থেকে ১৫৫৭-এর মাঝামাঝি সময়ে সুলাইমানিয়া মসজিদ নির্মাণ করা হয়। এটি মুসলিম স্থাপত্যশিল্পের অনন্য কীর্তির পরিচায়ক। এটি ওসমানি খিলাফত আমলে ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতি বিকাশের অন্যতম মাধ্যম ও অবদান হিসেবে স্বীকৃত। তুরস্কের সবচেয়ে বড় এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মসজিদও বটে। এ মসজিদকে কেন্দ্র করে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ব্যাপক প্রচার-প্রসার ঘটে।

সুলাইমানিয়া মসজিদের অবস্থান : ইতিহাসখ্যাত মসজিদটি নির্মাণ করতে সুলতান সুলাইমান নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আধার, দৃষ্টিনন্দন ও মনোলোভা কয়েকটি স্থান বাছাই করেন। পরিশেষে ইস্তাম্বুলের বায়জিদ অঞ্চলের অনিন্দ্য সুন্দর ‘বসফরাস’ প্রণালির কোলঘেঁষা একটি ছোট্ট টিলার ওপর গড়ে তোলেন মসজিদটির অবকাঠামো। একদিকে বসফরাসের স্ফটিকস্বচ্ছ পানিতে সূর্যের কিরণমালা ভোর-বিহানে কিংবা সাঁঝ-অপরাহ্নে সোনাখচিত রশির মতো মসজিদের দেয়ালগুলোয় ঝিলিক খেলে। আর অন্যদিকে সবুজাভ ফুলেল উদ্যান ও পুষ্পবীথিতে ছাওয়া বাগানের স্নিগ্ধ সমীরণ ও নির্মল বায়ু আগন্তুকের মনমানস আমোদিত করে। এমন হৃদয়গ্রাহী পরিবেশে দর্শকের তনুমন অবচেতনভাবেই সজীব হয়ে ওঠে। বর্তমানে সুলাইমানিয়া মসজিদের পাশ ঘেঁষে প্রাচীন একটি স্থাপনায় ইস্তাম্বুল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেখানে কয়েক সহস্র শিক্ষার্থী পড়াশোনা, গবেষণা ও অধ্যবসায়ে নিয়োজিত আছেন।

সুলাইমানিয়া মসজিদের নির্মাণ প্রসঙ্গ : সুলতান সুলাইমান আল-ক্বানুনি যখন অপূর্ব সুন্দর ও অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী একটি মসজিদ নির্মাণের সংকল্প করলেন, তখন তিনি তুরস্কের সবচেয়ে বিখ্যাত ও কুশলী প্রকৌশলী সানান পাশাকে নির্মাণকাজের দায়িত্ব অর্পণ করেন।

ইতিহাসগ্রন্থে রয়েছে, নির্মাণকাজ আরম্ভ করার আগে সানান পাশা সুলতানের কাছে মসজিদের যাবতীয় নকশা-রেখাচিত্র, ভাবনা ও পরিকল্পনার চিত্ররূপ পেশ করেন। চিত্রে শিল্পী সানান পাশার দক্ষতা, মুনশিয়ানা ও চিন্তা-পরিকল্পনার সৌকর্য দেখে সুলতান খুবই আপ্লুত হন এবং তাঁর পরিকল্পনার সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে নিজের ধনভাণ্ডার থেকে নির্মাণকাজের সব খরচ অবাধে পূরণ করার আদেশ দেন।

সুলাইমানিয়া মসজিদের অবকাঠামো : মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৬৯ ও প্রস্থ ৬৩ মিটার। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ অনায়াসে একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারে এতে। মসজিদের উন্মুক্ত আঙিনার চার কোণে সুউচ্চ ও সুরম্য চারটি মিনার মসজিদের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে বহু গুণে।

মসজিদের মেহরাবের অভ্যন্তর ইসলামী ঐতিহ্যের স্মারক ও বিভিন্ন কারুকার্যের উপাদানে পরিপুষ্ট। চোখ ধাঁধানো বৈচিত্র্য ও বহুবিধ রংতুলিতে আঁকা লতাগুল্ম এবং সবুজ শ্যামলিমার হরেক রকম দৃশ্য আর কোরআনের আয়াত অঙ্কিত ফলকগুলো চোখে পড়লে বিস্ময় জাগানিয়া অন্য রকম এক আবহ কাজ করে মুসল্লির ভাবনাজুড়ে। চিত্তাকর্ষক মেহরাবটির পাশেই রয়েছে সাদা মার্বেল পাথরে তৈরি সুসংহত মিম্বর। বিভিন্ন রঙের কাচের জানালাগুলো দিয়ে যখন সূর্যের আলোকরশ্মি খেলা করে, তখন মনে হয়, মসজিদটি যেন সহস্র রঙে সাজানো হয়েছে।

মসজিদের আঙিনার চারপাশ ঘিরে রয়েছে সবুজাবৃত সজীব একটি উদ্যান। সে এক অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য! অতি জাঁকজমকপূর্ণ নকশা ও অসম্ভব সুন্দর চিত্রাঙ্কন ছাড়া সুলাইমানিয়া মসজিদের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর বিশালত্ব ও সুপরিব্যাপ্তি। মসৃণ ও ঝকঝকে টালি বসানো মেঝে দেখতে অসাধারণ। মসজিদের অন্যতম সৌন্দর্য হলো এর দেয়ালগুলো। সাতটি রং দিয়ে বার্নিশ করে বর্ণালি দৃশ্য আঁকা হয়েছে এতে। দৃশ্যগুলো সোনালি ও কালো সুতায় বেগুনি-লাল, গাঢ় নীল এবং অন্যান্য রঙের মিশেলে চিত্রায়িত। টিউলিপ ফুল, ভায়োলেট ফুল, লবঙ্গগাছ, ডেইজি ফুল, আঙুরপাতা ও আপেলগাছের ছবি ফুটে আছে ভেতরের প্রতিটি দেয়ালে।

শ্যামল নিসর্গের আবহ ও ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে সুলাইমানিয়া মসজিদ সমধিক পরিচিত। তাই তুরস্কের ভ্রমণকারী মুসলিম পর্যটকদের আগ্রহের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু বিখ্যাত সুলাইমানিয়া মসজিদ।


মন্তব্য