kalerkantho


পছন্দের পোশাক পায়জামা

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



পায়জামাকে আরবিতে ব্যবহৃত ‘সারাবিল’ বা ‘সিরওয়াল’ বলা হয়। শব্দটি মূলত ফারসি ভাষা থেকে গৃহীত।

শাব্দিকভাবে ‘সিরওয়াল’ বা ‘সারাবিল’ বলতে সালোয়ার, পায়জামা বা প্যান্ট-জাতীয় পোশাক বোঝানো হয়, যেগুলো শরীরের নিম্নাংশ আবৃত করার জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয় এবং দুই পা পৃথকভাবে আবৃত করা হয়। ইংরেজিতে (trousers, pants, panties)

 পায়জামা দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ায় ছেলে-মেয়ে উভয়ের মধ্যে প্রচলিত। অনেক ইংরেজিভাষী দেশে পায়জামা বলতে ঢিলেঢালা দুই প্রস্থবিশিষ্ট এক ধরনের পোশাককে বোঝানো হয়, যা মূলত ঘুমের সময় রাতের পোশাক হিসেবে পরিধান করা হয়। মাঝেমধ্যে সাধারণ আরামদায়ক পোশাক হিসেবেও পায়জামার ব্যবহার আছে। পায়জামা ফ্যাশনজগতে অনবদ্য ভূমিকা পালন করে আসছে সেই শুরু থেকেই।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে লুঙ্গির চেয়ে পায়জামার ব্যবহার কম ছিল। যদিও জাহেলি যুগেও পায়জামা আরবদের মধ্যে প্রচলিত ও পরিচিত ছিল। ‘সারাবিল’ বা পায়জামার ব্যবহার পারস্য ও অন্যান্য জাতি থেকে আরবদের মধ্যে প্রচলিত হয়েছে। এ জন্য কোনো কোনো সাহাবি পায়জামার পরিবর্তে আরবীয় ‘ইজার’ বা খোলা লুঙ্গি পরিধান করাকে উত্তম মনে করতেন।

এ বিষয়ে ওমর (রা.)-এর মতামতসংবলিত একটি হাদিস রয়েছে। সেখানে লুঙ্গি পরিধানে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।

এ থেকে মনে হয়, পায়জামার ব্যবহার আরবদের মধ্যে প্রচলিত থাকলেও তাঁদের কেউ কেউ পায়জামার চেয়ে লুঙ্গির ব্যবহার বেশি পছন্দ করতেন। এমনকি কোনো কোনো সাহাবি জীবনে কখনো পায়জামা পরেননি বলে জানা যায়। খলিফা ওসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর খাদেম আবু সাঈদ মুসলিম তাঁর শাহাদতের দিনের ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, ‘তিনি ২০ জন ক্রীতদাসকে মুক্তি দেন। এরপর একটি পায়জামা চেয়ে নেন এবং মজবুত করে তা পরিধান করেন। তিনি তাঁর জীবনে ইসলাম গ্রহণের আগে বা পরে কখনো সালোয়ার বা পায়জামা পরেননি। (নিহত হলে মৃতদেহের সতর অনাবৃত হতে পারে ভয়ে তিনি পায়জামা পরিধান করেন)। তিনি বলেন, গত রাতে আমি রাসুলুল্লাহ (সা.), আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.)-কে স্বপ্নে দেখেছি। তাঁরা বলেছেন, তুমি ধৈর্য ধারণ করো। আগামীকাল তুমি আমাদের সঙ্গে সকালের খাবার গ্রহণ করবে। এরপর তিনি কোরআনে কারিম চেয়ে নিয়ে খুলে পড়তে শুরু করেন। কোরআনের সামনেই তাঁকে শহীদ করা হয়। ’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৫২৬)

অন্যদিকে সাহাবি-তাবিয়িদের কেউ কেউ পায়জামাকে বেশি পছন্দ করতেন, কারণ তা সতর আবৃত করার জন্য বেশি উপযোগী। পায়জামা পরিধানের চেয়ে লুঙ্গি পরিধান প্রচলিত থাকার অর্থ এ নয় যে পায়জামার ব্যবহার রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ে ছিল না বা এটি অপছন্দনীয় ছিল। বরং রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিদের যুগে পায়জামার প্রচলন ছিল। তবে তা লুঙ্গির চেয়ে কম ব্যবহৃত হতো। সে সময় শরীরের নিম্নাংশ আবৃত করার জন্য ইজারই ছিল প্রধান পোশাক। পাশাপাশি পায়জামা বা সালোয়ারের ব্যবহার সুপরিচিত ছিল। হাদিস শরিফে অগণিত স্থানে ‘সারাবিল’ বা পায়জামার উল্লেখ আছে। হজের সময় হজ পালনকারী পুরুষ ও নারী কী ধরনের পোশাক পরিধান করবে ও কী ধরনের পোশাক পরিধান করবে না, সে বিষয়ে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এসব হাদিসে বলা হয়েছে, হজ বা ওমরার ইহরামকারী পুরুষ পায়জামা পরিধান করবে না। তবে যদি সে খোলা লুঙ্গি না পায়, তাহলে পায়জামা পরতে পারে। আর নারীরা ইহরাম অবস্থায় পায়জামা পরিধান করতে পারবে। এসব হাদিস সে যুগে পায়জামার ব্যাপক প্রচলন থাকার প্রমাণ বহন করে। একটি হাদিসে পায়জামার ওপর চাদর পরিধান না করে শুধু পায়জামা পরে নামাজ আদায় করতে নিষেধ করা হয়েছে। এ থেকেও বোঝা যায়, পায়জামার প্রচলন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সমসাময়িক আরবদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছিল। এমনকি শুধু পায়জামা পরিধান করে চলাফেরার অভ্যাস ছিল তাদের। এ জন্য তিনি শুধু পায়জামা পরিধান করে নামাজ আদায় করতে নিষেধ করেছেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক পায়জামা ক্রয় : রাসুলুল্লাহ (সা.) পায়জামা ক্রয় করেছেন বলে সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। সুওয়াইদ ইবনে কাইস (রা.) বলেন, ‘আমি ও মাখরাকা আবদি দুজনে কিছু কাপড় নিয়ে বিক্রির জন্য মক্কায় এসেছিলাম। (হজ মৌসুমে আমরা যখন মিনায় ছিলাম তখন) রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের কাছে আগমন করেন এবং একটি পায়জামা দামদর করে ক্রয় করেন। আমাদের কাছে একজন ওজনদার মূল্য হিসেবে প্রদত্ত দ্রব্য ওজন করে বুঝে নিচ্ছিল। তিনি তাকে বলেন, সঠিকভাবে ওজন করো এবং বাড়িয়ে দাও। (তিনি পায়জামাটির মূল্য হিসেবে প্রদত্ত দ্রব্য নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে একটু বেশি দেন)। অন্য বর্ণনায় সুওয়াইদ বলেন, হিজরতের আগেই আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে একটি পায়জামা বিক্রি করেছিলাম। ’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২২২০)

ওপরের হাদিস থেকে বাহ্যত বোঝা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে পায়জামা পরিধান করতেন এবং নিজের ব্যবহারের জন্যই তিনি তা ক্রয় করেছিলেন। তবে এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো সহিহ হাদিস পাওয়া যায় না। তিনি পায়জামা পরেছেন বলে একটি দুর্বল বর্ণনা পাওয়া যায়। হাদিসটি হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে পায়জামা ক্রয় করতে দেখে তাঁকে প্রশ্ন করেন যে তিনি পায়জামা পরিধান করেন কি না। উত্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘হ্যাঁ, বাড়িতে অবস্থানের সময় ও সফরের সময়, রাতে ও দিনে (সর্বদা আমি পায়জামা পরিধান করি); কারণ আমাকে সতর আবৃত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং পায়জামার চেয়ে ভালো আবরণ আমি আর পাইনি। ’ (তাবরানি আওসাত, হাদিস : ৬৫৯৪)

তবে খেয়াল রাখতে হবে, টাখনুর নিচে যেন পায়জামা পরিধান করা না হয়। হজরত উসামা ইবনে জায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘দাহিয়া কালবি (রা.) মহানবী (সা.)-কে যে কাপড় হাদিয়া দিয়েছেন, সেগুলোর মধ্য থেকে একটি মোটা কুবতি কাপড় (যা খুব নরম হয়ে থাকে) তিনি আমাকে পরিধান করার জন্য দেন। আমি কাপড়টি আমার স্ত্রীকে পরতে দিয়েছি। মহানবী (সা.) আমাকে বলেছেন, কী ব্যাপার, তুমি কুবতি কাপড়টি পরিধান করোনি কেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি তা আমার স্ত্রীকে পরতে দিয়েছি। তিনি আমাকে বলেন, তুমি তাকে নির্দেশ দাও সে যেন এর নিচে আরেকটা কাপড় পরে নেয়। কেননা আমার ভয় হচ্ছে, ওই কাপড় তার হাড়ের আকৃতি বর্ণনা করবে। ’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২১৭৮৬)

লেখক : শিক্ষক, মাদ্রাসাতুল মদিনা

নবাবপুর, ঢাকা


মন্তব্য