kalerkantho


যাঁর দয়ায় সিক্ত সবাই

আমিনুল ইসলাম হুসাইনী

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



দয়ার সাগর নবীজি আমার। হৃদয়ের স্পন্দন নবীজি আমার।

যাঁর অতুলনীয় চারিত্রিক মাধুর্যের প্রশংসায় মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন ‘খুলুক্বুন আজিম’। যাঁর পুরোটা জীবনই মুমিনের জন্য ‘উসওয়ায়ে হাসানাহ’। যিনি বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত, মানবাধিকারের সর্বজনীন রূপরেখা। তিনি হলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব এবং সর্বশেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)। যাঁর নামের অর্থই হচ্ছে প্রশংসিত।

তাই তো যুগে যুগে মনীষীরা এই মহামানবের প্রশংসা করেছেন, করছেন এবং করে যাবেন মহাপ্রলয় পর্যন্ত। এই প্রশংসা যেমনিভাবে করে গেছেন মুসলিম মনীষীরা, তেমনিভাবে করেছেন অমুসলিম মনীষীরাও। নবীজির অনুপমতায় মুগ্ধ হয়ে মহাত্মা গান্ধীজি বলেছিলেন, ‘আমি জীবনগুলোর মধ্যে সেরা একজনের জীবন সম্পর্কে জানতে  চেয়েছিলাম, যিনি আজ লাখো কোটি মানুষের হৃদয়ে অবিতর্কিতভাবে স্থান নিয়ে আছেন। যেকোনো সময়ের চেয়ে আমি বেশি নিশ্চিত যে ইসলাম তরবারির মাধ্যমে সেই দিনগুলোতে মানুষের জীবনধারণপদ্ধতিতে স্থান করে নেয়নি।

ইসলামের প্রসারের কারণ হিসেবে কাজ করেছে নবীর দৃঢ় সরলতা, নিজেকে মূল্যহীন প্রতিভাত করা, ভবিষ্যতের ব্যাপারে সতর্ক ভাবনা, বন্ধু ও অনুসারীদের জন্য নিজেকে চরমভাবে উৎসর্গ করা। ’

(Mahatma gandhi, statement published in ‘Young India’, 1924.)

নবীজির পবিত্র জীবনের মূল্যায়নে এই রকম উত্কৃষ্ট উক্তি আরো অসংখ্য মনীষীরা করে গেছেন। তবে এসব উক্তি বা উপমা তেমন কিছুই না সেই উপমার কাছে, যে উপমা স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা দিয়েছেন পবিত্র কোরআনে। আর তা হচ্ছে, সমগ্র জগতের জন্য ‘রহমত’ বলে সম্বোধন করা। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি তোমাকে বিশ্বজগতের রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি। (সুরা আম্বিয়া : ১০৭)

আরবি ‘রহমত’ শব্দের বাংলা অর্থ হলো কৃপা, পর-দুঃখমোচন, অনুগ্রহ, অনুকম্পা, বদান্যতা বা দয়া। যে দয়ার কোনো সীমারেখা নেই। যে দয়া অবারিত। যে দয়া মানুষ-অমানুষ, মুসলিম-অমুসলিম, পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ, বৃক্ষলতা, পদার্থ, প্রকৃতি-পরিবেশ এবং জগৎ ও মহাজগৎ—নির্বিশেষে সবার জন্যই প্রযোজ্য। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অতএব আল্লাহর অনুগ্রহেই আপনি তাদের প্রতি কোমলচিত্ত। যদি রুক্ষভাষী ও কঠোর হতেন, তবে তারা আপনাকে ছেড়ে দূরে চলে যেত। ’

(সুরা আলে ইমরান : ১৪৯)

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মুমিনদের এ কথা স্পষ্টই জানিয়ে দিলেন যে মুহাম্মদ (সা.) তাদের জন্য কতটা উদার ও দয়াশীল। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে এসেছে তোমাদের মধ্যকার এমন একজন রাসুল, তোমাদের দুঃখ যার কাছে দুঃসহ। তিনি তোমাদের হিতাকাঙ্ক্ষী, বিশ্বাসীদের প্রতি স্নেহশীল, দয়াময়। ’ (সুরা তাওবা : ১২৮)

নবীজি নিজে যেমন দয়াশীল ছিলেন, তেমনি তাঁর অনুসারীদেরও দয়ার শিক্ষা দিয়ে গেছেন। মানুষের প্রতি মানুষের দয়া, অপরের দুঃখে দুঃখিত হওয়া, দুঃখ মোচনে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করাই যে মানুষের পরম ধর্ম, সে কথাই তিনি বিশ্বলোকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। নবীজি বলেছেন, ‘যে মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহও তার প্রতি দয়া করেন না। ’ (সহিহ মুসলিম : ২৩১৯)

এখানে উপলব্ধির বিষয় হচ্ছে, নবীজি তাঁর অমূল্য বাণীতে শুধু ‘মুসলিম’ বা ‘মুমিন’ শব্দ উচ্চারণ না করে সর্বজনীনভাবে ‘মানুষ’ শব্দটি উচ্চারণ করেছেন। কেননা মানুষের জন্যই তো ধর্ম। তায়েফের সেই মর্মান্তিক ঘটনা কে না জানে? নবীজি আমার সেখানে আল্লাহর কথা বলতে গিয়ে পাথরের আঘাতে জর্জরিত হলেন, রক্তাক্ত হলেন। আল্লাহর আদেশে ফেরেশতা এসে বললেন, ‘আদেশ করুন, দুই পাহাড় একত্র করে এদের পিষে ফেলি। ’ নবী বললেন, ‘না, এদের পরপ্রজন্ম হয়তো ইসলাম গ্রহণ করতে পারে। ’ (সহিহ বুখারি : ৩২৩১)

নবীজি আমার অমুসলিম নাগরিকদের প্রতিও ছিলেন দয়ার সাগর। তাদের অধিকারপ্রাপ্তির ব্যাপারে তিনি মুসলমানদের অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে হুঁশিয়ার করে বলেছেন, ‘যদি কোনো মুসলিম অমুসলিম নাগরিকের ওপর নিপীড়ন চালায়, তার অধিকার খর্ব করে, তার ওপর সাধ্যাতীত বোঝা (জিজিয়া বা প্রতিরক্ষা কর) চাপিয়ে দেয় অথবা তার কোনো বস্তু জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়, তাহলে কিয়ামতের দিন আমি আল্লাহর আদালতে তার বিরুদ্ধে অমুসলিম নাগরিকের পক্ষাবলম্বন করব। ’

(আল-বায়হাকি, মা’রিফাতুস সুনান ওয়াল আসার, হাদিস : ৫৭৫০)

অন্য এক হাদিসে এসেছে—রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পাশ দিয়ে একবার এক লাশ নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তিনি যখন তা দেখে দাঁড়ালেন, উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম তখন বললেন, এ তো ইহুদির লাশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের জিজ্ঞেস করলেন, আলাইসাত নাফসা?

অর্থাৎ সে কি মানুষ নয়? (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৩১২)

সুবহানাল্লাহ! মানবতার কী সাহসী উচ্চারণ। আজকে যারা ‘মানবতার’ কথা বলছেন, তাঁদের বলব, দেখুন মানবতা কাকে বলে? শিশুদের জন্য নবীজির দয়া ছিল অফুরন্ত বসন্ত। তিনি শিশুদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন, তাদের কোলে তুলে নিতেন। আদরে আদরে ভরিয়ে দিতেন তাদের কচি হৃদয়।

হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) তাঁর নাতি হাসানকে চুমু খেলেন। সেখানে আকরা ইবনে হাবিস নামে এক সাহাবি বসা ছিলেন। হাসানকে চুমু খাওয়া দেখে তিনি বললেন, আমার ১০টি সন্তান রয়েছে। আমি তাদের কাউকে চুমু খাইনি। নবীজি তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতিও দয়া করা হবে না। ’

(বুখারি : ৫৬৫১, মুসলিম : ৬৫, আবু দাউদ : ৫২১৯)

নবীজির দয়ার পরশ শুধু মানবজাতিকেই সিক্ত করেনি, করেছে বাকহীন পশু-পাখির জগেকও। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, আমরা এক সফরে রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে ছিলাম। একসময় একটু প্রয়োজনে দূরে গেলাম। দেখলাম একটি লাল পাখি, সঙ্গে দুটি বাচ্চা। আমরা বাচ্চা দুটি ধরে নিয়ে এলাম। কিন্তু মা পাখিটিও চলে এলো। বাচ্চা দুটির কাছে আসার জন্য পাখিটি মাটির কাছে অবিরাম উড়ছিল। তখন রাসুল (সা.) এসে পড়লেন। তিনি এটি দেখে বললেন, কে এ বাচ্চা ধরে এনে এদের মাকে কষ্ট দিচ্ছে? যাও, বাচ্চা দুটি মায়ের কাছে রেখে এসো। (আবু দাউদ : ১৪৬/২)

‘দয়া’ মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় কিংবা আন্তর্জাতিক জীবনে খুবই প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ছোট এই একটি শব্দে লুকিয়ে আছে হৃদয়স্পর্শী গোটা জগতের শক্তি, মহত্ত্ব আর মুক্তি। সে জন্যই দয়াময় আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাঁর প্রিয় হাবিবকে সৃষ্টিজগতের জন্য মনোনীত করেছেন রাহমাতুল্লিল আলামিন। নবীজি আমার এমনই দয়াশীল ছিলেন, যাঁর দয়ার বর্ণনা লিখে বা বলে শেষ করার মতো নয়। এককথায় তিনি ছিলেন দয়ার সাগর। তাই আমাদের অবশ্যই নবীজির এই ‘দয়া’ গুণটি অর্জন করতে হবে। তবেই পৃথিবীর সব অশান্তির জাঁতাকল বন্ধ হয়ে পৃথিবী হয়ে উঠবে শান্তিময় উদ্যান।

 

লেখক : ইমাম ও খতিব

আদ্রা জামে মসজিদ, কসবা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

aminulislamhossaini15@gmail.com

 


মন্তব্য