kalerkantho


দিল্লি জামে মসজিদের আদলে নোয়াখালীর বজরা শাহি মসজিদ

সাখাওয়াত উল্লাহ

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



দিল্লি জামে মসজিদের আদলে নোয়াখালীর বজরা শাহি মসজিদ

নোয়াখালীর বজরা শাহি মসজিদ, স্থাপিত ১৭৪১ সাল

দিল্লির বিখ্যাত শাহি জামে মসজিদের অনুকরণে মোগল জমিদার আমান উল্লাহ খান ১১৫৪ হিজরি সাল, মোতাবেক ১১৩৯ বাংলা সনে—অর্থাৎ প্রায় ৩০০ বছর আগে নোয়াখালী জেলার বজরায় একটি শাহি মসজিদ নির্মাণ করেন। ১৭৪১ সালে মোগল সম্রাট মুহাম্মদ শাহর রাজত্বকালে তাঁর নির্দেশে ও অর্থে মিয়া আম্বরের সহযোগিতায় জমিদার আমান উল্লাহ খান এ মসজিদ নির্মাণ করেন।

জমিদার আমান উল্লাহ তাঁর বাড়ির সামনে ৩০ একর জমির ওপর উঁচু পাড়যুক্ত একটি বিশাল দিঘি খনন করেন। এ দিঘির পশ্চিম পাড়ে মনোরম পরিবেশে আকর্ষণীয় তোরণবিশিষ্ট প্রায় ১১৬ ফুট দৈর্ঘ্য, ৭৪ ফুট প্রস্থ এবং প্রায় ২০ ফুট উঁচু তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই ঐতিহাসিক মসজিদ নির্মাণ করেন। এ মসজিদের ভিত্তি সুদৃঢ় করার জন্য মাটির প্রায় ২০ ফুট নিচ থেকে ভিত তৈরি করা হয়। সুদৃশ্য মার্বেল পাথর দিয়ে গম্বুজগুলো সুশোভিত করা হয়। মসজিদে প্রবেশের জন্য রয়েছে তিনটি ধনুকাকৃতির দরজা। মসজিদের প্রবেশপথের ওপর রয়েছে কয়েকটি গম্বুজ। পশ্চিম দেয়ালে রয়েছে তিনটি কারুকার্য খচিত মিহরাব। মসজিদটি তৈরির ১৭৭ বছর পর ১৯০৯ সালে একবার মেরামত করা হয়।

আয়তাকার মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে লম্বা।

এর দৈর্ঘ্য ১৮.৬ ফুট ও প্রস্থ ৪.৬ ফুট—অর্থাৎ ৮৫.৫৬ বর্গফুট। মসজিদের পূর্বে তিনটি, উত্তরে ও দক্ষিণে একটি করে মোট পাঁচটি দরজা রয়েছে। মসজিদের পূর্ব দিকের মধ্যের দরজায় একটি ফারসি ফলকে এর নির্মাণকাল ও নির্মাতার নাম লেখা আছে। মসজিদের চার কোণে চারটি সুন্দর মিনার আছে। মসজিদের চারপাশে ছোট ছোট সুসজ্জিত সরু মিনার আছে, যা এর সৌন্দর্য অনেকাংশে বৃদ্ধি করেছে।

মসজিদের পূর্ব দিকে আছে বিরাট তোরণ। তোরণের দোতলার ওপরে মনোরম উঁচু মিনার রয়েছে। এর সৌন্দর্য ও অলংকরণের জন্য চীনা গ্লাস কেটে মসজিদের গায়ে লাগানো হয়। ১৯১১ থেকে ১৯২৮ সালের মাঝামাঝি সময়কালে আমানুল্লাহর বংশধর আলী আহমদ ও মুজিব আলদিন বজরা মসজিদের অভ্যন্তরভাগ অলংকরণ করেন। এমন কারুকার্যময় মসজিদ দিল্লি ছাড়া  বাংলাদেশের আর কোথাও নেই।

জানা গেছে, বাদশাহর আগ্রহে মক্কা শরিফের বাসিন্দা তৎকালীন অন্যতম শ্রেষ্ঠ বুজুর্গ হজরত মাওলানা শাহ আবু বকর সিদ্দিকী (রহ.) এ মসজিদের প্রথম ইমামের দায়িত্ব পালন করেছেন।

স্থানীয় জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ১৯৯৮ সালের ২৯ নভেম্বর সরকারি গেজেটে মসজিদটিকে প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো মসজিদটি রক্ষণাবেক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে মোগল স্থাপত্যকলায় নির্মিত এই মসজিদের সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন।

একদিকে সম্পত্তি বেদখল হওয়ায় মসজিদের নিজস্ব আয় বন্ধ হয়ে পড়েছে। জমিদারের দানের ২৭১ একর ৮১ শতাংশ জমির মধ্যে ২৫৯ একর ৪২ শতাংশ প্রজা বিলি দিয়ে ১২ একর ৩৯ শতাংশ জমি মসজিদের জন্য রাখা হলেও বর্তমানে মাত্র এক একর ৬০ শতাংশ আছে।

অন্যদিকে সংস্কারের কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে ৩০০ বছরের ঐতিহাসিক মোগল স্থাপত্য নিদর্শন বজরা শাহি মসজিদ।

 

লেখক : শিক্ষক

মাদ্রাসাতুল মদিনা, নবাবপুর, ঢাকা


মন্তব্য