kalerkantho


ভাষা ও ভালোবাসার ফেব্রুয়ারি

মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ভাষা ও ভালোবাসার ফেব্রুয়ারি

উতলা বসন্ত ভাষা ও ভালোবাসার ফেব্রুয়ারিতে পেয়েছে ঘুম ভাঙানিয়া চাঞ্চল্য। এই আবহ আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অহংকার।

এতেই জিজ্ঞাসা—‘ভাষা ও ভালোবাসা’ সম্পর্কে ইসলামের ব্যাখ্যা-বক্তব্য কী? এমন দায় থেকেই আমাদের নিবেদন :

ভাগল ব্রিটিশ সাতচল্লিশে

রয়ে গেল জালিম ও জুলুম

পাকিস্তানি হায়েনারা

শুরু করল হালুম-হুলুম।

উর্দু হবে ‘রাষ্ট্রভাষা’ আটচল্লিশে

হুঙ্কার ছাড়ে জিন্নাহ।

বাঙালি গর্জে  বলে : জি না, জি না!

এলো একুশে ফেব্রুয়ারি—

কথা ও কবিতার জন্মদিন...

পঁয়ত্রিশ কোটির বেশি ‘বনি আদমে’র প্রাণের ভাষা বাংলা। ভাষার প্রতি ভালোবাসার পরিক্রমায় আসে প্রিয় স্বাধীনতা, লাল-সবুজের পতাকা। মক্কা-মদিনার সাইনবোর্ডে আরবি-ইংরেজির পাশে স্থান পায় ‘বাংলা’। অনেক দেশ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিয়েছে, যা জাতিসংঘের ‘দাপ্তরিক ভাষা’ হওয়া সময়ের ব্যাপার। ইউনেসকো ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ‘একুশ’কে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করে।

ইসলাম মানুষের মুখের ভাষাকে বিশেষ মূল্য দেয়। পবিত্র কোরআনের সুরা রুম-২২, আর-রাহমান-০১-০৪, দুখান-৫৮, শুরা-০৭, ইউসুফ-০২, মারইয়াম-৯৭, ত্বোয়া-হা-১১৩, জুমার-২৮, নাহল-২৫, নুর-১৫, বালাদ-০৮-১০, ইব্রাহিম-০৪সহ বহু আয়াত তার প্রমাণ।

বিভিন্ন আসমানি কিতাব সমসাময়িক মানুষের মাতৃভাষায় অবতীর্ণ। যেমন, জাবুর- ইউনানি, তাওরাত-ইবরানি বা হিব্রু, ইঞ্জিল-সুরিয়ানি বা আরেমিয় ভাষায় এবং পবিত্র কোরআন প্রিয় নবী (সা.)-এর মাতৃভাষা আরবিতে অবতীর্ণ হয়। এমনকি হিব্রু ‘মু’ অর্থ পানি এবং ‘সা’ অর্থ কাঁটা শব্দের সন্ধিবদ্ধ রূপ ‘মুসা’। গ্রিক ‘জসোয়া’র ইংরেজি ‘জেসাস’, যার আরবি ‘ঈসা’ এবং বাংলারূপ ‘যিশু’!

বিশুদ্ধরূপে মাতৃভাষা শেখাতে প্রিয় নবী (সা.)-কে কোরাইশ বংশীয় রীতি অনুসারে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বিবি হালিমার (রা.) বেদুইন পরিবারে। ইসলাম প্রচারের সুবিধার জন্য প্রিয় নবী (সা.)-এর উৎসাহে স্বভাবকবি হজরত জায়েদ (রা.) সমসাময়িক সব ভাষায় দ্রুত সমান দক্ষতা অর্জন করেন। ফলে বিদেশি বা বহুভাষী মানুষের কাছে ইসলামের বাণী-বিধান পৌঁছে যায়। বাংলাদেশে আগত পীর-দরবেশরা গ্রাম ও বিজন প্রান্তরে বসবাস করে দেশীয় ভাষা শিখে ইসলাম প্রচার-প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছেন। অথচ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ইসলামের শাশ্বত চেতনা ভূলুণ্ঠিত করে—

‘বায়ান্নর একুশ তারিখ দুপুরবেলার ওয়াক্ত

বৃষ্টি পড়ে-বৃষ্টি কোথায়—বরকতেরই রক্ত। ’

আল মাহমুদের কবিতার রক্তাক্ত পথে যাঁরা পেলেন ‘অমরত্ব’, ইসলাম তাঁদের উচ্চ মর্যাদার সুসংবাদ শোনায়। মহান আল্লাহ বলেন, “যারা আল্লাহর পথে মারা যায় তোমরা তাদের মৃত বোলো না, বরং তারা ‘চিরঞ্জীব’...। ” (বাকারা : ১৫৪) অন্যদিকে একমাত্র শহীদরাই মৃত্যুভয়ে ভীত নন। প্রিয় নবী (সা.)-এর বাণী—‘একমাত্র শহীদরাই শাহাদাতের উচ্চ মর্যাদা দেখে আবার দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা করবে, যাতে সে ১০ বার (অসংখ্যবার) শহীদ হতে পারে। ’ (বুখারি-মুসলিম)

বীর শহীদের গর্বিত প্রতিনিধি মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম (১৯৫৩-২০১৩ খ্রিস্টাব্দ) কানাডায় সাত ভাষার ১০ ভাষাপ্রেমী নিয়ে গঠন করেন Mother Language Lover of the World। যাদের পক্ষে বাংলাদেশের রফিকুল ইসলাম ১৯৯৮ সালের ২৯ মার্চ জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনানের কাছে যে চিঠি লেখেন তা হলো—It’s a basic right of all human being to be able to practice their ‘Mother Language’ in their day-to-day life, but alas! Millions of people had been forced not to practice their ‘Mother Languages’ many were forced to forget their ‘Mother Language’, many unique languages are still facing serious crisis for their existence…once upon a time ‘Bangla’ was also facing serious crisis, in early fifties, the then regime dominated by different language spoken leaders decided that ‘the Bangalies’ will not be allowed to use their mother language as ‘official language’… (‘দলিলপত্র’, একুশে ফেব্রুয়ারি : জাতীয় থেকে আন্তর্জাতিক, কাকলী প্রকাশনী, ঢাকা-২০০০, পৃষ্ঠা ১১৫)।

‘একুশ’ জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের হাহাকার :

‘...দেশের সোনার ছেলে খুন করে রোখে মানুষের দাবি

দিনবদলের ক্রান্তিলগ্নে তবু তোরা পার পাবি?

না, না, না, না খুনরাঙা ইতিহাসে শেষ রায় দেওয়া তারই

একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি...

...তুমি আজ জাগো তুমি আজ জাগো একুশে ফেব্রুয়ারি

আজো জালিমের কারাগারে মরে বীর ছেলে বীর নারী

আমার শহীদ ভাইয়ের আত্মা ডাকে

জাগো মানুষের সুপ্ত শক্তি হাটে মাঠে ঘাটে বাটে

দারুণ ক্রোধের আগুনে আবার জ্বালব ফেব্রুয়ারি

একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি। ’

(আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী)

বাংলাদেশসহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, মনিপুর, বিহার ওড়িশা এবং মিয়ানমারের আরাকান জনগোষ্ঠীও বাংলা ভাষায় কথা বলে। ভারতের আসামে এবং আফ্রিকার সিয়েরা লিয়নে বাংলাকে দ্বিতীয় সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। রেডিও, টিভি ও ইন্টারনেটে সারা বিশ্বে বাংলা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশে দেশে প্রতিদিন বাংলায় রেডিও অনুষ্ঠান সম্প্রচার  করা হয় এবং সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। অথচ বর্তমানে বাংলাদেশে হিন্দি ও ইংরেজির আগ্রাসন বাড়ছে। নতুন প্রজন্ম ইংরেজি ও হিন্দির প্রতি আগ্রহী হওয়ার পাশাপাশি বাংলার প্রতি এক রকম বীতশ্রদ্ধ। এতে ভবিষ্যতে বাংলা ভাষার অস্তিত্বের সংকট দেখা দেওয়ার ভয়ও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। তাই আমাদের প্রাণের ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

আবেগের চূড়ান্ত ও নিঃশর্ত অভিব্যক্তির নাম ‘ভালোবাসা’। প্রেমের পবিত্র সৌধের গাঁথুনি মজবুত করেছে : লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদ, রজকিনি-চণ্ডীদাস, রাধা-কৃষ্ণের নানা উপাখ্যান। ভালোবাসার লোকজ রসায়ন :

‘ঋণচিন্তা রোগচিন্তা সংসারচিন্তা সকল চিন্তা দর

যৈবনকালে পীড়িতচিন্তা সকল চিন্তার বড়’

(মৈমনসিংহ গীতিকা)।

রোমান লোককথায় আছে, সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস তাঁর সৈন্যদের বিয়ে করা নিষিদ্ধ করলে এক প্রেমানুরাগী যাজক গোপনে সৈন্যদের বিয়ে দেওয়া শুরু করেন। সম্রাট তাঁকে কারাগারে পাঠান। কিন্তু যাজকের সেবা, ভালোবাসা ও চিকিৎসায় ‘কারাপ্রধানে’র কন্যার অন্ধত্ব দূর হয়। অন্যদিকে রাজনিষেধাজ্ঞা ভঙ্গের অপরাধে যাজকের মৃত্যুদণ্ড হয়। ওই যাজক মৃত্যুর আগে মেয়েটিকে শেষ বার্তা পাঠান—Love from your ‘VALENTINE’  ঘটনাটি ১৪ ফেব্রুয়ারি ২৭০ খ্রিস্টাব্দের। ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে রোম সম্রাট জেলুসিয়াস ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুদিন ১৪ ফেব্রুয়ারিকে  ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ ঘোষণা করেন।

ঈমানদারের ভালোবাসা মহান আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর জন্য নিবেদিত। ঈমানদারের ভালোবাসা প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের বাণী—‘বিশ্বাসীর বন্ধন আছে আল্লাহর/ ভালোবাসার এইরূপ ছেদ নাহি যার। ’ (কাব্যানুবাদ, বাকারা : ১৬৫)

আবার আল্লাহর ভালোবাসার জন্যই ভালোবাসতে হবে প্রিয় নবী (সা.)-কে। মহান আল্লাহর বাণী : ‘(বলুন) যদি তোমরা আল্লাহর ভালোবাসা পেতে চাও, তবে (আমি রাসুল) আমার আনুগত্য করো। তবেই আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন। ’ (আলে ইমরান : ৩১)

প্রিয় নবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার কারণেই, প্রিয় নবীর (সা.) নিদ্রাভঙ্গের আশঙ্কায় হিজরতের সময় সাপের গর্তের মুখে পা চেপে রেখেছিলেন আবু বকর (রা.)। হিজরতের কঠিন সময়ে মৃত্যুভয়ে আতঙ্কিত না হয়ে শত্রু পরিবেষ্টিত ‘নবীগৃহে’ বিছানায় শুয়ে ছিলেন আলী (রা.), আমানতের মাল ফেরত দেওয়ার জন্য। ওমর (রা.) চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘আমি আপনাকে জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। ’

পরিশেষে বলি, ঈমানদারের ভালোবাসা হতে হবে মহান আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর আদর্শ অনুসারে। অন্যদিকে শহীদের অমূল্য ত্যাগের শিক্ষায় আমাদের শপথ হোক—আমরা মায়ের ভাষাকে ‘বিশ্বভাষা’র মর্যাদায় উচ্চকিত করব। তাই ‘ভাষা ও  ভালোবাসা’নির্ভর একটি দিবস পালনের সীমাবদ্ধ আবেগে বিদেশি সংস্কৃতির সঙ্গে আপস কাম্য নয়।            

 একুশ আমার স্বাধীনতার সংগ্রামী স্লোগান

একুশ মানে মৃত্যুর বন্দনায় জীবনের জয়গান

 

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ

কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর


মন্তব্য