kalerkantho


শিক্ষার প্রসারে মুসলমানদের অবদান

আবদুল আইয়ুম আল আমিন   

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



শিক্ষার প্রসারে মুসলমানদের অবদান

ইকরা—এই নির্দেশই ছিল ইসলামের প্রথম শিক্ষা। ইকরা মানে পড়ুন, পাঠ করুন, উপলব্ধি করুন।

শিক্ষার এই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মুসলিমরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় ব্যুত্পত্তি লাভ করে বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে অমূল্য অবদান রেখে গেছে। একদল প্রথিতযশা ঐতিহাসিক, বিজ্ঞানমনস্ক গবেষক ও তথ্য-উদ্ঘাটক (যেমন—জন উইলিয়াম ড্র্যাপার, গুইজট, জন ডেভেনপোর্ট, স্টেনলি লেন-পুল, এম পি ই বার্থেলট ও অতি-উৎসাহী এবং নিবেদিত আধুনিককালের ই জে হোইয়ার্ড ম্যাক্স মেয়ারহফ, জর্জ সার্টন এবং ফিলিপ কে হিট্টি) সম্পূর্ণভাবে এই ঐকমত্যে পৌঁছেন এবং স্বীকার করেছেন যে ‘মুসলিম আরবরা শুধু প্রাচীন গ্রিক, পারসিক ও ভারতের জ্ঞান-বিজ্ঞান সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থাই করেননি, বহুলাংশে সেসবের সমৃদ্ধি ঘটিয়েছেন। ’

অষ্টম শতাব্দীর গোড়া থেকে চতুর্দশ শতাব্দীর শেষ ভাগ পর্যন্ত মুসলিমরা ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানে দক্ষতা অর্জনে অত্যন্ত সন্ধিত্সু জাতি। তারা শুধু নিজেরাই জ্ঞানচর্চা ও অনুশীলনে নিরত ছিল না, বরং জ্ঞানান্বেষু অন্যান্য জাতিকে তাদের অধিত জ্ঞানের অংশীদার করতেও কুণ্ঠিত হয়নি। মুসলিম বিজ্ঞানী ও দার্শনিকরা জ্ঞান সাধনার পাশাপাশি ধর্মপ্রচারক ও সমরনায়কদের সঙ্গে বিদেশেও পাড়ি জমিয়েছেন। মুসলিমদের জ্ঞান ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসে এভাবেই বন্য দ্যালামাইতস, স্যালজুক, তাতারস ও বার্বার জাতি শান্তির সন্ধান খুঁজে পেয়েছে। তবে মুসলিম সভ্যতার জন্য ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিল চেঙ্গিস খান, হালাকু খান নামে মানবতার শত্রুরা। মামলুক সুলতানদের দ্বারা মানবতার এই শত্রুরা প্রতিহত না হওয়া পর্যন্ত এরা মুসলিম জ্ঞান-বিজ্ঞানের অর্জন ও কৃতিগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে যাচ্ছিল।

মিসর ও সিরিয়া চিরদিনই সালাহ আল দীন (জন্ম : তিকরিত, ১১৩৮, মৃত্যু মার্চ, ১১৯৩), রোকন আল দীন বাবর (১২৬০-৭৭) এবং সাইফ আল দীন কালাউন (১২৭৯-৯০) প্রমুখের জন্য গৌরবান্বিত বোধ করবে।

এঁরা যে শুধু ক্রুসেডেই গৌরবময় ভূমিকা রেখেছিলেন তা নয়, বরং জ্ঞান সাধনা, ইসলামের প্রতি গভীর নিষ্ঠা ও আনুগত্য, সুকুমার শিল্পকলা, স্থাপত্যশিল্প, হাসপাতাল স্থাপন, খাল খনন প্রভৃতি শিক্ষা ও জনহিতকর কার্যক্রমের জন্য যুগ যুগ ধরে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

আরব থেকে মুসলিম শিক্ষা ও সংস্কৃতি কিভাবে ইউরোপে বিস্তৃতি লাভ করেছে, সে ইতিহাস সত্যিই চমকপ্রদ। মূলত সিসিলি ও স্পেন ছিল এসব বিস্তৃতির প্রধান উৎসস্থল। সিসিলির ছিল খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত দুজন শাসক। তাঁরা হলেন রজার দ্বিতীয় এবং ফ্রেডরিক দ্বিতীয়। এ ছাড়া ছিলেন হোহেনস্টফেন, বিশেষত শেষোক্তজন আলপস্ পর্বতমালা অতিক্রম করে আরবের মুসলিম শিক্ষা ও সংস্কৃতি বহন করে নিয়ে আসে ইউরোপে এবং লোথারিঞ্জিয়া [Lotharingia (Lorraine)], লাইজি [Liege], জর্জি [Gorge] এবং কোলন [Cologne]—এই স্থানগুলো ক্রমেই আরব থেকে আনীত মুসলিমদের জ্ঞানের লালনকেন্দ্ররূপে পরিচিতি লাভ করে। স্পেন থেকে এই জ্ঞান পিরিনিস [Pzrenees] ডিঙিয়ে ক্রমেই পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়ে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মুসলিমরা যখন একপর্যায়ে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও কর্মকাণ্ডে স্থিত হয়ে যায়, খ্রিস্টীয় ইউরোপ তখন চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিতশাস্ত্র, জ্যোতির্বিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, রসায়নশাস্ত্র প্রভৃতি ক্ষেত্রে ক্রমেই অগ্রসরমাণ। বিশেষ করে কর্ডোভা, টলেডো, সেভিল ও গ্রানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ডিগ্রিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা দেশে ফেরত আসার পর বর্ণিত বিষয় ও ক্ষেত্রগুলো শনৈঃ শনৈঃ অগ্রগতি লাভ করতে থাকে। বিস্ময়করভাবে মুসলিমদের জ্ঞান তখন পরিশ্রমী অনুবাদকদের দ্বারা অনূদিত হয়ে ইউরোপে স্থানান্তরিত হতে থাকে। এসব অনুবাদকের মধ্যে বিশ্বব্যাপী খ্যাতিমান হয়ে আছেন জেরার্ড অব ক্রেমোনা, অ্যাডেলার্ড অব বাথ, রবার্ট অব চেস্টার, মাইকেল স্কট, স্টিফেন অব সারাগোসা, ইউলিয়াম অব লিউনিস, ফিলিপ অব ত্রিপোলি। অনুবাদের মাধ্যমে লাতিন জনগণের মধ্যে ওই অনুবাদকরা মুসলিম আরবদের জ্ঞান সহজলভ্য করে তোলে। কিছু বই হিব্রু ভাষায়ও অনূদিত হয়। অন্যদিকে কিছুসংখ্যক হিব্রু ও লাতিন গ্রন্থ ইউরোপের নিজস্ব ভাষায়ও অনূদিত হয়। ইউরোপের স্যালার্নোতে চিকিৎসাবিজ্ঞান অধ্যয়ন শুরু হয়।

আফ্রিকার অধিবাসী কনস্টানটাইন চিকিৎসাবিজ্ঞান শেখার জন্য সৌভাগ্যক্রমে সেখানকার মেডিক্যাল কলেজে একজন আরবকে পেয়েছিলেন শিক্ষক হিসেবে। মন্টপেলিয়ার ও প্যারিস খুব শিগগিরই এই ধারা অনুসরণ করে নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করে। তখনকার দিনে আরবি ভাষাই ছিল বলতে গেলে সমগ্র বিশ্বের বিদ্যাশিক্ষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম, ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলগুলোতে আরবি ভাষায়ই পড়ানো শুরু হলো। বিশেষত টলেডো, নারবোনে, নেপলস, বোলোনা ও প্যারিস প্রভৃতি শহরে আরবি ভাষাকে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে পড়াশোনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুল স্থাপন করে।

নির্ভরযোগ্য লেখক ও গবেষকদের মতে, মুসলিম স্পেন থেকে ফ্রান্স ও তার পার্শ্ববর্তী দেশগুলো এবং মুসলিম অধ্যুষিত সিসিলি থেকে ইতালিতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির চাষাবাদ বিস্তৃতি লাভ করে। স্পেনের মুসলিম শাসকরা সে সময় যে সেচপদ্ধতির প্রবর্তন করেন এবং তাঁদের উদ্যানবিদ্যা তথা কৃষি-বনায়নপদ্ধতি প্রয়োগ করেন, তা অচিরেই দেশকে শাক-সবজি ও কৃষিজাত ফসলে স্বনির্ভর এবং সবুজাভ স্পেনে রূপান্তরিত করে। মুসলিমদের এসব গৌরবময় অতীতের ঘটনাবহুল ইতিহাস ও ঐতিহ্যময় কর্মকাণ্ডের কিছু ঘটনা লিপিবদ্ধ হয়েছে আবু জাকারিয়া ইবনে মুহাম্মাদ আল-আওয়াম ইশবিলি বিরচিত ‘কিতাব আল-ফলাহাত’ গ্রন্থে। আবু জাকারিয়া রচিত গ্রন্থে ন্যূনপক্ষে ৫৮৫টি প্রজাতির উদ্ভিদ নিয়ে আলোচনা সন্নিবিষ্ট হয়েছে। প্রতিটি লেখায় উদ্ভিদগুলো রোপণ ও নার্সিং করার সুস্পষ্ট নিয়মাবলি সুগ্রন্থিত।

জ্ঞানের এমন কোনো শাখা নেই, যেখানে মুসলিমদের পারদর্শিতা ছিল না। দার্শনিক আল-কিন্দি, আল-ফারাবি, ইবনে সিনা ও ইবনে রুশদ সমসাময়িককালের ‘জ্ঞানভাণ্ডার’ নামে পরিচিত হতেন। আল-কিন্দি চক্ষুরোগ, রসায়ন, চিকিৎসা ও দর্শনে অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। তিনি শতাধিক পুস্তক প্রণয়ন করেন। ইবনে সিনা মাত্র ১৮ বছর বয়সে চিকিৎসাশাস্ত্রে ব্যুত্পত্তি অর্জন করে বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে যে দুটি বিশ্বকোষ ইবনে সিনা রচনা করেছিলেন, সেসব দ্বাদশ থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত চিকিৎসাজগতে পথপ্রদর্শক গ্রন্থ বলে বিবেচিত হতো। পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত তাঁর বইগুলো ১৬ বার পুনর্মুদ্রিত হয়।

রসায়ন, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, ভূগোল, ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব ইত্যাদি সব বিষয়েই মুসলিম গবেষক ও বিজ্ঞানীদের যথেষ্ট দখল ছিল। আল-খাওয়ারিজমি, মুসা বিন সাকির, আলবিরুনি, ওমর খৈয়াম, ফেরদৌসি, মাসুদি, আত-তাবারি, ইবনে খলদুন—এমন আরো শত শত বিজ্ঞানী ও জ্ঞানতাপস যুগে যুগে জ্ঞান চর্চা করে বিশ্বকে যে আলোকবর্তিকা দিয়ে গেছেন, তা আজও তথাকথিত পাশ্চাত্য সভ্যতার কাছে অমূল্য অবদান হিসেবে স্বীকৃত। মুসলিমদের জ্ঞানচর্চা চলছিল ৫০০ বছর, আর এই সময়ই ছিল ইউরোপের ইতিহাসের অন্ধকারতম যুগ। একই সময় ভারতবর্ষ অবনত ছিল প্রতিক্রিয়াশীল ব্রাহ্মণাত্যের অধীন, যা বৌদ্ধধর্মকে বিধ্বস্ত কিংবা বিকৃত করেছিল।

মানুষের হৃদয়ে জ্ঞানের আলো জ্বালানোর নির্দেশ ‘ইকরা’ দিয়ে শুরু হয়েছিল ইসলামের শিক্ষার সূচনা। তা শতাব্দীর পর শতাব্দীজুড়ে মানবসভ্যতাকে আলো বিতরণ করে গেছে, কোনো ধরনের মানবিক বিকৃতি ছাড়াই। মানুষকে কোনো বস্তু বা প্রাকৃতিক কোনো শক্তির দাসত্বে পরিণত করেনি। মানুষকে যন্ত্র বলে উল্লেখ করেনি, যেমনটা পাশ্চাত্য শিক্ষাদর্শন করেছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব বিষয়ে গভীর বিস্তৃতি সত্ত্বেও মানুষের যে মর্যাদা আল্লাহ দান করেছিলেন, তা অক্ষুণ্ন ছিল। মানুষ শুধু আল্লাহর ইবাদতকারী অনুগত বান্দা হয়ে তাঁর অন্য সব সৃষ্টির ওপর মর্যাদাবান হয়েই ছিল। আল্লাহ সব সৃষ্টির মধ্যে শুধু মানুষই শিক্ষার মাধ্যমে নিজের জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার বিকাশ সাধন করতে পারে, স্থান-কাল-পাত্রভেদে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে এবং প্রকৃতিকে নিজের আয়ত্তে এনে কাজে লাগাতে পারে। মানুষের এই অনন্য গুণ তাকে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধির মর্যাদায় আসীন করেছে।

ইসলামের দৃষ্টিতে দেহ ও মন উভয় নিয়েই মানুষ। সুতরাং যে শিক্ষা মানুষের দেহ ও মন উভয়ের বিকাশ সাধন করে, স্রষ্টার সঙ্গে মানুষের পরিচয় ঘটায়, নৈতিকতা ও মাধুর্য বৃদ্ধি করে, কর্মদক্ষতা ও যোগ্যতার উন্নতি সাধন করে ও আল্লাহর সৃষ্টিকে মানবতার কল্যাণে নিয়োজিত করে, তা-ই ইসলামী শিক্ষা। আমরা যাকে সাধারণ শিক্ষা বলে অভিহিত করি, তার মধ্যে যদি আল্লাহর কুদরতের পরিচয় পাওয়া যায় এবং সেটিকে মানবতার কল্যাণে ব্যয় করা হয়, তাহলে তা-ও ইসলামী শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত।

ইসলামের সোনালি যুগে সাধারণ শিক্ষা ও ইসলামী শিক্ষা নামে শিক্ষার বিপরীতমুখী দুটি প্রকরণ ছিল না, বরং যাঁরাই কোরআন ও হাদিসের চর্চা করতেন, তাঁরাই সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন ইত্যাদি বিষয়ের চর্চা করেছেন। ইবনে রুশদ, ইমাম রাজি, গাযালি প্রমুখ মনীষী এর জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। মুসলিম বিশ্ব যখন সাম্রাজ্যবাদের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হচ্ছিল, তখন সাম্রাজ্যবাদী চক্র ইসলামী চেতনার শিক্ষার ধারাকে গুরুত্বহীন করার লক্ষ্যে মুসলিমদের মধ্যে সাধারণ শিক্ষা ও ইসলামী শিক্ষা নামে দুটি ধারা তৈরি করে দিয়ে যায়; যার সুদূরপ্রসারী ফলাফল দাঁড়িয়েছে এই—মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ ও অনৈক্য ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। মুসলিমরা আজ ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে দাঁড়ানোর শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। অথচ ইসলাম জ্ঞানকে এভাবে কখনোই বিভক্ত করেনি। জ্ঞান মুসলিমদের হারানো সম্পদ। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : ‘জ্ঞানের কথা বিজ্ঞজনের হারানো সম্পদ। সে যেখানেই তা পাবে সে-ই হবে তার সবচেয়ে বেশি অধিকারী। ’

হাদিসটিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) জ্ঞানকে সাধারণ শিক্ষা ও ইসলামী শিক্ষা নামে কোনো বিভেদ করেননি। তাই বোঝা যায়, মানুষের কল্যাণে যে জ্ঞানই উপকারী হয়, সবই ইসলামী শিক্ষা। বিশুদ্ধ নিয়তে, আল্লাহর নামে পাঠ করা হলে যেকোনো ধরনের জ্ঞান অর্জনই ইবাদত বলে গণ্য হবে।

[সূত্র : সেমিনার প্রবন্ধ সংকলন, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার (ইষৎ পরিবর্তিত)]

 

লেখক : ইতিহাস গবেষক


মন্তব্য