kalerkantho


কিশোর অপরাধ : কারণ ও করণীয়

আবদুল কাইয়ুম

২৭ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



কিশোর অপরাধ : কারণ ও  করণীয়

শিশুরা ফুলের মতো পবিত্র। পবিত্র তাদের দেহমন। আজকের শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যৎ। আজকে যে ছোট্ট কোমল শিশু, একদিন সে দক্ষ ও যোগ্য নাগরিক হয়ে দেশ ও জাতির উন্নয়নে কাজ করবে।

কিন্তু বাংলাদেশসহ পৃথিবীর দেশে দেশে একটি সমস্যা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এটি হলো কিশোর অপরাধ। কিশোরদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চুরি, হত্যা, আত্মহত্যা, ধর্ষণ, ছিনতাই, পকেটমার, মাদক সেবন, ইভ টিজিংসহ এমন সব ভয়াবহ কাজ ও অঘটন ঘটিয়ে চলছে এবং এমন লোমহর্ষক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, যা অকল্পনীয়। বিষয়টি সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধবিজ্ঞানী, আইনবিদ, রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে। একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে সভ্যতার এ চরম উত্কর্ষের যুগে আমাদের ভবিষ্যতের আশা-ভরসার স্থল কিশোরসমাজের এ ব্যাপক বিপর্যয় সত্যিই বড় দুঃখ ও দুর্ভাগ্যজনক।

তবে সুনির্দিষ্টভাবে কত বছর বয়সসীমা পর্যন্ত অপরাধ ‘কিশোর অপরাধ’ হিসেবে বিবেচিত, তা নির্ভর করে সেই দেশের অপরাধ আইনের ওপর। কোনো কোনো সমাজে এটি ১৮ বছর এবং কোনো কোনো সমাজে আরো বেশি। তবে কোনো সমাজেই ২১ বছরের বেশি বয়স হলে কিশোর হিসেবে গণ্য করা হয় না।

‘জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ, ১৯৮৯’-এর প্রস্তাবনা ও অনুচ্ছেদ ১-এর মর্ম অনুসারে, ভ্রূণ সৃষ্টির সময় থেকে ১৮ বছরের নিচে প্রত্যেক মানবসন্তানই শিশু। যদি না শিশুর জন্য প্রযোজ্য আইনের আওতায় ১৮ বছরের আগে শিশুকে সাবালক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

শিশু-কিশোর অপরাধের কারণ

মনস্তাত্ত্বিক কারণ : ক. বয়ঃসন্ধিপ্রাপ্ত ছেলে-মেয়ের মধ্যে সহনশীলতার অভাব খুব প্রকট হয়ে ওঠে। এ সংকটের অন্যতম কারণ অপরিণত আবেগের বৃদ্ধি। সেই স্বতঃস্ফূর্ত আবেগে যদি বাধা আসে, তাহলে সহনশীলতার অভাব ঘটতে বাধ্য। এই বিপর্যয়ই কৈশোরের অনেক বিতণ্ডার মূল।

খ. শিশু-কিশোরদের আমরা অনেক কিছুই ঠিকমতো শেখাই না। ফলে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে তারা সেভাবে সচেতন হয়ে উঠতে পারে না। জীবনে অনেক জিনিসই পাওয়া যায় না। এ না পাওয়ার ব্যাপারটা যে জীবনেরই অঙ্গ, আমরা তা শেখাই না।

গ. কোনো কোনো ছেলে-মেয়ে এ বয়সে Pathological lier  হয়ে যায়। তারা মিথ্যার মধ্যেই থাকতে শুরু করে। মিথ্যা আর সত্যের মধ্যে ভেদরেখাটা তাদের সামনে ক্রমেই মুছে যায়। তারা অবাস্তব স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। মাতা-পিতার সঙ্গে যত বেশি মানসিক বিভেদ, বাড়িতে যত অশান্তি বাড়তে থাকে, ততই এ মিথ্যাচারও বাড়তে থাকে। অসম্ভব জেদি, রাগী, একগুঁয়ে, সন্দেহপ্রবণ হয়ে এমন একটা পর্যায়ে তারা ক্রমেই চলে যায়, শেষ পর্যন্ত জীবনবিমুখ হয়ে পড়ে। সব রকম আনন্দ, স্পৃহা, উৎসাহ থেকে দূরে চলে যায়।

স্বভাবগত কারণ : কিশোরদের অপরাধী হওয়ার নেপথ্যে কিছু স্বভাবগত কারণও রয়েছে। যেমন—

সৃষ্টিজগতের প্রতি নির্দয় ব্যবহার, অতিরিক্ত অবাধ্যতা, স্কুল-পলায়ন, দেরিতে ঘরে ফেরা,  বেঢপ ও মলিন পোশাক পরিধান, শারীরিক অপরিচ্ছন্নতা, অকর্তিত কেশ, দুঃসাহসিকতা, অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়তা, অতিমাত্রায় ছায়াছবিপ্রিয়তা ইত্যাদি।

কিশোর অপরাধের কারণ হিসেবে মাতা-পিতা

কিছু কিছু ক্ষেত্রে মাতা-পিতার কারণে কিশোর অপরাধী হয়ে থাকে।

ক. সংসারত্যাগী বা পলাতক মাতা-পিতা। এরা সন্তানের রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা না করে পলাতক হয়েছেন। সন্তান তাঁদের স্নেহ-মমতা থেকে বঞ্চিত থাকে।

খ. অপরাধী মাতা-পিতা। এরা সন্তানকে পাপের মধ্যে রেখে বড় করেন। কখনো বা সন্তানের সহায়তায় পাপ করেন।

গ. অপকর্মে সহায়ক মাতা-পিতা। এরা সন্তানের অপরাধস্পৃহায় উৎসাহ দেন।

ঘ. অসচ্চরিত্র মাতা-পিতা। তাঁরা নির্বিচারে সন্তানের সামনেই নানা অসামাজিক কাজ করেন ও কথা বলেন।

ঙ. অযোগ্য মাতা-পিতা। এরা সন্তানকে প্রয়োজনীয় ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাদানে অমনোযোগী বা অপারগ।

আধুনিককালে শহরগুলোতে দেখা যায়, মা-বাবা উভয়ে ঘরের বাইরে কাজ করছেন। ফলে সন্তান তাঁদের উপযুক্ত স্নেহ-শাসন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই তারা আচরণে বিদ্রোহধর্মী হয়ে যাচ্ছে। এমনটিও দেখা যায় যে মৃত্যু বা বিবাহবিচ্ছেদের ফলে কোনো কোনো কিশোর মা অথবা বাবাকে হারাচ্ছে। এ কারণেও কিশোরদের স্বাভাবিক বিকাশে সমস্যা দেখা দেয়। তারা সমাজবিরোধী কাজকর্মে লিপ্ত হয়। পরিবার হলো সমাজের প্রাণকেন্দ্র। সামাজিক সম্পর্ক সৃষ্টি ও বৃদ্ধি হয় পরিবারকে কেন্দ্র করে। মানবজাতির প্রথম ঐক্যের ভিত্তি হলো পরিবার। পরিবারকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা উন্নত সংস্কৃতির কারণে পশ্চিমা অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষ মানসিক দিক থেকে অনেক সুখী। ভোগবাদী মানসিকতা ও পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থার কারণে বর্তমানে সে সুখের জায়গায় চিড় ধরেছে। পারিবারিক সুখের বন্ধনগুলো ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। এর শিকার হচ্ছে শিশু-কিশোররা।

অনেক ক্ষেত্রে অসৎ সঙ্গকেও কিশোর অপরাধের জন্য দায়ী করা হয়।

দারিদ্র্য : দারিদ্র্য যে অপরাধের জন্য দায়ী, তা বলাই বাহুল্য। দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত পরিবারে কিশোর-কিশোরী তার নিত্যদিনের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণে ব্যর্থ হয়। ফলে তার মধ্যে কিশোর অপরাধমূলক আচরণ সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে এরা ছোটখাটো চুরি বা ছিনতাইয়ে অংশগ্রহণ করে। দারিদ্র্যের কারণে আত্মহত্যা বা ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় পতিতাবৃত্তি গ্রহণ করতেও বাধ্য হয় অনেক কিশোর-কিশোরী।

সন্তানদের সঠিক প্রতিপালনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে ইসলাম। এ প্রসঙ্গে ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.) বলেছেন, ‘পিতার ওপর পুত্রের যে অধিকার আছে, পুত্রের ওপরও পিতার তদ্রূপ অধিকার আছে। পিতার অধিকার হলো, পুত্র শুধু আল্লাহকে অমান্য করার আদেশ বাদে তাঁর সব আদেশ মেনে চলবে এবং পুত্রের অধিকার হলো, পিতা তার একটি সুন্দর নাম রাখবে, তাকে উত্তম প্রশিক্ষণ দেবে এবং কোরআন শিক্ষা দেবে।’ (নাহজুল বালাগা)

ইসলাম অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই তাকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করতে চায়। এ কারণে ইসলামী শরিয়ত মানুষের নৈতিক সুরক্ষার্থে নিম্নবর্ণিত কর্মসূচি, বিধান ও মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে।

ক. ইসলাম আশৈশব ব্যক্তির সংশোধন, তার মন পবিত্র ও পরিশুদ্ধকরণ এবং তাকে নির্মলভাবে লালন ও প্রশিক্ষণ দিয়ে উন্নত মহান চরিত্রে বিভূষিত করে তোলে। তার অন্তরে ঈমানের বীজ বপন করে তাকে কল্যাণমুখী বানাতে চায়। তার মধ্যে অপরাধবিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করতে চায়।

খ. ইসলাম নিষিদ্ধ কাজ করা থেকে দূরে রাখার জন্য খারাপ পরিণতির ভয় প্রদর্শন করে। সে খারাপ পরিণতি মানুষের সম্মুখে ভয়াবহরূপে চিত্রিত করে পেশ করা হয়েছে। যা স্বভাবতই মানবমনে এমন তীব্র ভীতির সঞ্চার করে, সে কিছুতেই সেই খারাপ কাজের দিকে পা বাড়াতে সাহস করে না।

গ. ইসলাম বিধিবিধানের মাধ্যমে সব ভালো কাজে পারস্পরিক সহযোগিতা, পারস্পরিক কল্যাণ কামনা, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজে নিষেধ, ধৈর্য অবলম্বনের উপদেশ এবং সব পাপ, সীমালঙ্ঘনমূলক কাজ, অন্যায়, জুলুম ও বিপর্যয় প্রতিরোধের নির্দেশ দেয়।

ঘ. মানুষের মন পবিত্রকরণ, আত্মা বিশুদ্ধকরণ এবং তাদের পাপ ও অভিশপ্ত কাজে জড়িত হওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য ইসলামে অবশ্য পালনীয় দুটি ইবাদত সর্বজনপরিচিত, মৌলিক ও ব্যাপক প্রভাবশালী ইসলামী জীবনে সর্বাধিক গুরুত্বের অধিকারী। এ দুটি ইবাদত হলো—সালাত ও সাওম। মূলত এ দুটি ইবাদতই বিশেষ প্রশিক্ষণস্বরূপ। যার চূড়ান্ত ও সর্বোচ্চ লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে সব ধরনের হীনতা-নীচতা থেকে মুক্ত করে কেবল এক আল্লাহর অনুগত বান্দা বানানো।

আবু দাউদ শরিফে নামাজ অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমাদের সন্তানকে সাত বছর বয়সে নামাজ পড়ার নির্দেশ দাও।’ নামাজ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলার ঘোষণা হচ্ছে, ‘নিশ্চয়ই সালাত মানুষকে সর্বপ্রকারের নির্লজ্জ ও ঘৃণ্য কাজকর্ম থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৪)

সাওম রমজানে মাসব্যাপী সিয়ামের প্রশিক্ষণমূলক কাজ। সিয়াম মানবমনের যাবতীয় কুপ্রবৃত্তির ওপর লাগাম লাগিয়ে দেয় এবং রোজাদারকে যাবতীয় অপকর্ম থেকে বিরত রাখে।

এভাবে আল ইসলামের উপযুক্ত মূলনীতি ও বিধানাবলির আলোকে মানবজীবনকে শৈশব-কৈশোর থেকে সব ধরনের অনাচার, পাপ ও পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত করা গেলে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই অপরাধজনক কাজ থেকে দূরে সরে থাকবে।

স্থূল দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ সন্তানকে কেবল এই জন্য ভালোবাসেন যে তারা তাঁদের ঔরসে জন্ম নিয়েছে। তাদের সঙ্গে তাঁদের রক্তের সম্পর্ক রয়েছে কিংবা বৃদ্ধকালে তাদের মাধ্যমে উপকৃত হওয়া যাবে। এসব অভিভাবকের কাছে সন্তান সৎ বা অসৎ হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ নয়। অতি আদর পেয়ে সন্তানটি জঘন্য অপরাধী হয়ে গেলেও বিষয়টি তাঁরা হালকাভাবে গ্রহণ করেন। এমন পরিস্থিতিতে তাঁরা অপরাধী সন্তানের পক্ষ নিতেও দ্বিধাবোধ করেন না। নৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কথাও তাঁরা তখন ভুলে যান। কিন্তু ঈমানদারের দৃষ্টি হতে হবে সত্যের প্রতি নিবদ্ধ। ঈমানদার ব্যক্তি অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেন না।

প্রাকৃতিক নিয়মে সন্তান মা-বাবার অধিকারে আসে। তাই তাদের সুশিক্ষা ও উন্নত প্রশিক্ষণ দিয়ে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্বও মা-বাবার ওপর বর্তায়। পর্যাপ্ত পরিশ্রম ও সর্বাত্মক প্রচেষ্টার পরও কোনো সন্তান আদর্শ মানুষ হতে না পারলে বুঝতে হবে যে মা-বাবার পরিশ্রম ও প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেছে। এ ধরনের সন্তানের সঙ্গে মা-বাবার নৈতিক ও মানসিক সংযোগ থাকার কোনো কারণ নেই। এমন অপরাধী সন্তানের ওপর প্রাকৃতিক বা পার্থিব শাস্তি আরোপিত হলে পরিবারের সদস্যদের তাদের পক্ষ নেওয়ারও সুযোগ নেই। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে এসেছে : তিনি (আল্লাহ) বললেন, ‘হে নুহ! সে তোমার পরিবারের কেউ নয়। সে অসত্কর্মপরায়ণ। সুতরাং যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে আমাকে অনুরোধ কোরো না। আমি উপদেশ দিচ্ছি, তুমি যেন অজ্ঞদের শামিল না হও।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৪৬)

সমাজকর্মী, মনোবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে যে অবক্ষয় ঘটছে, তারই প্রভাবে শিশু-কিশোর অপরাধ বাড়ছে। পরিবার ও কর্মক্ষেত্রেও সনাতন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ‘দুর্বল’ শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে।

কিশোর অপরাধের জন্য বিশ্লেষকরা সবচেয়ে বেশি দায়ী করছেন আকাশ সংস্কৃতি এবং অনলাইন প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাবকে। আকাশ সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ না করলে কিশোর অপরাধ দমন করা কঠিন।

বলা যায়, এটি অসম্ভবও বটে।

লেখক : ইতিহাস গবেষক



মন্তব্য