kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ইতিহাসের আয়নায় ১০ মহররম

আবু ইশতিয়াক

৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে আশুরার দিনটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন মুসলিম দেশে এদিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়।

ইরান, পাকিস্তান, লেবানন, ভারত, বাংলাদেশ, বাহরাইন, ইরাক, আলজেরিয়া প্রভৃতি দেশ সরকারি ছুটি পালন করে। ইসলামে আশুরার দিন রোজা রাখা মুস্তাহাব।

আশুরা পরিচিতি

হাদিসের ব্যাখ্যাকার বদরুদ্দিন আইনি (রহ.) লিখেছেন, আশুরা শব্দ ‘আল আশরু’ থেকে নির্গত। এর অর্থ দশ। তাফসিরবিদ কুরতুবি (রহ.) লিখেছেন, ‘আশুরা’ শব্দটি ‘আশিরা’ শব্দ থেকে এসেছে। অতিরঞ্জন ও সম্মান বোঝানোর জন্য এ শব্দের ব্যবহার হয়। (উমদাতুল কারি, খণ্ড-১১, পৃ. ১১৬)

আশুরার দিন সংঘটিত ঘটনাবলি

আশুরা ইতিহাসখ্যাত একটি দিন। পৃথিবীর সৃষ্টিলগ্ন থেকেই ঐতিহাসিকভাবে এটি প্রচলিত। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আশুরার দিন অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। অবশ্য সব ঘটনার বর্ণনাসূত্র প্রশ্নাতীত নয়। এখানে সেগুলো উল্লেখ করা হলো—

আদম (আ.)-এর তাওবা কবুল : আবু হাইয়্যান আন্দালুসি (রহ.) লিখেছেন : ‘শাহর ইবনে হাওশাব বলেন, আমার কাছে খবর এসেছে, নিশ্চয়ই আদমকে যখন দুনিয়ায় পাঠানো হয়, তখন তিনি ৩০০ বছর ধরে লজ্জায় আসমানের দিকে মাথা ওঠাননি। পরিশেষে আল্লাহ তাআলা আদমের তাওবা আশুরার দিন কবুল করেছেন। (আল বাহরুল মুহিত, খণ্ড-১, পৃ. ২৬৯) এ বিষয়ে মুসতাদরাক হাকেমে একটি বর্ণনা এসেছে, যাকে আল্লামা জাহাবি (রহ.) বানোয়াট কথা বলে অভিহিত করেছেন।

নুহ (আ.)-এর মহাপ্লাবন থেকে মুক্তি লাভ : নুহ (আ.)-এর আশুরার দিন মহাপ্লাবন থেকে মুক্তি পাওয়া বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়, তবে তা বিভিন্ন তাফসিরের কিতাবে এসেছে। তাফসিরে খাজেনে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্ণিত আছে যে নুহ (আ.) কিস্তিতে সওয়ার হন রজব মাসের ২০ তারিখ। আর কিস্তি তাদের নিয়ে ছয় মাস চলতে থাকে। তখন কিস্তি বায়তুল্লাহর পাশ দিয়ে গেলে সাত চক্কর দেয়। আর নুহ (আ.) ও তাঁর সঙ্গীরা আশুরার দিন কিস্তি থেকে অবতরণ করেন। তারপর নুহ (আ.) রোজা রাখেন এবং তাঁর সঙ্গীদের নির্দেশ দিলেন আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করার জন্য। (তাফসিরে খাজিন, খণ্ড-২, পৃ. ৪৮৬)

ইব্রাহিম (আ.)-এর জন্ম ও আগুন থেকে মুক্তি : আশুরার দিন ইব্রাহিম (আ.)-এর জন্ম ও আগুন থেকে মুক্তি পাওয়া বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। তবে তা বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে। আতিয়্যা ইবনে মুহাম্মদ সালিম লিখেছেন : আশুরার দিন হলো ওই দিন, যেদিন আল্লাহ ইব্রাহিমের ওপর থেকে নমরুদের আগুন নিভিয়ে দিলেন, তেমনি সেদিন আল্লাহ ফিরাউনকে লোহিত সাগরে ডুবিয়ে মারলেন। আর মুসা (আ.)-কে মুক্তি দিলেন। লোকেরা বলে থাকে, এসব ঘটনা আশুরার দিনই হয়েছে। (শরহে বুলুগুল মুরাম, খণ্ড-৭, পৃ. ১৫৩)

মুসা (আ.)-এর মুক্তি ও জাদুকরদের ওপর বিজয় লাভ : মুসা (আ.) আশুরার দিন মুক্তি পাওয়া সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। বুখারি, মুসলিম ও মুসানদে হুমাইদিতে এসেছে, হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) মদিনায় হিজরত করলেন, তখন ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা রাখেন। তখন তিনি বললেন, এটি কোন দিন, তোমরা যে রোজা রাখছ? তারা বলল, এটি এক মহান দিন, যেদিন আল্লাহ মুসা (আ.)-কে মুক্তি দিলেন ও ফিরাউনের পরিবারকে ডুবিয়ে মারলেন। তখন মুসা (আ.) শোকর আদায় করার জন্য রোজা রাখলেন। (দিনটির স্মরণে আমরা রোজা রাখি) রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, আমরা মুসার অনুসরণে তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার। তখন তিনি রোজা রাখলেন ও রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। (বুখারি, হাদিস : ৩৩৯৭; মুসলিম, হাদিস : ১১৩০)

ইউনুস (আ.)-এর জাতির তাওবা কবুল : আশুরার দিন ইউনুস (আ.)-এর জাতির তাওবা কবুল হওয়া বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়, তবে বিভিন্ন তাফসিরে তা উল্লেখ রয়েছে। আল্লামা খাজিন তাফসির খাজেনে লিখেছেন : সাইদ ইবনে জুবাইর বলেন, ইউনুস (আ.)-এর জাতিকে আজাব ঘেরাও করেছে, তখন তারা বলল, আমরা ইউনুসের কথার প্রতি ইমান এনেছি, আর তারা নিষ্ঠার সঙ্গে আল্লাহর দরবারে তাওবা করে। তখন তাদের রব তাদের প্রতি সদয় হলেন, তাদের দোয়া কবুল করলেন এবং তাদের শাস্তি মওকুফ করলেন। এটি আশুরা ও জুমার দিন হয়েছিল (খাজিন : ২/৪৬৫)

ঈসা (আ.)-এর জন্ম : ঈসা (আ.) আশুরার দিন জন্মগ্রহণ করা বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। খ্রিস্টানরা আশুরার দিনকে ঈসা (আ.)-এর জন্মদিন মনে করে। মুসতাদরাকে হাকেমে এসেছে : জাবির (রা.) যায়দ আম্মি থেকে বর্ণনা করেন, ‘ঈসা ইবনে মারিয়াম আশুরার দিন জন্মগ্রহণ করেন। ’ তবে আল্লামা জাহাবি (রহ.) বলেন, এ বর্ণনার সনদ দুর্বল। (হাকেম, হাদিস : ৪১৫৫)

আসহাবে কাহফের পার্শ্বপরিবর্তন : ইমাম রাজি (রহ.) লিখেছেন, মহান আল্লাহর বাণী—‘আমি তাদের (আসহাবে কাহফ) ডান ও বাঁ পার্শ্বে করি। ’ তাদের এ পরিবর্তনের সময়ের ব্যাপারে তাফসিরবিদদের মতানৈক্য আছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, কারো কারো মতে, তাদের পার্শ্ব প্রতিবছর আশুরার দিন পরিবর্তন করা হতো। (মাফাতিহুল গায়েব, খণ্ড-২১, পৃ. ৪৪৪)

কাবার গিলাফ পরিবর্তন : জাহেলি যুগে মক্কার কাফিররা এই দিন কাবার গিলাফ পরিবর্তন করত। বুখারিতে এসেছে, আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘সাহাবায়ে কেরাম রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার দিন রোজা রাখত। সেদিন ছিল কাবায় গিলাফ পরিধান করানোর দিন। যখন আল্লাহ রমজানের রোজা ফরজ করলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, যারা রোজা রাখতে চায়, তারা রোজা রাখবে, আর যারা ছেড়ে দিতে চায় তারা যেন ছেড়ে দেয়। (বুখারি, হাদিস : ১৫৯২)

হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত : মুজামে কবিরে এসেছে, হজরত জুবাইর ইবনে বাক্কার বলেন, হুসাইন ইবনে আলী (রা.) চতুর্থ হিজরির শাবান মাসের পাঁচ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। আর তাঁকে আশুরার জুমার দিন ৬১ হিজরিতে শহীদ করা হয়েছে। তাঁকে সিনান ইবনে আবি আনাস নাখায়ি হত্যা করে। তাতে সহযোগিতা করেছে খাওলি ইবনে ইয়াজিদ আসবাহি হিময়ারি। সে তাঁর মাথা দ্বিখণ্ডিত করেছে এবং উবাইদুল্লাহর দরবারে নিয়ে এসেছে। তখন সিনান ইবনে আনাস বলেন, আমার গর্দানকে স্বর্ণ ও রৌপ্য দ্বারা সম্মানিত করুন। আমি সংরক্ষিত বাদশাহকে হত্যা করেছি, আমি মা-বাবার দিক দিয়ে উত্তম লোককে হত্যা করেছি। (তাবরানি, মুজামে কবির, হাদিস : ২৮৫২)

কিয়ামত প্রতিষ্ঠা : মুসলিম শরিফে বর্ণিত হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নিশ্চয়ই নবী (সা.) বলেন, যে দিনগুলোতে সূর্য উদয় হয়, সেগুলোর মধ্যে উত্তম দিন হলো জুমার দিন। এদিন আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে। সেদিনই তাকে জান্নাত থেকে বের করা হয়েছে। আর কিয়ামত হবে জুমার দিনেই। ’ (কুশাইরি, হাদিস : ৮৫৪)

লোকমুখে প্রসিদ্ধ যে ১০ মহররম জুমার দিন কিয়ামত হবে। কিন্তু জুমার দিনে কিয়ামত হওয়া প্রমাণিত হলেও মহররমের ১০ তারিখে কিয়ামত হওয়া বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়।

 

লেখক : বিশিষ্ট ইসলামী গবেষক


মন্তব্য