kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ইংরেজি সাল ব্যবহার করা কি অবৈধ

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ

৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



চাঁদের গতি-প্রকৃতি হিসাবে যে সন গণনা করা হয়, সেটিকে বলা হয় চান্দ্র সন, আর সূর্যের গতি-প্রকৃতি হিসাবে যে সন গণনা করা হয়, তাকে বলা হয় সৌর সন। বর্তমান দুনিয়ায় প্রচলিত ইংরেজি সাল হচ্ছে সৌর সন আর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হিজরতের স্মৃতিবিজড়িত হিজরি সন হচ্ছে চান্দ্র সন।

ইংরেজি সালের অতীত-বর্তমান

খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে মধ্য আমেরিকার মেক্সিকোতে এক সভ্যতা ছিল। যার নাম ‘মায়া সভ্যতা’। সে সভ্যতার লোকেরা প্রথম আবিষ্কার করে, সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে আসতে পৃথিবীর সময় লাগে ৩৬৫ দিন। কিন্তু ইতিহাসমতে, মিসরীয় প্রাচীন সভ্যতা পৃথিবীতে সর্বপ্রথম সৌর সনের উদ্ভব ঘটায়। মিসরীয় ক্যালেন্ডার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মনে করেন, খ্রিস্টপূর্ব ৪২৩৬ অব্দ থেকে ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকার ব্যবহার শুরু হয়। মিসরীয়দের থেকে গ্রিকরা ক্যালেন্ডার ব্যবহারের সূত্রপাত ঘটায়। রোমানরা তাদের প্রথম ক্যালেন্ডার লাভ করে গ্রিকদের কাছ থেকে। রোমের উপাখ্যানখ্যাত প্রথম সম্রাট রমুলাস একটি নিজস্ব ক্যালেন্ডার চালু করার চেষ্টা করেছিলেন ৭৩৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে।

রোমানদের প্রাচীন ক্যালেন্ডারে মাস ছিল ১০টি এবং তারা বর্ষ গণনা করত ৩০৪ দিনে। মধ্য শীত মৌসুমের ৬০ দিন তারা গণনায় আনত না। শীতকালের ৬০ দিন বর্ষ গণনায় না আনার কারণে যে দুটি মাসের ঘাটতি হতো, তা পূরণ করার জন্য তাদের অনির্দিষ্ট দিন ও মাসের দ্বারস্থ হতে হতো। সে কারণে তখন জনসাধারণের মধ্যে ক্যালেন্ডারের ব্যবহার ছিল না বললেই চলে। পরবর্তী সময়ে রোমান সম্রাট নুমা ১০ মাসের সঙ্গে আরো দুই মাস যুক্ত করেন। সে মাস দুটিই হচ্ছে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি। রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের পরামর্শে খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ অব্দে সেই বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসের মধ্যখানে ৬৭ দিন ও ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে ২৩ দিনসহ মোট ৯০ দিন যুক্ত করে সংস্কারকৃত নতুন ক্যালেন্ডার চালু করেন। তাতে মার্চ, কুইন্টিলিস ও অক্টোবর মাসের দিনসংখ্যা করা হয় ৩১। অন্যদিকে দুই দিন যুক্ত করে জানুয়ারি মাসকে ৩১ দিন করা হয়। ফেব্রুয়ারি মাস ২৮ দিনেই থাকে। তবে প্রতি চার বছর অন্তর এর সঙ্গে এক দিন যুক্ত করা হয়। মিসরীয় ক্যালেন্ডারে সৌরবর্ষ ছিল ৩৬৫ দিনে। কিন্তু জুলিয়াস সিজারের সংস্কারের ফলে তা ৩০০ সাড়ে পঁয়ষট্টি দিনে এসে দাঁড়ায়। এই বর্ষপরিক্রমাকে ‘খ্রিস্টাব্দ’ বলা হয় কেন? এর জবাব হলো, যিশুখ্রিস্টের জন্মবছর থেকে গণনা করে ডাইও নিসিয়াম এক্সিগুয়াস নামের এক খ্রিস্টান পাদরি খ্রিস্টাব্দের প্রবর্তন করেন ৫৩২ অব্দে। ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে রোমের পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের পরামর্শে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার সংশোধন করেন। তাঁর নির্দেশে ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসের ৫ তারিখকে ১৫ তারিখ করে ১০ দিন বাদ দেওয়া হয়। ঘোষণা করা হয়, যেসব শতবর্ষীয় সাল ৪০০ দ্বারা বিভক্ত হবে, তা লিপইয়ার বলে গণ্য হবে। উপমহাদেশে ইংরেজরা তাদের শাসনামলে এই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের প্রচলন ঘটায়। তাই এটি আমাদের দেশে ইংরেজি ক্যালেন্ডার বা ইংরেজি সন নামে পরিচিত। ইংরেজি নববর্ষ আমাদের স্কন্ধে সিন্দবাদের সেই নাছোড় দৈত্যটির মতো এমনভাবে চেপে বসে আছে যে শত চেষ্টা করেও আমরা একে ছাড়তে পারছি না। এই ক্যালেন্ডার ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার উচ্ছিষ্ট হিসেবে আমাদের দেশে রয়ে গেছে।

ইংরেজি সাল ব্যবহার করার বিধান

সম্প্রতি সৌদি আরবে অর্থনৈতিক কারণে রাষ্ট্রীয় কাজে হিজরি সনের পরিবর্তে ইংরেজি সাল ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে হিজরি সন ছাড়া অন্য সন কি ব্যবহার করা ইসলামবিরোধী? এর জবাব হলো, হিজরি সন মুসলমানদের সন। মুসলমানদের উচিত এর অনুসরণ করা। এ ক্ষেত্রে উদাসীনতা কাম্য নয়। উম্মতের ওপর এর খোঁজখবর রাখা ফরজে কিফায়া। অর্থাৎ কেউ কেউ এর খবরাখবর রাখলে সবার দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু সবাই যদি এ বিষয়ে উদাসীনতা দেখায়, তাহলে প্রত্যেকেই গুনাহগার হবে। তবে প্রয়োজনে অন্য ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা অবৈধ নয়। বিশেষত খ্রিস্টাব্দ ও বঙ্গাব্দ বাংলাদেশে অনুসরণ করা হয়। এগুলোর অনুসরণে শরয়ি নিষেধাজ্ঞা নেই। খ্রিস্টবর্ষ খ্রিস্টানদের হাতে প্রবর্তিত হয়েছে বলে একে হারাম বলার সুযোগ নেই। কেননা পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সূর্য, চন্দ্র উভয়কে হিসাব-নিকাশ ও বর্ষ গণনার জন্য সৃষ্টি করেছেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনিই সেই সত্তা, যিনি সূর্যকে উজ্জ্বল আলোকময় করেছেন। আর চন্দ্রকে করেছেন স্নিগ্ধ আলো বিতরণকারী। তারপর এর জন্য গন্তব্য স্থির করেছেন, যাতে তোমরা বছরগুলোর সংখ্যা ও হিসাব জানতে পারো। ’ (সুরা : ইউনুস, আয়াত : ৫)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) লিখেছেন, ‘সূর্যের উদয়-অস্তের মাধ্যমে দিবসকে জানা যায়। চাঁদের আসা-যাওয়ার মাধ্যমে মাস, বছর চেনা যায়। ’ (ইবনে কাছির : ৪/২১৭)

সাধারণ লেনদেনের ক্ষেত্রে হিজরি সন ছাড়া অন্য সন অনুসরণের বিষয়ে ফোকাহায়ে কেরামের অভিমত নিম্নরূপ—‘চার মাজহাব অনুসারেই ক্রেতা-বিক্রেতা যখন লেনদেনের ক্ষেত্রে হিজরি তারিখ ছাড়া অন্য তারিখ ব্যবহার করে, তখন সময় নির্ধারণসংক্রান্ত জটিলতা কেটে যাবে। বেচাকেনাও শুদ্ধ হয়ে যাবে। তবে শর্ত হলো, সে তারিখের ব্যবহার তাদের জানা থাকতে হবে। ’ (আল মাউসুআতুল ফিকহিয়্যা আল কুয়েতিয়্যা : ১০/২৯)

তা ছাড়া ফিকহশাস্ত্রের কিতাবগুলোতে পারসিকদের ব্যবহৃত দিবস ‘নাইরুজ’ ও ‘মেহেরজান’ ঘিরে ব্যাপক আলোচনা এসেছে। এ সবই হিজরি ক্যালেন্ডার ছাড়া অন্য ক্যালেন্ডার অনুসরণের বৈধতার প্রমাণ বহন করে।

হজরত মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন, ‘সৌর হিসাব রাখা ও ব্যবহার করা একেবারেই নাজায়েজ নয়। বরং এই এখতিয়ার থাকবে, কোনো ব্যক্তি নামাজ, রোজা, জাকাত, ইদ্দতের ক্ষেত্রে চান্দ্রবর্ষের হিসাব ব্যবহার করবে। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অন্যান্য বিষয়ে সৌর হিসাব ব্যবহার করবে। কিন্তু শর্ত হলো, সামগ্রিকভাবে মুসলমানদের মধ্যে চান্দ্র হিসাবের প্রচলন থাকতে হবে। যাতে রমজান, হজ ইত্যাদি ইবাদতের হিসাব জানা থাকে। ’ (মা’আরেফুল কোরআন)

খুব ভালোভাবে স্মরণ রাখতে হবে, চন্দ্র-সূর্য দুটিই আল্লাহর দান। ইসলামের অনেক বিধিবিধান চন্দ্রের পরিক্রমণের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেও সূর্যের পরিক্রমণের সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেক বিধান আছে।

সূর্যের সঙ্গে সম্পর্কিত ইবাদত হলো—নামাজ, সাহরি, ইফতার ইত্যাদি। আবার চাঁদের সঙ্গে সম্পর্কিত ইবাদত হলো—তাকবিরে তাশরিক, শবেবরাত, শবেকদর, রোজা, জাকাত, ঈদুল ফিতর, আরাফার দিনের রোজা, ঈদুল আজহা, আশুরার রোজা, হজ পালন, নারীদের হায়েজ-নেফাসের মাসায়ালা, ইদ্দত পালন, তালাক ইত্যাদি।

আল্লামা ওহাবা জুহাইলি (রহ.) লিখেছেন : সূর্যকেন্দ্রিক হিসাব-নিকাশ থেকে উপকৃত হওয়ার ব্যাপারেও শরিয়তের নির্দেশনা আছে। আল্লাহ বলেন, ‘সূর্য ও চন্দ্র আবর্তন করে নির্ধারিত কক্ষপথে। ’ (সুরা : আর রহমান, আয়াত : ৫)

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আমি রাত ও দিনকে করেছি দুটি নিদর্শন। তারপর রাতের নিদর্শনকে অপসারিত করি এবং দিনের নিদর্শনকে আলোকপ্রদ করি, যাতে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ অনুসন্ধান করতে পারো। আর যাতে তোমরা বর্ষসংখ্যা ও হিসাব-নিকাশ করতে পারো। আমি তো সব কিছু বিশদভাবে বর্ণনা করেছি। ’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ১২)

জুহাইলি (রহ.) আরো লিখেছেন : সূর্যকেন্দ্রিক হিসাব ও চন্দ্রকেন্দ্রিক হিসাবে বিভিন্ন উপকারিতা আছে। সূর্যকেন্দ্রিক হিসাব সুপ্রতিষ্ঠিত, আর চন্দ্রকেন্দ্রিক হিসাব গ্রাম ও শহরে সব মানুষের জন্য সহজ। এ জন্য ইসলামের বিধিবিধান চন্দ্রকেন্দ্রিক হিসাবের আলোকে দেওয়া হয়েছে। নচেৎ চন্দ্র ও সূর্য কোনোটিকেই অনর্থক সৃষ্টি করা হয়নি। এগুলো সৃষ্টি করার পেছনে আল্লাহর  বিশেষ হেকমত আছে। আল্লাহর কোনো কাজ হেকমত থেকে খালি নয়। আল্লাহ বলেন, ‘আমি আকাশ, পৃথিবী ও উভয়ের মধ্যবর্তী কোনো কিছুই অনর্থক সৃষ্টি করিনি। ’ (সুরা : সাদ, আয়াত : ২৭)। (তাফসিরে মুনির : ১১/১১১)

 

লেখক : শিক্ষক, মাদ্রাসাতুল মদিনা, নবাবপুর, ঢাকা


মন্তব্য