kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বর্তমান যুগে হিজরতের বিধান

মুফতি হুমায়ুন কবির খালভি   

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



হিজরত শব্দের আভিধানিক অর্থ ছেড়ে দেওয়া, বর্জন করা। পরিভাষায় হিজরত বলা হয়, কোনো কারণে নিজের দেশ ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাওয়া।

প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে মানুষকে নিজের মাতৃভূমি ত্যাগ করে অন্যত্র যেতে হয়। এটাই মানুষের চিরাচরিত রীতি। মক্কার জীবনে দীর্ঘ ১৩ বছর ধৈর্য ধারণ করার পর মহানবী (সা.) যখন দেখলেন, কাফিররা মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা দিন দিন বাড়িয়ে দিচ্ছে, তখন তিনি শান্তির আশায় হেফাজত করার লক্ষ্যে সাহাবাদের হাবশায় হিজরতের অনুমতি দিলেন। নবুয়তের পঞ্চম বছর রজব মাসে ১১ জন পুরুষ ও পাঁচজন নারী আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। তাঁদের মধ্যে হজরত ওসমান (রা.)ও ছিলেন। এটাই ইসলামের প্রথম হিজরত। তাঁদের অনেকে মক্কায় পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার খবর শুনে ফেরত এসেছিলেন। পরে যখন দেখা গেল, খবরটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট, তখন নবুয়তের সপ্তম বছর জাফর (রা.)-এর নেতৃত্বে প্রায় ৮৬ জন পুরুষ ও ১৭ জন নারী সাহাবা দ্বিতীয়বার আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। এটি ইসলামের ইতিহাসে দ্বিতীয় হিজরত। পরে তাঁরা সপ্তম হিজরিতে সেখান থেকে মদিনায় হাজির হয়েছিলেন।

ইসলামের সবচেয়ে আলোচিত হিজরত হলো, মহানবী (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত। এ হিজরতের পটভূমি তৈরি হয়েছিল ঐতিহাসিক আকাবা নামক স্থানের শপথের মাধ্যমে। নবুয়তের ১১তম বছর মদিনার ছয়জন ইমানদার আর ১২তম বছর ১২ জন আকাবা নামক স্থানে ইসলাম ও মহানবী (সা.)-কে সাহায্য করার শপথ নেন। আর ১৩তম বছরে ৭৩ জন পুরুষ ও দুজন নারী মহানবী (সা.)-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন। তাঁরা মক্কার মুসলমানদের আশ্রয় দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। মহানবী (সা.) সাহাবাদের মহররম মাস থেকে মদিনায় হিজরত করার অনুমতি দিলেন। মদিনায় সর্বপ্রথম হিজরত করেছেন মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)। আবু বকর (রা.) রাসুল (সা.)-এর জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। যাতে তিনি তাঁর সঙ্গে হিজরত করতে পারেন। সাহাবাদের হিজরতের দুই মাস পর মহানবী (সা.) রবিউল আউয়াল মাসের সোমবার হিজরত করেন। হিজরতের সময় মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে আবু বকর ও তাঁর গোলাম আমের ইবনে ফুহাইরা ও পথনির্দেশক আবদুল্লাহ ইবনে আরিকত দুয়ালিও ছিলেন। তিনি বাইয়াতে আকাবার তিন মাস পর ২৭ সফর বৃহস্পতিবার রওনা দেন। তিন দিন ছুর নামক পর্বতে গোপন থাকার পর সোমবার পহেলা রবিউল আউয়াল আবার রওনা দেন। ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার তিনি কুবা নগরীতে পৌঁছেন। ১৪ দিন অবস্থান করার পর তিনি সেখানে মসজিদে কুবা প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর তিনি মদিনায় গমন করেন। (ইব্ন কাছির, আল বিদায়া, খণ্ড-৩, পৃ. ১৮৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় যাওয়ার পর দুর্বল ও অক্ষম ছাড়া মক্কার সব মুসলমানের ওপর হিজরত করা ফরজ ছিল। এটি ছিল তখন ইমানের শর্তস্বরূপ। এর কারণ ছিল প্রথমত, মুসলমানরা যেন ইসলামের নিদর্শন যেমন—জুমা, ঈদ, জামাতে নামাজ, আজান ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, তাঁরা যেন দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করতে পারেন। তৃতীয়ত, তাঁরা যেন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও দ্বীনি দাওয়াত ব্যাপকভাবে বিশ্বে পৌঁছিয়ে দিতে পারেন। অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের পর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের বিধান রহিত হয়ে যায়। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘মক্কা বিজয়ের পর কোনো হিজরত নেই, তবে জিহাদ ও নিয়ত অবশিষ্ট রয়েছে। আর যখন তোমাদের সবাইকে (প্রতিরোধ সংগ্রামে) বের হওয়ার আদেশ দেওয়া হয়, তখন তোমরা বের হবে। ’ (বুখারি, হাদিস : ২৭৮৩)

হিজরতের বিষয়ে ফুকাহায়ে কিরাম বলেন, কাফির রাষ্ট্র থেকে ইসলামের প্রাথমিক যুগে হিজরত করা মুস্তাহাব ছিল। সে নির্দেশ মোতাবেক সাহাবারা আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। পরে মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরত করায় মুসলমানদের জন্য সেখানে হিজরত করা ফরজ ছিল, কিন্তু অষ্টম হিজরিতে সে বিধান রহিত হয়ে যায়। তাই এর পর থেকে হিজরত করা মুস্তাহাব।

অমুসলিম দেশ থেকে মুসলিম দেশে হিজরত : কোনো মুসলমান যদি এমন কোনো অমুসলিম দেশে বসবাস করে, যেখানে ইসলামের প্রকাশ সম্ভব নয়, তাহলে সামর্থ্য থাকলে নারী-পুরুষ সবার জন্য সেখান থেকে হিজরত করা ওয়াজিব। আর এ ধরনের রাষ্ট্রে কোনো মুসলমান নিজ দেশ ত্যাগ করে বসবাস বা চাকরির উদ্দেশ্যে যাওয়া হারাম। শুধু দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার জন্য যেতে পারবে।

আর যে দেশে সে নিজের ইমানের কথা প্রকাশ করতে পারে ও ইসলামের যাবতীয় কাজ আদায় করতে পারে, সেখান থেকে হিজরত করা জরুরি নয়। তবে কোনো মুসলিম দেশে হিজরত করা মুস্তাহাব, সেখানে যাতে মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। মোল্লা আলী কারি (রহ.) লিখেছেন, ‘হিজরত তথা দেশ ত্যাগ করে মদিনা যাওয়া রহিত হয়ে গেছে। তবে জিহাদের জন্য বা ভালো নিয়ত তথা কাফির রাষ্ট্র ত্যাগ করা কিংবা বিদআত থেকে পলায়ন করা অথবা অজ্ঞতা ও ফিতনা থেকে পলায়ন করা বা ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের জন্য হিজরত করার বিধান এখনো আছে। এ বিধান রহিত হয়নি। ’ (মিরকাতুল মাফতিহ, খণ্ড-৪, পৃ. ১৮২)

মুসলিম দেশ থেকে অমুসলিম দেশে হিজরত : নসিহত অর্জনের জন্য বিভিন্ন অমুসলিম দেশ সফর করা মুস্তাহাব। তবে সেখানে বেশি দিন অবস্থান করা যাবে না। পরিদর্শন শেষে দ্রুত চলে আসবে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না? তাহলে দেখত যে তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কিরূপ হয়েছে। শক্তিতে তারা ছিল তাদের চেয়ে প্রবল, তারা জমি চাষ করত, তারা সেটা আবাদ করত তাদের চেয়ে বেশি। তাদের কাছে এসেছিল তাদের রাসুলরা সুস্পষ্ট নিদর্শন নিয়ে। আসলে তাদের প্রতি জুলুম করা আল্লাহর কাজ ছিল না। বরং তারা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করেছিল। ’ (সুরা : রুম, আয়াত : ৯)

♦ অমুসলিমদের দাওয়াত দেওয়ার উদ্দেশ্যে হিজরত করা মুস্তাহাব।

অন্যান্য হিজরত ও সফর

♦ হজ পালনের জন্য নিজ দেশ থেকে হিজরত করা হজের জন্য ফরজ। নফল হজের জন্য নফল।

♦ যদি কোনো এলাকায় বিদআত চলে আর ইমানদার ব্যক্তি তাদের তা থেকে বিরত রাখতে না পারে, তখন সে এলাকা ত্যাগ করে সহিহ আকিদায় বিশ্বাসী নেককারদের এলাকায় হিজরত করা মুস্তাহাব। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘যখন তুমি দেখবে যে লোকেরা আমার আয়াতগুলো দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধান করছে, তখন তুমি তাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাবে, যতক্ষণ না তারা অন্য কোনো প্রসঙ্গে নিমগ্ন হয়। শয়তান যদি তোমাকে এটা ভুলিয়ে দেয়, তবে স্মরণ হওয়ার পর আর এই জালিম লোকদের সঙ্গে তুমি বসবে না। ’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৬৮)

ইবনু কাসিম বলেন, আমি ইমাম মালিককে বলতে শুনেছি, কোনো মুসলিমের জন্য ওই এলাকায় বসবাস করা বৈধ হবে না, যেখানে সালফে সালেহিনদের গালি দেওয়া হয় (তাফসিরে জুহাইলি, খণ্ড-৫, পৃ. ২৩৩)

♦ যে এলাকায় হালাল উপার্জন অসম্ভব, সে এলাকা ত্যাগ করে হালাল উপার্জন করা যায়, এমন এলাকায় হিজরত করা ওয়াজিব।

♦ বর্তমানে অনেক অমুসলিম রাষ্ট্রে মুসলমানদের কষ্ট দেওয়া হচ্ছে, তাদের সামর্থ্য থাকলে কোনো মুসলিম দেশে হিজরত করা ওয়াজিব—যে দেশ তাদের আশ্রয় বা নাগরিকত্ব দেবে।

পরিশেষে বলা যায়, কোনো মুসলমান এমন অমুসলিম দেশে বসবাস করতে পারবে না, যেখানে দ্বীনি কাজ আদায় করা তথা ফরজ আদায় করা সম্ভব নয়। তেমনি কোনো ব্যক্তি বসবাসের জন্য বা দীর্ঘস্থায়ীভাবে সেখানে ভিসা নিয়ে যেতে পারবে না দাওয়াতের নিয়ত ছাড়া। তবে যে অমুসলিম দেশে দ্বীনি কাজ আদায় করা যায়, সেখানে হিজরত করা মাকরুহের সঙ্গে বৈধ। সেখানকার মুসলমানদের কোনো মুসলিম দেশে হিজরত করা মুস্তাহাব। তবে কেউ যদি তাদের দাওয়াত দেওয়ার জন্য যায় বা এমন কোনো প্রশিক্ষণের জন্য যায়, যা দিয়ে মুসলমানরা উপকৃত হবে আর তা কোনো মুসলিম দেশে সম্ভব নয়, তখন সে দেশে হিজরত বৈধ হবে। ব্যবসার খাতিরেও সেখানে যেতে পারবে।

লেখক : লেকচারার, আরবি বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য