kalerkantho


কমে যাচ্ছে ভালোবাসা হারিয়ে যাচ্ছে মানবতা

মাওলানা তাজুল ইসলাম

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



আমাদের জীবন থেকে আদর, সোহাগ, স্নেহ, ভালোবাসা কি কমে যাচ্ছে? মানুষের মানবিক মূল্যবোধ কি দিন দিন কমে যাচ্ছে? এ প্রশ্ন চলমান সমাজে ব্যাপকভাবে উত্থাপিত হচ্ছে। এর প্রধান কারণ ইদানীং ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা। মৃত্যু, অপমৃত্যু ও দুর্ঘটনা বাংলাদেশে এখন ডালভাত। টাম্পাকো কারখানার দুর্ঘটনা ছাড়া এবারের ঈদে প্রায় ২৬৫ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। আনন্দের ঈদ নিহতদের পরিবারে নিয়ে এসেছে বেদনার কান্না। তা ছাড়া বিভিন্ন কারণে খুনাখুনি তো চলছেই। পরিবর্তিত সমাজ-সভ্যতায় সব কিছুর দাম বাড়লেও দিন দিন মানুষের দাম কমে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বজন হত্যা। সম্প্রতি খবরে বলা হয়েছে, নতুন মডেলের মোটরসাইকেল না পেয়ে ফরিদপুর শহরে নিজের মা-বাবার শরীরে আগুন দেয় এক কিশোর। অবশেষে ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাবা মারা যান। আরো জানা গেছে, চট্টগ্রামে সুমিত নামের এক তরুণের বিরুদ্ধে মাকে খুন করার অভিযোগ উঠেছে।

বড় ভাই সোমনাথের দাবি, এইচএসসি পরীক্ষায় খারাপ করায় সুমিতকে বকাঝকা করা হয়। তাই সে মাকে দা দিয়ে কুপিয়ে মেরে নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা করে। একই দিন রাজশাহীতে কাব্য নামের সাত বছরের এক শিশু খুন হয়েছে। তাকে কুপিয়ে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে মায়ের বিরুদ্ধে। ওই মাও নাকি পরে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিলেন। এ ধরনের ঘটনা সারা দেশেই ঘটছে।

বাংলাদেশের মতো একটি মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার জনজীবনের এমন চিত্র শুধু লজ্জাজনকই নয়, রীতিমতো ভয়ংকরও বটে। মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, সহকর্মী ও সর্বজনীন মানবাধিকারের যে গ্যারান্টি ইসলাম দিয়েছে, পৃথিবীর কোনো সংস্থা, সভ্যতা ও সমাজব্যবস্থা তার নজির উপস্থাপন করতে পারেনি। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় মানুষ অর্থের আশায় আর স্বার্থের নেশায় দিগ্ভ্রান্ত হয়ে ছুটছে। ফলে মানুষ ক্রমেই কল্যাণকামিতা ও পরোপকারের পরিবর্তে আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর হয়ে পড়ছে। আর বিসর্জন দিচ্ছে ন্যূনতম ধর্মীয় মূল্যবোধ। ফলে পরম আপনজনও পরিণত হচ্ছে চরম শত্রুতে। তাতে রেহাই পাচ্ছেন না জন্মদাতা মা-বাবাও। ইসলামে নিরপরাধ মানুষ হত্যা মহা অপরাধ। ইসলাম কখনোই হত্যা, নৈরাজ্য সৃষ্টি, সহিংসতা ও সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেয় না। পৃথিবীতে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকে নিষেধ করে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে প্রয়াসী হইয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে পছন্দ করেন না। ’ (সুরা : কাসাস,    আয়াত : ৭৭)

শান্তির ধর্ম ইসলামে সব ধরনের অন্যায় হত্যাকাণ্ড নিষিদ্ধ। বিদায় হজের ভাষণে মহানবী (সা.) বলেন, ‘আজ এই পবিত্র দিনে (বিদায় হজের দিন), পবিত্র মাসে এবং পবিত্র (মক্কা) শহরে তোমাদের জন্য যেমন যুদ্ধবিগ্রহ ও অপকর্ম করা অবৈধ, তেমনিভাবে তোমাদের জান ও মাল বিনষ্ট করাও অবৈধ। ’ (বুখারি,  হাদিস : ১৭৪১)

অন্যদিকে মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, সহকর্মী, সহপাঠীর যে অধিকার ইসলাম দান করেছে, সমাজজীবনে তার যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন ঘটলে পৃথিবী একখণ্ড বেহেশতে পরিণত হতো। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমার কৃতজ্ঞতা আদায় করো এবং তোমার পিতামাতারও কৃতজ্ঞতা আদায় করো। ’ (সুরা : লুকমান, আয়াত : ১২)

এতে জানা যায়, আল্লাহর ইবাদতের পর পিতামাতার আনুগত্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। পিতামাতা অমুসলিম হলেও তাঁদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা অপরিহার্য। এমনকি পিতামাতা সন্তানদের ওপর জুলুম-নির্যাতন করলেও সন্তানের পক্ষে তাঁদের মনে কষ্টদায়ক কোনো কাজ করা হারাম। হজরত আসমা (রা.)-এর একটি ঘটনা হাদিসের কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। হজরত আসমা (রা.) রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেন, ‘আমার জননী মুশরিকা (অমুসলিম)। তিনি আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। আমার করণীয় কী?’ রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমার জননীকে আদর-আপ্যায়ন করো। ’ (বুখারি)

সন্তান নিজের ইচ্ছায় পৃথিবীতে আসে না। মা-বাবার ঐকান্তিক আকাঙ্ক্ষা আর আল্লাহর ইচ্ছা ও হুকুমে সন্তান পৃথিবীতে আসে। সন্তান শুধু মা-বাবার রক্তবিন্দু নিয়েই ভূমিষ্ঠ হয় না, একই সঙ্গে সে তাঁদের মেধা, মনন, রোগব্যাধি, দুর্বলতা, ক্ষীণতা নিয়েই বেড়ে ওঠে। কাজেই সন্তানের জন্য মা-বাবা থেকে আপন আর কেউ হতে পারে না। তা সত্ত্বেও অবাধ স্বাধীনতার এই যুগে মা-বাবার প্রেম-পরকীয়া ও প্রগতিশীলতার বলি হচ্ছে নিষ্পাপ শিশু। প্রশ্ন হলো, সন্তানকে আপন বুকে আগলে রাখার যে বোধটুকু পশুপাখির মধ্যেও বিদ্যমান, আমরা কি সেই বোধটুকুও হারিয়ে ফেলছি?

একটি অন্যায় হত্যাকে কোরআনে বিশ্বমানবতাকে হত্যার সমতুল্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তাই কোথাও কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটতে দেখলে অন্যদের উচিত নির্যাতিত ব্যক্তির সাহায্যার্থে এগিয়ে আসা। আল্লাহ বলেন, ‘আর যে কারো প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন (বিশ্বের) সব মানুষের প্রাণ রক্ষা করল। ’ (সুরা : মাঈদা, আয়াত : ৩২)

এটা স্বাভাবিকভাবেই বলা যায় যে ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-আচরণে যাঁরা অভ্যস্ত, তাঁরা এ ধরনের কাজে জড়িত হতে পারেন না। কোনো অন্যায় হত্যাকাণ্ডেই তাঁদের জড়ানোর কথা নয়। কোনো ধরনের অমানবিক আচরণও তাঁরা করতে পারেন না। সুতরাং আমাদের ধর্মীয় বন্ধন যত দৃঢ় হবে, আত্মীয়তার বন্ধনও ততই সুদৃঢ় ও প্রগাঢ় হবে।

লেখক : ইমাম ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া মসজিদ


মন্তব্য