kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ভোগান্তিই যেন বাংলাদেশের হজযাত্রীদের নিয়তি

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



আমাদের দেশ থেকে প্রতিবছর লাখ লাখ হাজি পবিত্র হজে অংশগ্রহণ করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ থেকে এবার হজে গেছেন এক লাখ এক হাজার ৭৫৮ জন।

হজযাত্রীদের ভোগান্তি, হজ নিয়ে রমরমা ব্যবসা বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। ধর্মীয় আবেগের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে প্রতিবছর এ দেশের লাখো বিত্তশালী পবিত্র হজ পালনে সৌদি আরব গিয়ে থাকেন। এতে যাতায়াত, থাকা-খাওয়া নিয়ে প্রায় প্রতিবছরই তাঁদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। প্রতিবছরই হজযাত্রীরা অনেক আশা ও স্বপ্ন নিয়ে হজে যান। কিন্তু অশ্রুভেজা চোখে তাঁদের ফিরে আসতে হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটাই যেন তাঁদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবারও হজযাত্রীদের ভোগান্তি ও প্রতারণার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে বাংলাদেশ! গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ‘বিমান ও ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর টিকিট বাণিজ্য আর অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে ১০ হাজারেরও বেশি হজযাত্রীর যাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। একের পর এক ফ্লাইট বাতিল ও যাত্রী কম হওয়ায় বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার মন্ত্রীর আশ্বাসের পরও অবস্থার উন্নতি হয়নি। ’ (দৈনিক যুগান্তর, ২১ আগস্ট ২০১৬)

কোনো কোনো প্রতিবেদনে অভিযোগের তীর ফেরানো হয়েছে খোদ সরকারের দিকে। টেলিভেশন চ্যানেল দ্য ইনডিপেনডেন্ট তাদের অনলাইনে লিখেছে, ‘সরকারের পক্ষ থেকে সময়মতো মোয়াল্লেম ফি জমা না দেওয়ায় সৌদি ভিসা পেতে দেরি হচ্ছে অনেক হজযাত্রীর। এখন পর্যন্ত এক লাখ এক হাজার হজযাত্রীর মধ্যে ভিসা পাননি প্রায় ২০ হাজার জন। এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সবাই ভিসা পাবেন বলে আশ্বস্ত করছে সরকার। ’ (২২ আগস্ট ২০১৬)

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ হজ এজেন্সিগুলোর দিকে। অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা নিউজ লিখেছে, ‘হজে পাঠাতে মিটিয়ে নেওয়া হয়েছে আড়াই লাখ টাকা। কিন্তু টাকা হাতে পেয়েই উল্টো সুর হজ এজেন্সিগুলোর। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত প্যাকেজ মূল্যের চেয়ে বেশি অর্থ আদায় করে হজে পাঠানো হচ্ছে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের। শুধু তা-ই নয়, এমনকি কোরবানির খরচটাও গুনতে হবে হজযাত্রীর নিজের পকেট থেকে। ’ (২৫ আগস্ট ২০১৬)

কালের কণ্ঠ লিখেছে, ‘রিপ্লেসমেন্ট জটিলতায় হজযাত্রীদের ফ্লাইট নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছে হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)। তাদের অভিযোগ, রাজধানীর আশকোনা হজ ক্যাম্পের পরিচালক হজযাত্রীদের রিপ্লেসমেন্ট দিতে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির আশ্রয় নিচ্ছেন। তিনি বলেন, রিপ্লেসমেন্ট দিয়ে ডিও লেটার ইস্যুতে দেরি হওয়ায় যাত্রী সংকটে বিমানের ফ্লাইট দেওয়া যাচ্ছে না। একের পর এক ফ্লাইট বাতিলে ক্ষতির মুখে পড়ছেন যাত্রীরা। তাঁদের হজে যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। ’ (১৮ আগস্ট ২০১৬)

এ বছর নতুন করে সৌদি বিমানবন্দরে বাংলাদেশি হজযাত্রীদের ভোগান্তির বিষয়টি যুক্ত হয়েছে। এমন খবরও পাওয়া গেছে যে মিনায় তাঁরা ভ্রমণের জন্য গাড়িও পাননি। শোনা যায়, বাংলাদেশি হজযাত্রীদের জন্য প্রতিবছর সৌদিতে সবচেয়ে খারাপ গাড়িগুলো বরাদ্দ করা হয়। এ বিষয়ে সরকারের একটি মন্ত্রণালয় থাকলেও কার্যত পরিস্থিতির উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। আসলে পরকালের আদর্শবিচ্যুত ভোগবাদী সমাজে সব কিছুকে পণ্যই ভাবা হয়। ভাবা হয় ব্যবসা ও পুঁজি সংগ্রহের মাধ্যম। সেই ধারাবাহিকতায় হজের ব্যবসা এ দেশে খুবই রমরমা। রাতারাতি বড়লোক হওয়ার চরম সুযোগ এটি! বাংলাদেশে সমাজব্যবস্থায় যেখানে সব জায়গায় দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে, সেখানে মন্ত্রণালয়ের কথা না হয় বাদই দিলাম; কিন্তু এই ব্যবসার সঙ্গে তো বেশ কিছু ‘আলেম’ও জড়িত আছেন, তাঁদের কী হবে? সত্যিই চোর কখনো ধর্মের কাহিনী শোনে না। আসলে তাঁদের আলেম হিসেবে না দেখে হজ ব্যবসায়ী হিসেবে দেখাই ভালো। তাঁদের দাড়ি-টুপি হয়তো আছে, হয়তো ধর্মের দু-চারটা বুলিও তাঁরা আওড়াতে পারেন; কিন্তু তাঁদের মধ্যে মূল্যবোধ নেই, আদর্শ নেই, ধর্মের শিক্ষা নেই। তাঁরা এমন প্রদীপ, যার মধ্যে আলো নেই, প্রাণ নেই।

হজযাত্রীদের দুর্ভোগ লাঘব করতে সরকার জাতীয় হজ ও ওমরাহ নীতি ২০১৬ প্রণয়ন করেছে। সরকারের আন্তরিকতা থাকলেও নীতিমালা প্রয়োগে সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতা প্রয়োজন। শত আইন করেও লাভ হবে না, যদি আইন প্রয়োগ না হয়; কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। নীতিমালা প্রণয়নের পাশাপাশি তা বাস্তবায়নে কঠোর ভূমিকা নিলেই হজযাত্রীদের কান্না থামতে পারে।

অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে আরো একটি বিষয় উল্লেখ করতে হয় যে আমাদের দেশ থেকে প্রতিবছর লক্ষাধিক মানুষ হজে গেলেও সেখানে কোনো মিডিয়া টিম পাঠানো হয় না। এটা আমাদের মিডিয়া হাউসগুলোর ইসলামের ব্যাপারে বৈরী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। অথচ হজের বিটের সঙ্গে লাখ লাখ মানুষের অধিকার ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা জড়িত। তবু দু-একটি মিডিয়া ছাড়া কেউ মক্কায় প্রতিনিধি পাঠায় না। প্রসঙ্গক্রমে এ কথা উল্লেখ করতে হয় যে অলিম্পিক, ফুটবল, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন খেলা কাভারেজের জন্য মিডিয়া হাউসগুলো প্রতিবছরই প্রতিনিধি পাঠায়। অথচ সেগুলোতে বাংলাদেশের হাতে গোনা কয়েকজন প্রতিনিধি থাকে। সংখ্যার কথা বাদ দিলেও ঐতিহ্যগতভাবে হজের সঙ্গে তুলনীয় কোনো ইভেন্ট নেই। পৃথিবীর সূচনা থেকেই হজ প্রচলিত। তাই হজের ব্যাপারে অনীহা মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশের মানুষের জন্য চরম লজ্জাজনক।

সরকারের কাছে আমাদের জোর দাবি, লাখো মুসলমানের ধর্মীয় আবেগজড়িত এই হজের কার্যক্রমে আরো গতিশীল কর্মপন্থা আবিষ্কার করা হোক। প্রয়োজনে হজ ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানো হোক।

লেখক : শিক্ষক, মাদ্রাসাতুল মদিনা নবাবপুর, ঢাকা


মন্তব্য