kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


গরিবের হক মেরে চামড়া ব্যবসায়ীদের মুনাফা

আল আমিন আশরাফি

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



গরিবের হক মেরে চামড়া ব্যবসায়ীদের মুনাফা

ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। কোরবানি শব্দটি আরবি অথবা ফারসি ভাষা থেকে আগত।

এর অর্থ ত্যাগ ও নৈকট্য। মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টি ও মানবকল্যাণে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করাই মূলত ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। কোরবানি মুসলিম উম্মাহর একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। যাঁদের ওপর জাকাত ওয়াজিব, তাঁদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য স্বার্থত্যাগ, আত্মত্যাগ ও সম্পদত্যাগই হলো কোরবানি। কোরবানি শুধু একটি আনন্দ উৎসব নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা ও দর্শন। ঈদুল আজহা আত্মত্যাগের  প্রেরণায় উজ্জীবিত এক অনন্য আনন্দ উৎসব। যে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণ মূর্ত হয় মানুষের জীবনে, তার জন্য চরম ত্যাগ স্বীকারের এক প্রতীকী আচার এই কোরবানি। ঈদুল আজহার প্রকৃত উদ্দেশ্য নিজের অহমিকা ও উচ্চাভিলাষ উৎসর্গ করা। পশু কোরবানির মধ্য দিয়ে মানুষের ভেতরে থাকা পশুশক্তি, কাম-ক্রোধ, লোভ ইত্যাদি রিপুকে ত্যাগ করতে হয়। কোরবানিদাতা শুধু পশুর গলায় ছুরি চালায় না, সে তার সব কুপ্রবৃত্তির ওপর ছুরি চালিয়ে তাকে নির্মূল করে। এটাই হলো কোরবানির মূল শিক্ষা। কোরবানির রক্ত-গোশত-চামড়া কোনোটিই আল্লাহর কাছে পৌঁছে না। পৌঁছে কেবল তাকওয়া বা খোদাভীতি। কোরআনে এসেছে : ‘আল্লাহর কাছে কখনোই পশুর রক্ত ও মাংস পৌঁছে না। বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া বা খোদাভীতি। ’    (সুরা : হজ, আয়াত : ৩৭)

কোরবানির মাধ্যমে মুসলমানদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে মেহমানদারি হয়। তাই এর কোনো অংশ বিক্রি করা জায়েজ নয়। কোরবানি একটি ইবাদত। তাই কোরবানি-সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে শরিয়তের বিধান উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কোরবানির পশুর গোশত ও চামড়া কোরবানিরই অংশ। এ বিষয়ে শরিয়তের বিধান হলো—এক. কোরবানির পশুর কোনো অংশ, যেমন—গোশত, চর্বি, হাড্ডি ইত্যাদি বিক্রি করা জায়েজ নয়। বিক্রি করলে পূর্ণ মূল্য সদকা করে দিতে হবে।   (বাদায়েউস সানায়ে : ৫/৮১)

দুই. পশুর চামড়া কোরবানিদাতা নিজেও ব্যবহার করতে পারবে। তবে কেউ যদি নিজে ব্যবহার না করে বিক্রি করে, তাহলে বিক্রয়লব্ধ মূল্য সদকা করে দিতে হবে। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ৫/৩০১)

তিন. কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করলে মূল্য সদকা করে দেওয়ার নিয়তে বিক্রি করবে। বিক্রয়লব্ধ অর্থ পুরোটাই জাকাতের উপযুক্ত ব্যক্তিকে সদকা করে মালিক বানিয়ে দেওয়া জরুরি। তা মাদ্রাসা-মসজিদ ইত্যাদি নির্মাণে খরচ করা জায়েজ নয়। তবে তা লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের জন্য দেওয়া যাবে। (ফাতাওয়া কাজিখান : ৩/৩৫৪)

চার. কোরবানির চামড়া গরিবের হক। গরিব লোকদের না দিয়ে কোরবানির চামড়ার মূল্য দিয়ে ইমাম, খতিব, মুয়াজ্জিন, শিক্ষক ও কর্মচারীর বেতন দেওয়া নাজায়েজ। (শামি : ২/৩৩৯)

কিন্তু আশ্চর্য হলো, গরিবের হক মেরে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চামড়া ব্যবসায়ীরা এবার মুনাফাখোরির যে মহড়া দেখিয়েছে, তাতে গোটা বিশ্বে বাঙালি মুসলমানের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।

সারা দেশে চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কোরবানিদাতা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। কোরবানিদাতারা পশুর চামড়া বিক্রির টাকা এলাকার এতিমখানা, লিল্লাহ বোর্ডিংসহ গরিব-দুঃখী মানুষের মধ্যে বিতরণ করেন। কেউ কেউ মসজিদ-মাদ্রাসা ও কবরস্থানের জন্যও দান করেন। এবার চামড়ার দাম কমে যাওয়ায় দুস্থ-অসহায়দের ভাগে টাকা কম পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চার বছর ধরেই কোরবানির পশুর চামড়ার দর আগের বছরের তুলনায় কমিয়ে নির্ধারণ করছেন এই খাতের ব্যবসায়ীরা। এবার ট্যানারি ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমিয়ে দিয়েছেন। ২০১৩ সালে প্রতি বর্গফুট গরুর কাঁচা চামড়ার দর নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮৫ থেকে ৯০ টাকা। পরের বছর তা কমিয়ে ধরা হয় ৭০ থেকে ৭৫ টাকা। ২০১৫ সালে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দর আরো কমিয়ে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। আর এ বছর গত ৯ সেপ্টেম্বর ব্যবসায়ীরা ঘোষণা করেছিলেন, ঢাকায় কোরবানির গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম ধরা হয়েছে প্রতি বর্গফুট সর্বোচ্চ ৫০ টাকা, ঢাকার বাইরে তাঁরা ৪০ টাকা দরে কিনবেন। আর সারা দেশে লবণযুক্ত খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২০ টাকা ও বকরির চামড়া ১৫ টাকায় কিনবেন। তবে বাস্তবে তাঁরা দাম হাঁকছেন আরো অনেক কম। ফলে কোরবানিদাতার কাছ থেকে ক্ষুদ্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এবার বেশ কম দামে চামড়া কিনেছেন। ঈদের দিন বিকেল থেকে সেই চামড়া নিয়ে আড়তদারদের কাছে গিয়ে হতাশ হয়েছেন সারা দেশের লাখো ক্ষুদ্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ী। কারণ মুনাফা দূরের কথা, যে দরে চামড়া কিনেছেন, তার চেয়েও অনেক কম দাম না হলে কিনছেন না আড়তদাররা। দেশের কোনো কোনো স্থানে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া বিক্রি করে রিকশা-ভ্যানের ভাড়া জোগাড় করতে পেরেছেন মাত্র।

নওগাঁয় ৪০ হাজার টাকা দামের একটি গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ৬০০ টাকায়। কোনো কোনো স্থানে আরো কম দামে বিক্রি হয়েছে। যেসব ব্যবসায়ী সামান্য দর বাড়িয়ে চামড়া কিনেছেন, বিপুল অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে তাঁদের। জয়পুরহাট সদর উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের মৌসুমি ব্যবসায়ী এমরান হোসেন জানান, ৩৮টি গরুর চামড়া কিনে ১৭ হাজার টাকা লোকসান দিতে হয়েছে তাঁকে। (কালের কণ্ঠ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬)

গার্মেন্টের পর আমাদের অর্থনীতিতে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত চামড়াশিল্প। চামড়া, জুতা ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি আয় করছে বাংলাদেশ। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী শুধু জুতার চাহিদা ছয় হাজার কোটি ডলারেরও বেশি। এর মধ্যে এককভাবে ৭৫ শতাংশ বাজার চীনের দখলে। আমাদের রপ্তানি তৃতীয়। বাংলাদেশ গত অর্থবছরে ১১৬ কোটি ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করেছে। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা ১১ কোটি ডলার হলেও রপ্তানি হয়েছে ৯ কোটি ডলারের পণ্য।

চলতি অর্থবছরে ১২২ কোটি ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

ঈদের আগেই ঢাকা ও সারা দেশের জন্য আলাদা দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোথাও সেই দর মেনে চামড়া বেচাকেনা হয়নি। এবার প্রচুর পশু কোরবানি হয়েছে। খুচরা বাজারে চামড়ার সরবরাহ ছিল আগের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু ট্যানারি মালিক, আড়তদার, চামড়া রপ্তানিকারক ও লবণ ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট এবার চামড়ার দাম নিয়ে কারসাজি শুরু করায় কাঁচা চামড়া নিয়ে খুচরা ব্যবসায়ীদের বিপাকে পড়তে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণে বিক্রেতাদের অনেকেই গত বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ কম দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। অন্যদিকে লবণের সংকট সৃষ্টি করে কম দামে চামড়া বিক্রিতে ব্যবসায়ীদের বাধ্য করা হয়েছে। বাংলাদেশ ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছর চামড়া সংগ্রহের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৭০ লাখ, যেখানে গত বছর চামড়া সংগৃহীত হয়েছিল প্রায় ৬০ লাখ। ২০১০ সালে ৪৫ লাখ। পরের বছর এই সংখ্যা ৫০ লাখ ছাড়িয়ে যায়।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে চামড়াশিল্পের অবদান কম নয়। বর্তমানে রপ্তানি খাতে চামড়ার অবদান ৯ শতাংশেরও বেশি। ১৯৯০-এর দশক থেকে এ পর্যন্ত রপ্তানি আয় ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। ১৯৯০ সালে এই শিল্পে বার্ষিক গড় রপ্তানি আয় ছিল ২২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৯-১০ অর্থবছরে চামড়া রপ্তানি থেকে আয় হয় ২২৬ মিলিয়ন ডলার এবং চামড়াজাত পণ্য থেকে রপ্তানি আয় হয় ২৯ মিলিয়ন ডলার। ২০১০-১১ অর্থবছরে চামড়া রপ্তানি থেকে আয় হয় ২৯৭ মিলিয়ন ডলার এবং চামড়াজাত পণ্য থেকে আয় হয় ৫৫ মিলিয়ন ডলার। ২০১১-১২ অর্থবছরে এই খাতে মোট রপ্তানি আয় দাঁড়ায় ৭৬৫ মিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া ২০১২-১৫ রপ্তানিনীতিতে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতের তালিকায় রাখা হয়েছে।

কোরবানির চামড়া আমাদের দেশের সম্পদ। সম্ভাবনাময় চামড়াশিল্পের দ্রুত বিকাশের স্বার্থে কোরবানির চামড়া নিয়ে অসাধু বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। দেশে চামড়ার দাম না পেলে চোরাপথে এই চামড়া পাচার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি থাকে। এতে ক্ষতি দেশেরই। সবচেয়ে বড় কথা, কোরবানির পশুর চামড়া গরিবের হক। এর অর্থ মেরে খেয়ে বিত্তবিলাস করা শুধু নৈতিক অপরাধই নয়, সমাজ ও ধর্মের দিক থেকেও গর্হিত অপরাধ। এসব অসাধু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

 

লেখক : ইতিহাস গবেষক

 


মন্তব্য