kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শিক্ষা দিবস

কোরআনের প্রথম নির্দেশ ‘পড়ো’

আল আমিন আশরাফি

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



১৭ সেপ্টেম্বর মহান শিক্ষা দিবস। শিক্ষার ওপর ভিত্তি করেই রচিত হয় জাতিসত্তা।

কোনো জাতির সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক উন্নতি ও সমৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হলো শিক্ষা। জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ, জাতীয় আদর্শের ভিত্তিতে চরিত্র গঠন, জীবনের সব ক্ষেত্রে নেতৃত্বদানের উপযোগী ব্যক্তিত্ব তৈরি করা কেবল উপযুক্ত শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমেই সম্ভব। জাতীয় ঐক্য ও সংহতির প্রধান উপকরণও শিক্ষা।

মহানবী (সা.) মাত্র ২৩ বছরের মধ্যে জাহেলিয়াতের প্রগাঢ় অন্ধকারে নিমজ্জিত ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন জাতিকে একটি বিশ্ব বিজয়ী জাতিতে পরিণত করতে সক্ষম হন তাঁর মহান শিক্ষার মাধ্যমে। হজরত উমর (রা.) ও হজরত উসমান ইবনে আফ্ফান (রা.) তাঁদের শাসনামলে এই খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তাঁরা শিক্ষক ও ধর্মপ্রচারকদের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করেছিলেন। যেমন—হজরত ইবনুল জাউজি (রহ.) তাঁর গ্রন্থ ‘সিরাতুল উমরাইনে’র মধ্যে উল্লেখ করেন, হজরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা.), হজরত উসমান ইবনে আফ্ফান (রা.)-এর যুগে মুয়াজ্জিন, ইমাম ও শিক্ষকদের সরকারি ভাতা দেওয়া হতো। (সূত্র : কিতাবুল আমওয়াল, পৃষ্ঠা : ১৬৫)

পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষী, ইসলামই সর্বপ্রথম মূর্খতা, নিরক্ষরতা ও অজ্ঞতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। বরং সব অধিকার ও কর্তব্য ছাপিয়ে ইসলাম শিক্ষাকে সর্বপ্রধান ও সর্বপ্রথম কর্তব্য ও অধিকার বলে ঘোষণা করেছে। বিশ্বমানবতার মুক্তির উদ্দেশ্যে উচ্চারিত ইসলাম ধর্মের প্রথম আহ্বান : ‘পড়ো, তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে রক্তপিণ্ড থেকে। পড়ো, তোমার প্রতিপালক মহিমান্বিত; যিনি কলমের সাহায্যে জ্ঞান দান করেছেন। মানুষকে শিখিয়েছেন, যা সে জানত না। ’ (সুরা : আলাক, আয়াত : ১-৫)

মানুষের ওপর আল্লাহর যত নিয়ামত ও অনুগ্রহ রয়েছে, শিক্ষার নিয়ামতকে কোরআনে সবার ওপরে স্থান দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘দয়াময় আল্লাহ, তিনিই শিক্ষা দিয়েছেন কোরআন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে। তিনিই তাকে শিখিয়েছেন ভাব প্রকাশ করতে। ’ (সুরা : আর-রহমান, আয়াত : ১-৪)

এখানে মানব সৃষ্টির বিষয়টির ওপরে শিক্ষাকে স্থান দেওয়া হয়েছে। পুরো সৃষ্টিজগৎ, এমনকি ফেরেশতাদেরও পেছনে ফেলে মানুষ যে মর্যাদার সর্বোচ্চ শিখরে সমাসীন হয়েছে, তার মূলেও রয়েছে শিক্ষা। ফেরেশতাদের ওপর আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব এরই মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তিনি আদমকে বস্তুজগতের যাবতীয় জ্ঞান শিক্ষা দিলেন। ’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৩১)

পড়া আর লেখার সমন্বয়ই শিক্ষা। আর লিখতে হলে দরকার কলমের। তাই কলমের গুরুত্ব অনুধাবনের জন্য পবিত্র কোরআনের একটি সুরার নামকরণ করা হয়েছে ‘আল কলম’। লিখিত ও গ্রন্থিত বস্তুকেই বলা হয় বই বা গ্রন্থ। আর আল্লাহ কোরআনের নাম রেখেছেন ‘আল কিতাব’ করে, যার অর্থ গ্রন্থ বা বই। বলা হয়েছে, ‘এটা সেই কিতাব (বা গ্রন্থ), যাতে কোনো সন্দেহ নেই, আল্লাহভীরুদের জন্য এটি পথনির্দেশ। ’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২)

শিক্ষার জন্য প্রয়োজন শিক্ষকের। তাই আল্লাহ মানুষকে শেখানোর জন্য শিক্ষকও পাঠিয়েছেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। ’ (দারেমি) আর মহান শিক্ষক মহানবী (সা.) এসে ঘোষণা করলেন, ‘প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। ’ (ইবনে মাজাহ)

ইসলামের সূচনা থেকেই মহানবী (সা.) মানবজাতির মহান শিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তিনি ইসলামী শিক্ষার নিয়মনীতি প্রবর্তন করেন। নবুয়ত লাভের পর কাবা শরিফকে তিনিই সর্বপ্রথম শিক্ষায়তন হিসেবে ব্যবহার করেন। পরে তিনি মক্কা নগরীর সাফা পাহাড়ের পাদদেশে আরকাম বিন আবুল আরকামের বাড়িতে ‘দারুল আরকাম’ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। মহানবী (সা.) নিজেই এখানে হজরত আবু বকর (রা.), উমর (রা.), উসমান (রা.), আলী (রা.)সহ নবদীক্ষিত শিষ্যদের ইসলামের বিধিবিধান শিক্ষা দিতেন। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে হিজরতের পর মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ইসলামী শিক্ষার ব্যাপক প্রচার ও প্রসার শুরু হয়। মদিনায় শিক্ষার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকে। নবী করিম (সা.)-এর জীবদ্দশায়ই মদিনা এবং তত্সংলগ্ন এলাকায় ৯টি মসজিদ তৈরি হয়। এসব মসজিদে নামাজ আদায়ের পাশাপাশি ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হতো।

শিক্ষা বিষয়ে বর্ণিত ইসলামের বাণীগুলো বুকে ধারণ করেই যুগে যুগে মুসলমানরা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জানান দিয়েছে। গোটা পৃথিবী শাসন করেছে। আজকের পৃথিবীতে মুসলমানদের অনগ্রসরতা ও পশ্চাৎপদতা থেকে উত্তরণেও শিক্ষার বিকল্প নেই।

লেখক : ইতিহাস গবেষক


মন্তব্য