kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কোরবানির আবর্জনা পরিষ্কার কোরবানিদাতার দায়িত্ব

মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ইসলাম বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি দিয়েছে পবিত্রতার বিস্তারিত বিধিবিধান। ইসলামে যে পরিচ্ছন্নতার ধারণা দেওয়া হয়েছে, তা স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অত্যন্ত উঁচুমানের।

রাসুল (সা.) পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকে ইমানের অঙ্গ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘পবিত্রতা ইমানের অঙ্গ। ’ (মুসলিম, হাদিস : ২২৩)

 

রাসুল (সা.) আরো ইরশাদ করেন, ‘ইমানের ৭০টিরও বেশি শাখা রয়েছে, তন্মধ্যে ন্যূনতম একটি শাখা হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা। ’ (মুসলিম, হাদিস : ৩৫)

উল্লিখিত হাদিসের আলোকে বোঝা যায়, যদি অন্য কেউ আবর্জনা করে যায় এবং তার দ্বারা মানুষের কষ্টের আশঙ্কা থাকে, তাহলে নিজেই ওই জিনিস পরিষ্কার করে দেবে। যদি আবর্জনা পরিষ্কার করা ইমানের শাখা হয়, তবে আবর্জনা সৃষ্টি করা কিসের শাখা? তা সবার কাছেই পরিষ্কার যে এটি বেইমানি বা কুফরের শাখা।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে দূষণমুক্ত করো ও পবিত্র রাখো। ’ তিনি আরো বলেন, ‘আল্লাহ পবিত্র, তাই তিনি পবিত্রতা ভালোবাসেন। তিনি পরিচ্ছন্ন, তাই পরিচ্ছন্নতা ভালোবাসেন। তিনি সম্মানিত ও সম্মানিতকে ভালোবাসেন। তাই তোমরা তোমাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে পরিষ্কার ও পবিত্র রাখো। ’

ইসলামে ‘তাহারাত’ যেমন উদ্দেশ্য, তেমনি ‘নাজাফাত’ও। তাহারাত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, মানুষ নিজে পবিত্র থাকবে আর নাজাফাত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সে নিজের আবর্জনার দ্বারা অন্যকে কষ্ট দেবে না।

রাসুল (সা.)-এর যুগে মসজিদে নববীর জায়গার সংকুলান খুব একটা ছিল না। সাহাবারাও বেশির ভাগ ছিলেন পেশাজীবী। তাঁরা মোটা কাপড় পরিধান করতেন। জুমার দিন লোকসমাগমে ঘামের দুর্গন্ধ হওয়ার প্রবল আশঙ্কা ছিল। তাই রাসুল (সা.) সাহাবায়ে কেরামদের জুমার দিনে  গোসল ও সাধ্যানুযায়ী পরিষ্কার কাপড় পরিধান করে আতর-খুশবু মেখে মসজিদে আসার তাগিদ দিয়েছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে মুসলমানরা খুবই উদাসীন। বিষয়টি বিশেষভাবে দেখা যায় কোরবানির ঈদের সময়। এ দেশের মুসলমানদের মধ্যে কোরবানি করার ব্যাপারে ব্যাপক আগ্রহ থাকলেও অনেকে কোরবানির বর্জ্য অপসারণের ক্ষেত্রে খুবই অবহেলা করেন। এতে পরিবেশ নষ্ট হয়। অন্যের কষ্ট হয়। অথচ মুসলমানকে কষ্ট দেওয়া ইসলামে হারাম। কোরবানি দেওয়া মহানবী (সা.)-এর সুন্নত। এটা আদায় করতে গিয়ে হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া কিছুতেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। স্মরণ রাখতে হবে, নিজ নিজ কোরবানির স্থান পরিষ্কার করার দায়িত্ব কোরবানিদাতারই।

কোরবানির পশু আল্লাহর নিদর্শন। কোরবানিদাতা কোরবানির মাধ্যমে এ অনুভূতি প্রকাশ করে যে কোরবানির পশুর রক্ত তার নিজের রক্তেরই স্থলাভিষিক্ত। সে এ আবেগও প্রকাশ করে যে তার জীবনও আল্লাহর জন্য এভাবে কোরবানি করতে প্রস্তুত, যেভাবে সে এ পশু কোরবানি করছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আর কোরবানির উটগুলো আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন বানিয়ে দিয়েছি। ’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৩৬)

আমরা মনে করি, কোরবানির বর্জ্য অপসারণ না করা আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি অশ্রদ্ধা জ্ঞাপনের শামিল। কেননা এতে মানুষের মনে কোরবানির প্রতি বৈরী মনোভাব তৈরি হয়।

কোরবানি করা হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর নৈকট্যলাভের উদ্দেশ্যে। আল্লাহ বলেন, ‘বলে দাও, আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ—সব কিছু বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। ’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৬২)

আর এটাও স্পষ্ট যে মানুষকে কষ্ট দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায় না।

কোরবানিদাতা শুধু পশুর গলায় ছুরি চালায় না; সে তার সব কুপ্রবৃত্তির ওপর ছুরি চালিয়ে তাকে নির্মূল করে। এ অনুভূতি ছাড়া কোরবানি করলে তা হবে শুধু গোশত খাওয়ার ‘কোরবানি’। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর কাছে পশুর রক্ত-মাংস পৌঁছে না; পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া। ’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৩৭)

আর তাকওয়ার মর্মকথা হলো আল্লাহর নিষিদ্ধ বস্তু থেকে বেঁচে থাকা। আমাদের উচিত, কোরবানির আবর্জনা পরিষ্কার করে একটি বড় ধরনের গুনাহ ও আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকা।

পরিবেশ সংরক্ষণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্জন মুসলমানদের ইমান-আকিদার সঙ্গে জড়িত। তাই দুনিয়ার স্বার্থে ও ইমানি তাগিদে পরিবেশ সুস্থ রাখার জন্য আমাদের এগিয়ে আসতে হবে।

 

লেখক : ইসলামী গবেষক


মন্তব্য