kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


দেশে দেশে ঈদুল আজহা ও কোরবানি

যুবায়ের আহমাদ

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



পৃথিবীর শুরু থেকেই কোরবানি পুণ্যময় কাজ হিসেবে অভিহিত হয়ে আসছে। কোরবানি মুসলিম উম্মাহর পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নত।

তাঁর আমল থেকে আজও পৃথিবীজুড়ে কোরবানি ওয়াজিব হিসেবে আদায় করা হয়। অন্য সব কিছুর মতো স্থানীয় পরিবেশ-পরিস্থিতির আলোকে কোরবানিতেও বেশ বৈচিত্র্য দেখা যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এর রয়েছে বিভিন্ন নাম। একেক দেশে একেক পশুর প্রাধান্য। পশু সংগ্রহের পদ্ধতিতেও রয়েছে ভিন্নতা। কোরবানির ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশের স্বকীয়তা থাকলেও মুসলিম দেশগুলোতে এর পদ্ধতি প্রায় অভিন্ন। মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে ঈদের নামাজের পরপরই অর্থনৈতিকভাবে সামর্থ্যবানরা তাঁদের কোরবানির পশু নিয়ে খোলা মাঠ, রাস্তা কিংবা নির্দিষ্ট স্থানে চলে যান। সেখানেই তাঁরা কোরবানি করেন। মুসলিম দেশগুলোতে ব্যাপকভাবে আদায় হওয়ার পাশাপাশি পদ্ধতিগত ভিন্নতা ও সীমাবদ্ধতা থাকলেও ইদানীং অমুসলিম প্রধান দেশগুলোতেও কোরবানির চর্চা বাড়ছে ব্যাপকভাবে। নিম্নে কয়েকটি মুসলিম ও অমুসলিম প্রধান দেশের ঈদুল আজহা ও কোরবানির পদ্ধতি তুলে ধরা হলো।

ইন্দোনেশিয়া : আয়তনে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ায় কোরবানি আদায় করা হয় সামাজিকভাবে। সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা হাট থেকে কোরবানির পশু কিনে মসজিদে দিয়ে আসেন। ৮-১০টি পশু এসে যায় কোনো কোনো মসজিদে। মসজিদ এলাকায় কতগুলো পরিবার আছে, তার হিসাব ইমামের কাছে থাকে। সবাই মিলে কোরবানির পর যতগুলো ঘর আছে, গোশত তত ভাগে ভাগ করে ছোট প্যাকেটে সবার ঘরে দিয়ে আসা হয়। তবে যাদের আর্থিক অবস্থা ভালো, তারা তা না নিয়ে গরিবদের দিয়ে দেন।

মালয়েশিয়া : মালয়েশিয়ায়ও সমাজবদ্ধভাবেই কোরবানি করা পছন্দ। স্থানীয় মসজিদে কোরবানি করে গোশতও একসঙ্গেই বণ্টন করা হয়। ইদানীং মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় ‘বিলাসী’ কোরবানির হাট গড়ে উঠেছে। ল্যাপটপ ও ট্যাব হাতে সেলসম্যানের উপস্থিতিতে হাটগুলোতে দেখা যায় ভিন্নমাত্রা। এগুলো হাট না বলে কোরবানির পশুর শোরুমই বলা হয়। দামি দামি গাড়িতে করে ধনী ক্রেতারা ওই সব শোরুমে ভিড় জমান। চড়া দামে কেনেন পশু।

অমুসলিম প্রধান দেশগুলোতেও ক্রমেই কোরবানির হার বাড়ছে। তবে বেশির ভাগ অমুসলিম দেশেই কোরবানি করতে হয় নির্দিষ্ট স্থানে। এখানে কয়েকটি দেশের কোরবানির পদ্ধতি উল্লেখ করা হলো—

যুক্তরাজ্য : ব্রিটেনে ইসলামী উৎসবগুলো অনেকটা অনাড়ম্বরপূর্ণভাবেই পালিত হতো। যুক্তরাজ্যে ব্যাপকভাবে মুসলমানের সংখ্য বাড়ায় এখন প্রতিটি মসজিদে তিন থেকে চারটি ঈদের জামাত হয়। কয়েক বছর ধরে লন্ডনের খোলা পার্কে ঈদের জামাত চালু হওয়ায় বাড়তি আমেজ যোগ হয়েছে। পূর্ব লন্ডনে স্টেপনিগ্রিন পার্ক ও ইফোর্ডে ভ্যালেন্টাইনস পার্কে খোলা আকাশের নিচে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ফলে অনেকটা মুসলিম দেশগুলোর মতোই ঈদ উপভোগ করেন সেখানকার মুসলমানরা। ঈদের জামাত শেষে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোরবানি আদায় করেন সেখানকার মুসলমানরা। ঈদের এক মাস আগে থেকে কোরবানির মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ‘এখানে কোরবানির অর্ডার নেওয়া হয়’ লিখিত সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়। কোরবানিদাতারা এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে নাম লিখিয়ে কোরবানির পশুর দাম দিয়ে আসেন। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট স্থানে কোরবানি করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র : একসময় যুক্তরাষ্ট্রে ঈদ অথবা কোরবানির তেমন গুরুত্ব ছিল না। কিন্তু মুসলমানদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকায় বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের চিত্র ভিন্ন। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে শতাধিক খোলা মাঠে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সবচেয়ে বড় ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয় জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারে। নিউ ইয়র্ক সিটিতেই ২৫২টি মসজিদ রয়েছে। সবগুলোতেই ঈদের জামাত হয়। ঈদের জামাতের পর শুরু হয় কোরবানি। নির্দিষ্ট গ্রোসারিতে অথবা পশুর খামারেই সাধারণত কোরবানি করেন সেখানকার মুসলমানরা। গ্রোসারিতে কোরবানি করলে কোরবানিদাতার নাম, পিতার নাম আর অর্থ দিয়ে আসতে হয়। তারাই কোরবানি করে গোশত প্যাকেটে করে রেখে দেন। গ্রোসারিতে খোলা ময়দানে নিজ হাতে কোরবানির আমেজ পাওয়া যায় না বলে অনেকে ঈদ জামাত শেষে কোরবানি করার জন্য পশুর খামারে চলে যান। সেখান থেকে পছন্দমতো পশু কিনে তা খোলা আকাশের নিচে নিজ হাতে কোরবানি দেন। খামারে ইসলামী পদ্ধতিতে জবাই করে দেওয়ার জন্যও লোক থাকে। খামার ও গ্রোসারি ছাড়াও বিভিন্ন শহরে খোলা ময়দানে কোরবানির অনুমতি দেওয়া হয়। নিউ জার্সি, মেরিল্যান্ড, মিশিগানসহ কিছু কিছু এলাকায় খোলা ময়দানে কোরবানির সুযোগ থাকে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকে সেসব এলাকায় কোরবানি করেন।

রাশিয়া : রুশ ভাষায় ঈদুল আজহাকে বলা হয় ‘কুরবান বাইরাম’। আয়তনে পৃথিবীর বৃহত্তম এ দেশের মোট জনসংখ্যা কমলেও ব্যাপকভাবে বাড়ছে মুসলমানের সংখ্যা। মোট দুই কোটি মুসলমানের ২০ লাখই বাস করেন মস্কোতে। রাজধানী মস্কোতে ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালিত হয় ঈদুল আজহা। গেল বছর নগর কর্তৃপক্ষ দুটি পার্কে ঈদের জামাত আয়োজন করায় খোলা ময়দানের জামাতের আমেজ এসেছে মস্কোতেও। মস্কোর ৩৯টি মসজিদে ব্যবস্থা করা হয় ঈদ জামাতের। তা ছাড়া মুসলিম অধ্যুষিত তিনটি প্রদেশে ঈদ উপলক্ষে এক দিনের সরকারি ছুটি থাকে। কয়েক লাখ মুসলমান সেখানে ঈদুল আজহার জামাত আদায় করেন। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টিভি ‘চ্যানেল রাশিয়া’ এর সরাসরি সম্প্রচার করে। কোরবানির জন্য অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে আগেই বুকিং দিয়ে রাখতে হয়। ঈদের জামাতের পর রাশিয়ার মুসলমানরা কোরবানির জন্য নগরের বাইরের নির্দিষ্ট স্থান অথবা খামারে গিয়ে কোরবানি করেন।

চীন : চীনের মুসলমানদের কাছে ঈদুল আজহা ‘ঈদ আল গুরবান’ বা ‘ঈদ আল কুরবান’ নামে পরিচিত। এ উপলক্ষে বাসাবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়। মসজিদগুলো পূর্ণ হয়ে এর সংলগ্ন মাঠ বা খোলা জায়গাগুলোও লোকারণ্য হয়ে যায়। ঈদের জামাত শেষে বাড়িতে বাড়িতে ভেড়া, উট বা গরু কোরবানি করেন চীনা মুসলমানরা। চীনারা সাধারণত কোরবানির গোশতকে তিন ভাগে ভাগ করে এর এক ভাগ নিজেদের জন্য রেখে বাকি দুই ভাগই আত্মীয়স্বজন ও গরিবদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। মসজিদকেন্দ্রিকও কোরবানি করা হয় কোথাও কোথাও।

সিঙ্গাপুর : সিঙ্গাপুরের মোট জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ মুসলমান। প্রত্যেক এলাকায়ই কিছু কিছু মুসলমানের বাস রয়েছে। মুসলমানদের আলাদা এলাকাও রয়েছে। সেখানে কোরবানির প্রায় তিন মাস আগে কোরবানির পশুর জন্য নিকটতম কোনো মসজিদের মাধ্যমে দরখাস্ত করতে হয়। সরকার অস্ট্রেলিয়া থেকে পশু এনে সেই মসজিদে হস্তান্তর করে। কোরবানিদাতা মসজিদের কাছে কোরবানি করে এর গোশতের কিছু অংশ নিজের জন্য নিয়ে আসেন আর বাকিটা অন্যান্য মুসলমানের জন্য মসজিদে রেখে আসেন। মসজিদ থেকেই কোরবানির গোশত গরিবসহ অন্যান্য মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।

জার্মানি : প্রায় ছয় লাখ আট হাজার মুসলিম নাগরিক রয়েছে জার্মানিতে। তাদের বেশির ভাগই বার্লিন, কোলন, ফ্রাংকফুর্ট, স্টুটগার্ট এলাকার বাসিন্দা। এ ছাড়া আরো কয়েক লাখ মুসলমানের বাস জার্মানিতে। জার্মানির দুই হাজার মসজিদে ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কোনো বাড়িতে কোরবানির সুযোগ নেই। কোরবানির জন্য বিশেষ জায়গা রয়েছে। সেখানে আগে থেকেই অর্ডার নেওয়া হয়।

কানাডা : কানাডায় কোরবানি দেওয়ার জন্য হাটে গরু কেনা হয় না। গরুর হাটও বসে না। সরাসরি পশুর খামারে গিয়ে কোরবানির পশু পছন্দ করা হয়। তারপর তা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বা নির্দিষ্ট স্থানে কোরবানি করা হয়। বিভিন্ন দেশে কোরবানি আদায়ের পদ্ধতি যেমনই হোক, আত্মত্যাগের চেষ্টা ও চর্চাই উদ্দেশ্য সবার। তাকওয়া অর্জন, আত্মত্যাগ ও পশুত্বের কোরবানির মাধ্যমে সবাই আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে চায়।

 

লেখক : খতিব, বাইতুশ শফীক মসজিদ, বোর্ড বাজার (আ. গনি রোড), গাজীপুর


মন্তব্য