kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


গ্রিসে ইসলাম ও মুসলমান

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ইউরোপ মহাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অংশের একটি রাষ্ট্র গ্রিস, যা বলকান উপদ্বীপের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত। এর উত্তরে বুলগেরিয়া, সাবেক যুগোস্লাভিয়া প্রজাতন্ত্রী মেসিডোনিয়া ও আলবেনিয়া।

গ্রিসের পূর্ব দিকে আছে তুরস্ক। এর মূল ভূমির পূর্ব ও দক্ষিণে রয়েছে এজিয়ান সাগর, আর পশ্চিমে আইওনিয়ান সাগর। পূর্ব ভূমধ্যসাগরের উভয় অংশে গ্রিসের বেশ কিছু দ্বীপ রয়েছে। এ ছাড়া এটি ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার মিলনস্থলে অবস্থিত। বর্তমান গ্রিকদের প্রাচীন পূর্বপুরুষ হচ্ছে একসময়ের পৃথিবী বিজয়ী প্রাচীন গ্রিক সভ্যতা, বাইজানটাইন সাম্রাজ্য। পরে প্রায় ৪০০ বছর ওসমানি খেলাফতের আওতাধীনও ছিল গ্রিস।

পশ্চিমা বিশ্বের জ্ঞানবিজ্ঞানের সূতিকাগার ও গণতন্ত্রের জন্মদায়ক স্থান হিসেবে পরিচিত ছিল এই গ্রিস। গ্রিসের আরো কিছু উল্লেখযোগ্য অবদান হিসেবে মনে করা হয় পশ্চিমা দর্শন, অলিম্পিক গেমস, পশ্চিমা সাহিত্য, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও নাটক। সব মিলিয়ে গ্রিসের সভ্যতা গোটা ইউরোপে একসময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী সভ্যতা হিসেবে পরিগণিত হতো। বর্তমানে গ্রিস একটি উন্নত দেশ, যার রাজধানী অ্যাথেন্স। গ্রিস ১৯৮১ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য।

ইসলামের আগমন : ৩৩০ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট কনস্টান্টাইন বসফরাস প্রণালির উপকূলে প্রাচীন গ্রিক শহর বাইজেনটিয়ামে তাঁর সাম্রাজ্যের নতুন রাজধানী স্থাপন করে এর নাম রাখেন নোভারোমা বা নয় রোম। কালক্রমে তাঁর নামানুসারে এই শহরের নাম হয় কনস্টান্টিনোপল।

ওসমানি খেলাফতের উত্তরসূরি দ্বিতীয় মুহাম্মদ ফাতেহর সময় গ্রিসের রাজা কনস্টান্টাইন কনস্টান্টিনোপলের সিংহাসনে আসীন ছিলেন। সুলতান মুহাম্মদ ফাতেহ তাঁর পূর্বসূরিদের মতো কনস্টান্টিনোপল দখলের উদ্যোগ নিচ্ছেন জেনে রাজা কনস্টান্টাইন পশ্চিম ইউরোপের খ্রিস্টান রাজাদের কাছে সাহায্যের আবেদন করেন। সমঝোতার খাতিরে তিনি তখন রোমান ক্যাথলিক চার্চের অনেক দাবিদাওয়া মেনে নেন। এতে গ্রিক অর্থোডক্স চার্চের নেতারা খেপে যান। গ্রিক অর্থোডক্স চার্চের প্রধান গ্র্যান্ড ডিউক নোটারাস বলেন, রোমান সম্রাটের মুকুট অপেক্ষা তিনি ওসমানি সুলতানের পাগড়ি দেখতে বেশি পছন্দ করেন।

১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মে সুলতান মুহাম্মদ ফাতেহ কনস্টান্টাইনের প্রতিরোধ ভেঙে ফেলে কনস্টান্টিনোপলে প্রবেশ করেন। যুদ্ধে গ্রিসের রাজা নিহত হন। কনস্টান্টিনোপলে ইসলামের পতাকা উড্ডীন হয়। এভাবে প্রায় ৬০০ বছর আগে হাদিসে রাসুল (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী ও সুসংবাদ প্রতিফলিত হয়। কনস্টান্টিনোপল দখলের পর মুহাম্মদ ফাতেহ গ্রিক অর্থোডক্স চার্চের কর্তৃপক্ষকে একটি সনদ প্রদান করেন। খ্রিস্টানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি অবাধে প্রতিপালনের অধিকার স্বীকৃত হয়। সুলতান নির্দেশ দেন যেন কোনো গির্জা ও উপাসনায়গুলোর অসম্মান না করা হয় এবং পাদরি, মহিলা, শিশু ও অক্ষমদের যেন কোনো ধরনের কষ্ট না দেওয়া হয়। যুদ্ধকালে যেসব খ্রিস্টান শহর ছেড়ে পালিয়েছিল, মুহাম্মদ ফাতেহ তাদের স্বগৃহে ফিরে আসার আহ্বান জানান। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে বহু খ্রিস্টান কনস্টান্টিনোপল ফিরে আসে। পরবর্তী সময়ে সেখানে ওসমানি খেলাফতের রাজধানী স্থানান্তর করা হয়। (সূত্র : উসমানি  খেলাফতের ইতিকথা, পৃ. ১৮)

গ্রিসের মোট জনসংখ্যার মধ্যে বর্তমানে ৪.৭ শতাংশ মুসলমান রয়েছে। (http://greece.greekreporter.com/ 2015/01/14/4-7-of-people-in-greece-are-muslims/)

মুসলিমদের পরাজয় : সময়টি ছিল ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দ। ওডেসাতে চারজন গ্রিক বণিক ‘হিটারিয়া ফিলকি’ নামে এক গুপ্ত কমিটি গঠন করে। ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে এর সদস্যসংখ্যা এসে দাঁড়ায় দুই লাখে। ইউরোপে ওসমানি খেলাফতের অবসান ঘটিয়ে প্রাচীন গ্রিক সাম্রাজ্যের মতো একটি নতুন গ্রিক সাম্রাজ্য গঠন ছিল এই সমিতির লক্ষ্য। ইতিহাসবিদ লেনপুল বলেন, ‘স্বাধীনতার উচ্চাদর্শ এই সব বিদ্রোহকে যতখানি না উদ্দীপিত করেছিল, তার চেয়ে বেশি করেছিল রাশিয়ার উস্কানি। ’

তৎকালীন ওসমানি খেলাফতের উত্তরসূরি দ্বিতীয় মিসরের মুহাম্মদ আলীর সৈন্যরা গ্রিক বিদ্রোহীদের প্রায় কোণঠাসা করে ফেলেছিল। এ সময় প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি গ্রিসের প্রতি ইউরোপীয়দের মনে সহানুভূতি জেগে ওঠে। ১৮২৭ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়া, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মিলিত বাহিনী নাভারিনোর নৌযুদ্ধে ওসমানি নৌবাহিনীকে পরাজিত করে। ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে গ্রিসের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান চালিয়ে ওসমানি বাহিনী আবারও পরাজিত হয়। অবশেষে ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে ওসমানি খেলাফত গ্রিসের স্বাধীনতা মেনে নিতে বাধ্য হয়। (সূত্র : উসমানি খেলাফতের ইতিকথা, পৃ. ৪৬)

পরবর্তী সময়ে সেখানে মুসলিমরা কোণঠাসা হয়ে যায়। গড়ে উঠতে দেওয়া হয়নি কোনো মসজিদ। বাতাসে ভাসতে দেওয়া হয়নি আজানের সুমধুর ধ্বনি। তারা ভুলে যায় ওসমানি খলিফা মুহাম্মদ ফাতেহের সেই উদার ও মহৎ আচরণের কথাও। ইসলাম সম্পর্কে ছড়ানো হয় বিভিন্ন মিথ্যাচার, যাতে ইসলামের প্রতি মানুষের ঘৃণা সৃষ্টি হয়। এটি মূলত গ্রিক অর্থোডক্স চার্চের সূক্ষ্ম পরিকল্পনা ছিল। তাদের বাচ্চাদের শিক্ষা দেওয়া হতো, ‘তুর্কিরা ৪০০ বছরেরও বেশি সময় গ্রিস দখলে রেখেছিল। ওই সময় গ্রিকদের ওপর তুর্কিরা যে অপরাধ করেছিল, সে জন্য ইসলাম দায়ী। যেহেতু তুর্কিরা মুসলমান, তাই তাদের অপরাধ তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে প্রতিফলিত করেছিল। ’

তাদের বইপুস্তত মতে, ইসলাম আসলে কোনো ধর্ম ছিল না, প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নবী মনে করা হতো না। তাঁকে মনে করা হতো বুদ্ধিমান নেতা ও রাজনীতিবিদ। তিনি ইহুদি ও খ্রিস্টানদের আইন একত্র করে তাঁর নিজস্ব ধ্যানধারণা গড়ে নিয়েছিলেন, বিশ্ব জয় করেছিলেন। স্কুলের বাচ্চাদের তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা করতে শেখানো হতো।

অথচ প্রখ্যাত লেখক আরনল্ড টয়েনবি তাঁর শাসনসংক্রান্ত ‘স্টাডি অব হিস্টরি’তে উল্লেখ করেছেন : “রোমান ও সাসানীয় সাম্রাজ্যের বিজিত প্রদেশগুলোতে বিকল্প ‘ইসলাম বা মৃত্যু’ ছিল না; বরং ছিল ‘ইসলাম কিংবা অতিরিক্ত কর। ’ এই নীতি ঐতিহ্যগতভাবেই এর জ্ঞানালোকপ্রাপ্ত ও কুসংস্কারমুক্ততার জন্য প্রশংসিত হয়েছিল, যখন অনেক পরে ইংল্যান্ডে লাওডিসিয়ান (ধর্মীয় বিষয়ে অনাগ্রহী) রানি এলিজাবেথ অনুসরণ করেছিলেন। ”

বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যযুগীয় ইসলামবিষয়ক অধ্যাপক মার্লিন সোয়াটজের মতে, বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে ইহুদি জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগ তাদের নির্যাতনের শিকার হওয়ার কারণে অসন্তুষ্ট ছিল, ফলে মুসলিম সেনাবাহিনীকে স্বাগত জানিয়েছিল। আর মুসলিম শাসনে ইহুদি সংস্কৃতি নতুন করে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। [সূত্র : ইসলামবিহীন বিশ্ব-২৩ (দৈনিক নয়া দিগন্ত)]

সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে জানা গেছে, গ্রিসের রাজধানী অ্যাথেন্সে মসজিদ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে গ্রিস সরকার। এটি ওসমানি খেলাফতের অবসানের পর প্রথম মসজিদ। আমরা তাদের এই বোধোদয় ও শুভ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। আশা করি, তারা তাদের ভুল বুঝতে পেরে ইসলাম ও মুসলমানদের ব্যাপারে মিথ্যাচার থেকে সরে আসবে এবং তাদের প্রতি ওসমানি খলিফার উদারতাকে সম্মান জানাবে। আল্লাহ তাদের হেদায়েত দান করুন।    

            লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক


মন্তব্য