kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নিরাপদ ও প্রশান্তিময় হজের সফরের পাথেয়

মুফতি হুমায়ুন কবির খালভি

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



যেকোনো সফরই কষ্টকর। তাই ইসলাম সফরকে গুরুত্ব দিয়ে চার রাকাতবিশিষ্ট ফরজ নামাজ দুই রাকাত আদায় করার নির্দেশ দিয়েছে।

সুন্নত নামাজকে নফল করে দিয়েছে। আর ফরজ রোজা রাখা ঐচ্ছিক করেছে। সফরে থাকলে কোরবানি করা নফল করে দিয়েছে। এভাবে বহু ইবাদতের ক্ষেত্রে সফরের প্রভাব রয়েছে। সফর যেন সফল হয়, সফরে যেন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার অবতারণা না হয়, সে জন্য ইসলাম সফরের কিছু নিয়মনীতি বেঁধে দিয়েছে। হজের সফর একটি গুরুত্বপূর্ণ সফর। তাই সে ক্ষেত্রেও কিছু নিয়মনীতি ও বিধিনিষেধ আছে। এগুলোর প্রতি যত্নবান হলে হজের সফর হবে শান্তিময় ও পুণ্যময়।

হজের সফরের আদব ও শিষ্টাচার

♦ সফরের উদ্দেশ্য প্রথমে ঠিক করে নেবে। যদি হজ ও ওমরাহর নিয়ত হয়, তাহলে ইখলাসের সঙ্গে নিয়ত করবে। আর হালাল উপার্জন দিয়ে হজ ও ওমরাহ করবে।

♦ হজের সফরে কী কী কাজ করতে হবে, সে অনুযায়ী সরঞ্জাম জোগাড় করে নিতে হবে।

♦ ওমরাহ ও নফল হজ করতে চাইলে সন্তানকে মা-বাবার ও স্ত্রীকে স্বামীর অনুমতি নিতে হবে।

♦ বৃহস্পতিবার সফরের জন্য বের হওয়া সুন্নত।

♦ সফরে যাওয়ার সময় কারো হক (দেনা-পাওনা) থাকলে তার ব্যাপারে অসিয়ত করে যেতে হবে।

♦ সফর শুরু করার আগে দুই রাকাত নামাজ পড়বে।

♦ কয়েকজন একসঙ্গে সফর করলে সবাই একজনকে আমির বানিয়ে (সম্ভব হলে) তার কাছে খরচের টাকা জমা দেবে।

♦ সফরকালে সঙ্গে কুকুর ও ঘণ্টা রাখবে না।

♦ সফর শুরু করার সময় পরিবার, পীর-মাশায়েখ ও বন্ধুবান্ধবদের বিদায় জানাবে। মুসাফির (হজে ভ্রমণকারী) তাদের বলবে—‘আসতাউদিউ কুমুল্লাহাল লাজি লা তুদায়ইউ ওয়াদাইউহু। ’ অর্থাৎ তোমাদের আল্লাহর আমানতে ছেড়ে দিলাম, যার আমানত ধ্বংস হয় না। আর বিদায় জানানো ব্যক্তিরা বলবে—‘আসতাউদিউল্লাহা দ্বীনাকা ওয়া আমানাতাকা ওয়া খওয়াতিমা আ’মালিকা। ’ অর্থাৎ আল্লাহর কাছে আপনার দ্বীন, আমানত ও শেষ আমল আমানত করে দিলাম। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৮২৬)

তারপর তারা বলবে—‘জওয়াদাকাল্লাহুত তাকওয়া ওয়া গাফারা জানবাকা ওয়া ইয়াস্সারা লাকাল খায়রা হাইসুমা কুনতা। ’ অর্থাৎ আল্লাহ আপনাকে তাকওয়া দিন, পাপ ক্ষমা করে দিন ও কল্যাণকে সব ক্ষেত্রে সহজ করুন। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৪৪৪)

♦ যখন সফরের জন্য যানবাহনে উঠবে, তখন বিসমিল্লাহ বলে ডান পা দিয়ে উঠবে এবং তিনবার তাকবির (আল্লাহু আকবার) পড়বে। এরপর এই দোয়া পড়বে—‘সুবহানাল লাজি সাখ্খারা লানা হাজা ওয়ামা কুন্না লাহু মুখরিনিন, ওয়া ইন্না ইলা রাব্বিনা লা মুনকালিবুন। আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকা ফি সাফারিনা হাজাল বিররা ওয়াত তাকওয়া ওয়া মিনাল আমালি মা তারদা, আল্লাহুম্মা হাউইন আলাইনা সাফারানা হাজা ওয়াতবি আন্না বু’দাহু, আল্লাহুম্মা আনতাস সাহিবু ফিস সফরি ওয়াল খলিফাতু ফিল আহলি, আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজু বিকা মিন ওয়াসাইচ সফরি ওয়া কা’বাতিল মানজারি ওয়া সুইল মুনকালাবি ফিল মালি ওয়াল আহলি। ’

অর্থাৎ পবিত্রতা সেই মহান সত্তার, যিনি আমাদের জন্য তা সহজ করেন আর আমরা তা করতে অক্ষম আর আমরা আল্লাহর দিকে ফিরব। হে আল্লাহ! আমরা এই সফরে কল্যাণ ও তাকওয়ার আবেদন করি, আপনার সন্তুষ্টির মতো আমল চাই। হে আল্লাহ! আমাদের ওপর এই সফর সহজ করুন আর আমাদের থেকে (সফরের) দূরত্ব ঘুচিয়ে দিন। হে আল্লাহ! আপনিই সফরের বন্ধু আর পরিবারের প্রতিনিধি। হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে সফরের ভ্রষ্টতা থেকে আশ্রয় চাই ও খারাপ দৃষ্ট থেকে আশ্রয় চাই আর সম্পদ ও পরিবারের অশুভ কল্যাণ থেকে আশ্রয় চাই।

♦ যখন সফর শেষ করে বাড়িতে আসবে, তখনো এ দোয়া পড়বে। তারপর এ দোয়া পড়বে—‘আইবুনা তাইবুনা আবিদুনা লি রাব্বিনা হামিদুনা। ’ (মুসলিম, হাদিস : ১৩৪২)

♦ যখন কোনো উঁচু স্থানে উঠবে, তখন ‘আল্লাহু আকবার’ পড়বে আর যখন নিচে নামবে, তখন ‘সুবহানাল্লাহ’ পড়বে।

♦ যখন ফজর হবে, তখন এ দোয়া পড়া মুস্তাহাব—‘সামিয়া সামিউন বিহামদিল্লাহি ওয়া হুসনি বালাইহি আলাইনা রাব্বানা সাহিবনা ওয়া আফদিল আলাইনা, আইজান বিল্লাহি মিনান নারি। ’ অর্থাৎ শ্রবণকারী আল্লাহ প্রশংসা ও আমাদের উত্তম পরীক্ষা সম্পর্কে অবগত। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের সঙ্গী হোন। আপনি আমাদের ওপর দয়াপরবশ হোন। আমরা আল্লাহর কাছে জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণ চাই। (মুসলিম, হাদিস : ২৭১৮)

♦ যখন কোনো শহরে প্রবেশ করবে, তখন এ দোয়া পড়া মুস্তাহাব—‘আল্লাহুম্মা রাব্বাস সামাওয়াতিস সাবই ওয়ামা আজলালনা, ওয়া রাব্বাল আরদিনাস সাবই ওয়ামা আখলালনা, ওয়া রাব্বাশ শাইয়াতিনি ওয়ামা আদলালনা, ওয়া রাব্বার রিয়াহি ওয়ামা জরাইনা। ফাইন্না নাসআলুকা খইরা হাজিহিল কারইয়াতি ও খইরা আহলিহা ওয়া নাউজু বিকা মিন শাররিহা ওয়া শাররি আহলিহা ওয়া শাররি মা ফিহা। ’ অর্থাৎ হে আল্লাহ! যিনি সাত আসমান বেষ্টিত ও সাত জমিন এবং তার ওপর অধিষ্ঠিত বস্তুর রব, যিনি বাতাস ও তার প্রবহমান বস্তুর রব, আমরা এই শহর ও এর অধিবাসীদের কল্যাণের আবেদন করি। আমরা এর অকল্যাণ, এর অধিবাসীদের অকল্যাণ ও তাতে যা আছে, তার অকল্যাণ থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই। (মুসতাদরাকে হাকেম, হাদিস : ১৬৩৪)

♦ সফরে কাউকে কষ্ট দেবে না; বরং অন্যের কষ্ট সহ্য করবে।

♦ মক্কা বা মদিনায় কারো আচরণ ভালো না লাগলে ঢালাওভাবে মক্কাবাসী বা মদিনাবাসীকে দোষারোপ করবে না। কেননা, রাসুলুল্লাহ (সা.) আরব, মক্কা ও মদিনার অধিবাসী ছিলেন। তাই তাদের ভালোবাসা ইমানের অংশ।

♦ মক্কা ও মদিনায় ভালো কাজের যেমন অধিক পুণ্য রয়েছে, তেমনি পাপকাজ করলেও অধিক পাপ রয়েছে।

♦ সফরে সবার সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ করবে।

♦ সফরে জিকিরে লিপ্ত থাকবে।

♦ সফরে বেশি বেশি তাওবা ও মাগফিরাতের দোয়া করবে। কেননা মুসাফিরের দোয়া দ্রুত কবুল হয়।

♦ কোথাও অবস্থান করলে এ দোয়া পড়বে—‘আউজু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাকা। ’ অর্থাৎ আমি আশ্রয় চাই আল্লাহর পরিপূর্ণ কালিমাতের মাধ্যমে সৃষ্ট বস্তুর অনিষ্ট থেকে। (মুসলিম, হাদিস : ২৭০৮)

♦ যখন কাউকে ভয় করবে, তখন পড়বে—‘আল্লাহুম্মা ইকফিনিহিম বিমা শিইতা। ’ অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি আপনার ইচ্ছামতো তাদের জন্য যথেষ্ট হোন। (মুসলিম, হাদিস : ৩০০৫) অথবা এ দোয়া পড়বে—‘আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকা ফি নুহুরিহিম ওয়া নাউজুবিকা মিন শুরুরিহিম। ’ অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমরা আপনাকে তাদের বক্ষে রাখতে চাই আর তাদের অনিষ্ট থেকে পরিত্রাণ চাই। (মুসলিম, হাদিস : ২৬২৯)

♦ সফরে দলবদ্ধভাবে থাকা উচিত। একা হওয়া নিষেধ।

♦ সঙ্গী পাওয়া সত্ত্বেও একা সফর নিষেধ।

♦ হজের সফরে সব ধরনের পাপ বর্জন করতে হবে।

♦ সফর শেষে দ্রুত বাড়িতে ফিরে আসা। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘সফর আজাবের টুকরা। তা তোমাদের আহার-বিহার ও ঘুমানো থেকে বিরত রাখে। তাই কেউ যদি তার চাহিদা পূরণ করে, সে তাড়াতাড়ি পরিবারে ফিরে যাবে। ’ (বুখারি, হাদিস : ১৮০৪)

পরিশেষে বলা যায়, সফর যদিও কষ্টদায়ক, তবে সেখানে যদি সফরের উল্লিখিত আদব ও সুন্নতের প্রতি লক্ষ রাখা হয়, তাহলে তা কষ্টের মধ্যেও বয়ে আনতে পারে তৃপ্তি ও আনন্দ।

লেখক : লেকচারার, আরবি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য