kalerkantho


শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে প্রিয় নবী (সা.)

মুহাম্মাদ রাশিদুল হক

১ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



বর্তমানে আমরা শিশু নির্যাতনের একটি ভয়াবহ সময় অতিক্রম করছি। এ ব্যাপারে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমানের বক্তব্য হলো, ‘রাজধানীর বনশ্রীতে মা তাঁর দুই শিশুকে হত্যা করবে—এটা আমি কোনোভাবেই বিশ্বাস করি না।

এখানে বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগানো উচিত। ’ (কালের কণ্ঠ, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬) বর্বর যুগে যেখানে বাবার হাতে শিশুকন্যা নির্যাতনের ভয়ে মা সদা শঙ্কিত থাকতেন, হাল জামানায় সেই মায়ের হাতে নাড়িছেঁড়া ধনের কণ্ঠরোধের খবর পাওয়া যাচ্ছে। দেশে শিশু নির্যাতনের ভয়াবহতার বর্ণনা দিতে গিয়ে মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা বলেছে, দেশে ২০১৫ সালে ১৪১টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এর আগে এই সংখ্যা ছিল ২০১৪ সালে ১১৫, ২০১৩ সালে ৯৩ এবং ২০১২ সালে ৮৫। (কালের কণ্ঠ, ১ জানুয়ারি, ২০১৬) অন্যদিকে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম ২০১৫ সালের প্রথম ছয় মাসের তথ্য প্রকাশ করে বলেছে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত নির্যাতনের শিকার হয়েছে দুই হাজার ৭৯৭টি শিশু। ১৫৪টি শিশুকে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে। (কালের কণ্ঠ, ১১ নভেম্বর, ২০১৫)

ইসলামী আইন ব্যবস্থায় মানব ঘাতকের সর্বোচ্চ শাস্তি ধারালো অস্ত্র দ্বারা শিরশ্ছেদের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু শিশু হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের বেলায় ইসলামে আরো কঠোরতার নমুনা পাওয়া যায়। একবার এক রাহাজান একটি শিশুর অলংকার ছিনতাই করে তাকে পাথরে পিষে হত্যা করে।

ওই শিশুহত্যার মৃত্যুদণ্ড কোনো ধারালো অস্ত্রের মাধ্যমে দেওয়া হয় না। বরং তাকেও নিহত শিশুটির মতো প্রস্তরাঘাতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। (মুসলিম : হা. ৪৪৫৪)

ইসলাম গ্রহণ করলে আগের সব পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। (মুসলিম : হা. ১৯২), তা সত্ত্বেও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে রাসুলুল্লাহ (সা.) অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। হজরত কায়েস ইবনে আসেম (রা.) ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর কাছে এসে বললেন, ‘আমি (জাহেলি যুগে) কন্যাসন্তানদের জীবন্ত কবর দিয়েছি। ’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘প্রতিটি কন্যার বদলে একজন করে দাস মুক্ত করে দাও। ’ তিনি বললেন, আমি তো কেবল উটের মালিক। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তাহলে প্রতিটি কন্যার বদলে একটি করে উট কোরবানি করো। ’ (তাফসিরে ইবনে কাসির : ৮/৩৩৫)

শিশু নির্যাতন রোধে রাসুলুল্লাহ (সা.) আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ ও শাস্তি কার্যকর করার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে ঘরে কাজ করা শিশু নির্যাতিত হওয়ার বিষয়টি বেশি আলোচনায় আসছে। অথচ প্রিয় নবী (সা.)-এর আদর্শ দেখুন। তিনি একটি শিশু কৃতদাসকে সন্তানের স্থানে উন্নীত করে গেছেন।

হজরত আনাস (রা.)-কে মাত্র আট বছর বয়সে তাঁর মা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেবায় অর্পণ করেন। (বুখারি : হা. ১৯৮২) দীর্ঘদিন খেদমত করতে গিয়ে নবীজী (সা.)-কে কেমন পেয়েছেন—সে অভিব্যক্তি ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি ৯ বছর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমত করেছি। আমার কোনো কাজে আপত্তি করে তিনি কখনো বলেননি, ‘এমন কেন করলে? বা এমন করোনি কেন’?’’ (মুসলিম : হা. ২৩০৯) শুধু মুসলিম সেবক নয়, ভিন্ন ধর্মের শিশুর সেবকও ছিল নবীজি (সা.)-এর স্নেহের পাত্র। একটি ইহুদি শিশু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমত করত। সে অসুস্থ হয়ে পড়লে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে দেখতে গেলেন। তার শিয়রে বসলেন। তাকে ইসলাম গ্রহণ করতে আহ্বান করলেন। সে তখন নিজের বাবার দিকে তাকাল। বাবা বলল, তুমি আবুল কাসেমের কথা মেনে নাও। এবার ছেলেটি ইসলাম গ্রহণ করল। তারপর রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় বললেন, ‘সব প্রশংসা আল্লাহর। তিনি ছেলেটিকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করেছেন। ’ (বুখারি : হা. ১২৯০)

শাসনের নামে শিশু নির্যাতন রোধেও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রয়েছে অনুপম আদর্শ। ড. আলী ইবনে রবি শিশুর সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আচরণ শীর্ষক একটি গবেষণা গ্রন্থ রচনা করেছেন। এই আরব গবেষক নিজ গ্রন্থে শিশুদের তালিম-তরবিয়ত ও শাসনের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশিত ১৮টি ধারা উল্লেখ করেছেন। তাতে শিশুকে প্রহারের কোনো ধারাই উদ্ধৃত হয়নি। (তা-আমুলুর রাসুল মাআল আতফাল : পৃ. ১৮৪) নবীজি (সা.) জীবনে কোনো দিন কোনো শিশুকে প্রহার করেননি। বরং নিজ পরিবারের শিশুদের পাশাপাশি অন্যের শিশুকেও মমতা দিয়েছেন।

ইমানের পরে নামাজের স্থান। সেই নামাজের মধ্যে শিশুপৌত্রী উমামা (রা.)-কে নিজ কাঁধে রেখেছেন। (বুখারি : হা. ৫৯৯৬) তা ছাড়া শিশুপৌত্র হাসান (রা.)-কেও কাঁধে চড়াতেন তিনি। (বুখারি : হা. ৩৭৪৯) রাসুলুল্লাহ সা. কর্তৃক শিশু হাসান (রা.)-কে চুমু খেতে দেখে এক ব্যক্তি বলল, আমার ১০টি সন্তান আছে। আমি তাদের কাউকে চুম্বন করি না। এ কথা শুনে নবীজি (সা.) তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যে মমতা করে না সে দয়া থেকে বঞ্চিত হয়। ’ (বুখারি : হা. ৫৯৯৭) রাসুলুল্লাহ (সা.) আজ থেকে ১৪০০ বছর আগেই নিজ কর্ম, উপদেশসহ আরো নানা উপায়ে সমাজসচেতনতা বৃদ্ধি করে বিশ্বকে একটি শিশুবান্ধব সমাজ উপহার দিয়ে গেছেন।

বিশ্বাসী মানুষ হিসেবে মুসলিম সমাজের অন্তর্ভুক্ত থাকার আকাঙ্ক্ষা আমাদের সবার। এ দৃষ্টিকোণ থেকেও আমাদের শিশুর ন্যায্য অধিকার প্রদানে সোচ্চার থাকতে হবে। তাকে স্নেহ করতে হবে। ছোটকে স্নেহ না করলে প্রকৃত মুমিন হওয়ার সুযোগ নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ছোটকে মমতা করে না, সে আমাদের নয়। ’ (আবু দাউদ : হা. ৪৯৪৩) শিশু নির্যাতন রোধে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ সমাজে প্রতিফলিত করতে পারলে প্রজন্মকে একটি শিশুবান্ধব বিশ্ব উপহার দেওয়ার আশা করা যায় বৈকি।

লেখক : সিনিয়র মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব

নরাইবাগ ইসলামিয়া মাদ্রাসা, ডেমরা, ঢাকা


মন্তব্য