kalerkantho


ওফাত স্মরণ

একজন আবু বকরের খোঁজে

মোহাম্মদ মাকছুদ উল্লাহ

১ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



সত্যের ওপর অবিচল আস্থা, চারিত্রিক নিপুণতা, জ্ঞানের গভীরতা, আদর্শিক পরাকাষ্ঠা, ব্যক্তিত্বের বলিষ্ঠতা, নিঃস্বার্থ জনসেবা—এককথায় মানবিক গুণাবলিতে নবীদের পরে মানবকুলের শ্রেষ্ঠ যিনি, তিনি হলেন হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মহাজন্মের দুই বছর পর তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

দুইজনের আয়ু ৬৩ বছরের দৈর্ঘ্যে সমান। মক্কার ঐতিহ্যবাহী কোরাইশ গোত্রের বনু তাইম শাখার সন্তান তিনি। ষষ্ঠ পুরুষে গিয়ে তাঁর বংশপরম্পরা রাসুলের বংশধারায় মিলিত হয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়াতি জিন্দেগির প্রথম পর্বে যাঁরাই ইসলাম কবুল করেছিলেন প্রত্যেকেই প্রচলিত বিশ্বাস ও সংস্কারের বিরুদ্ধে আগত নতুন ধর্মমতকে যুক্তি, প্রমাণ আর বাস্তবতার নিরিখে পরখ করতে সময় ক্ষেপণ করেছেন। কিন্তু হজরত আবু বকর (রা.) তাওহিদের প্রতি রাসুলের দাওয়াতের পরে এক মুহূর্তও বিলম্ব করেননি। ঐতিহাসিক মিরাজের বিষয়ে হজরত আবু বকরের স্পষ্ট, অবিলম্ব ও দ্বিধাহীন ঘোষণা ছিল : যদি আল্লাহর রাসুল বলে থাকেন, নিঃসন্দেহে তিনি সত্য বলেছেন।

হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত এবং ব্যবসায়ের পথ ধরে উপার্জিত বিপুল সম্পদ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কল্যাণে, ইসলামের প্রয়োজনে উজাড় করে দিয়েছিলেন। নিজের আগামী দিনের প্রয়োজন আর পরিবার ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ চিন্তা কখনো তাঁর দানের হাতকে সংকুচিত করতে পারেনি। তাবুক অভিযানের সময় আল্লাহর রাসুলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সাহাবায়ে কেরাম (রা.) যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে প্রতিযোগিতামূলক দান করতে লাগলেন।

সবার আগে তিনি তাঁর সমুদয় সম্পদ আল্লাহর রাসুলের সামনে পেশ করলেন। হজরত উসমান (রা.) দিলেন ৯০০ উট, ১০০ ঘোড়া এবং বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও সোনা। হজরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) দিলেন সাড়ে ২৯ কিলো রৌপ্য মুদ্রা। হজরত আস ইবনে আদি (রা.) দিলেন  সোয়া ১৩ টন খেজুর। হজরত ওমর, তালহা, সাদ ইবনে উবাদা, মোহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.) গোটা সম্পদের অর্ধেক দান করলেন। সবশেষে রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু বকর! ঘরে কী রেখে এসেছেন? উত্তরে তিনি বললেন, ‘আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলকে রেখে এসেছি। ’

হিজরতের মতো বিপদসঙ্কুল সফরে যেকোনো মানুষই এমন কাউকে সফরসঙ্গী হিসেবে বেছে নেবে, নিজের জীবনটা যার কাছে অমানত রাখা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত আবু বকরকেই বেছে নিয়েছিলেন। আর তিনি এ সফরে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও দীন ইসলামের জন্য ত্যাগের যে মহত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, মহান আল্লাহ তাঁর স্বীকৃতি নাজিল করেছেন : ‘যদি তোমরা তাঁকে সাহায্য না করো, তাহলে মনে রেখো, আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করেছিলেন। যখন কাফিররা তাঁকে বহিষ্কার করেছিল, তিনি ছিলেন দুজনের একজন, যখন ছিলেন গুহার মধ্যে। তখন তিনি নিজের সঙ্গীকে (আবু বকর রা.-কে) বলছিলেন : বিষণ্ন হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। অতঃপর আল্লাহ তাঁর প্রতি স্বীয় সান্ত্বনা নাজিল করলেন এবং তাঁর সাহায্যে এমন এক বাহিনী প্রেরণ করলেন, যা তোমরা দেখনি। ’ (সুরা তাওবা : ৪০)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর যখন  খেলাফত নিয়ে কিছুটা বিতর্ক শুরু হয়, যখন আউস ও খাজরাজ বংশদ্বয় জাহেলি যুগের বিরোধ স্মরণে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দোরগোড়ায়, যখন মক্কাবাসী রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের খবর শুনে পৈতৃক পৌত্তলিকতার পথে প্রায় ধাবমান, যখন আরবের বিভিন্ন গোত্রের মুনাফিকদের ইসলাম ত্যাগের হিড়িক পড়ে গেছে, তখন হজরত আবু বকর (রা.) খেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করে  কেবল ইসলামী খেলাফতকেই রক্ষাই করেননি, সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জাকাত অস্বীকারকারীদের জাকাত দিতে বাধ্য করে, ধর্ম ত্যাগীদের ইসলামের ছায়াতলে ফিরে আসতে বাধ্য করে, ভণ্ড নবীদের দমন করে, বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল ও গোত্রগুলোয় শান্তি স্থাপন করে তিনি খেলাফত ব্যবস্থাকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন এবং মুসলিম জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সাড়ে চার দশক পরে এসে জাতীয় জীবনে বিরাজমান প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রয়োজন এমন একজন আবু বকরের, যিনি সব সংকটে নিজের বুক পেতে দিয়ে জাতিকে রক্ষা করবেন, যেকোনো মূল্যে জাতীয় ঐক্য ধরে রাখবেন, সার্বভৌমত্ব আর জাতীয় স্বার্থে হবেন আপসহীন।

লেখক : পেশ ইমাম ও খতিব

রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদ

maksudullah73@gmail.com


মন্তব্য