kalerkantho


ইসলামে নারীশিক্ষার গুরুত্ব

মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ

২৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বর্তমানে নারীর অধিকার ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে যখন-তখন, যেখানে-সেখানে। বিশ্বে ৮৯টি দেশের মধ্যে নারীদের নির‌্যাতিত হওয়ার দিক থেকে পাপুয়া নিউগিনির অবস্থান এক নম্বর, আর বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় (মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও ইউএনএফপি)। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে দেখা গেছে, দেশে নারীদের শ্রমের প্রায় মূল্যই নেই। দুই কোটি ২৮ লাখ নারী শ্রমিকের মধ্যে এক কোটি ২৮ লাখের পেশা অস্বীকৃত। গ্রামীণ পটভূমিতে নারী নির‌্যাতনের রূঢ় বাস্তবতার  প্রতিফলনে আমরা শুনি—‘হাতেতে যদিও না মারিত তারে শত যে মারিত ঠোঁটে...। ’ (কবর : জসমীউদ্দীন)

ইসলাম নারীর অধিকার ও মর‌্যাদার নিশ্চয়তা দেয় বলেই পবিত্র কোরআনের একটি সুরার নাম ‘নিসা’ বা নারী। সুরা বাকারা, আলে ইমরান, মায়েদা, আহজাব, নূর ইত্যাদিতে নারীর অধিকার ও মর‌্যাদাসংক্রান্ত বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। বিবি খাদিজা (রা.) ছিলেন সর্বপ্রথম মুসলমান। ইসলামের ইতিহাসের সর্বপ্রথম শহীদ হয়েছিলেন একজন নারী—তাঁর নাম হজরত সুমাইয়া (রা.)।

যৌতুক প্রথার স্থলে দেনমোহরের বাধ্যবাধকতা, জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা, ভরণপোষণ লাভের অধিকার, বাঁচার অধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সহযোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ, নিরাপত্তার অধিকার, সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার, বিজ্ঞানচর্চা ও জ্ঞানার্জনে সমতা, ইবাদত, অর্থ উপার্জন ও অর্থ ব্যয়ে স্বাধীনতাসহ ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রে ইসলাম নারীর অধিকার নিশ্চিত করেছে।

সৌন্দর্য ও সম্ভাবনাময়ী কন্যা, জায়া, জননী, ভগ্নিরূপী নারী যে সমাজে অবহেলিত-অরক্ষিত, সে সমাজের পতন অনিবার্য। এ জন্যই প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘তোমরা নারী জাতির বিষয়ে সতর্ক হও। কেননা, আল্লাহকে সাক্ষী রেখে তোমরা তাদের গ্রহণ করেছ। ’ (বিদায় হজের ভাষণ : বুখারি)

নারী নির‌্যাতনের জঘন্যতম মাধ্যম দেহব্যবসা। এ বিষয়ে আল্লাহর নির্দেশ হলো, ‘তোমাদের অধীনদের তোমরা অবৈধ বৃত্তিতে (দেহব্যবসায়) বাধ্য কোরো না। ’ (সুরা নূর, আয়াত : ৩৩)। অনুরূপভাবে নারীদের সেবাদাসী হিসেবে গ্রহণ করে নির‌্যাতন না করার জন্য সুরা নূরের ৩৩ আয়াতে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। অশ্লীলতা, নির্লজ্জতা নারী নির‌্যাতনের অনুঘটক। তাই মহান আল্লাহর কঠোর হুঁশিয়ারি হলো : ‘যারা ইমানদারদের মধ্যে অশ্লীলতার বিস্তারে উৎসাহী তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। ’ (সুরা নূর : ১৯) সমাজের এক অংশকে বাদ দিয়ে অন্য অংশের উন্নতি কোনো দিনই সম্ভব নয়। এ বিষয়ে জাতীয় কবির উচ্চারণ : ‘বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর। ’

প্রিয় নবী (সা.)-এর কাছে সর্বপ্রথম যে ওহি নাজিল হয়, তার প্রথম কথা ছিল ‘ইকরা’ অর্থাৎ পাঠ করো। এখানে স্ত্রী-পুরুষ সবাইকে কথাটি বলা হয়েছে। এতেই স্পষ্ট, জ্ঞানার্জন শুধু পুরুষের জন্য সীমাবদ্ধ নয়; বরং নারীরও জ্ঞানার্জনের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। হজরত আয়েশা (রা.)সহ অন্য উচ্চশিক্ষিত মহিলারা শুধু নারীদের নয়, পুরুষদের শিক্ষয়িত্রীও ছিলেন। সাহাবি ও তাবেয়িরা তাঁর কাছ থেকে হাদিস, তাফসির ও ফিকহ শাস্ত্র অধ্যয়ন করেছেন। আয়েশা (রা.) ২২১০টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। উম্মুল মুমিনিন উম্মে সালমা (রা.) ৩৭৮টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। এ ছাড়া উম্মে আতিয়া, আসমা বিনতে আবু বকর, উম্মে হানি ও ফাতিমা বিনতে কায়েস (রা.) বহুসংখ্যক হাদিস বর্ণনা করেছেন। নারীরা শুধু শিক্ষিত নয়, শিক্ষকও। তিরমিজি শরিফে আবু মুসা (রা.) সূত্রে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, ‘আমাদের মাঝে যখনই কোনো বিষয় নিয়ে সমস্যা দেখা দিত, আমরা তখনই আয়েশা (রা.)-এর নিকট জিজ্ঞাসা করলে তার সমাধান পেয়ে যেতাম। ’

তবে এটাও সত্য যে সহশিক্ষার কারণে নৈতিক চরিত্রের যে অবনতি ও অবক্ষয় হয়েছে তা বর্ণনাতীত। মাওলানা আশরাফ আলী থানবি (রহ.) বলেন, ‘এ সকল ফিতনা বা অসুবিধার জন্য শিক্ষা দায়ী নয়; বরং শিক্ষা পদ্ধতি অথবা পাঠ্যক্রম কিংবা ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনাই একমাত্র দায়ী। ’

নর-নারী উভয়েরই বিদ্যা শিক্ষার অধিকার রয়েছে। মহিলাদের প্রাথমিক শিক্ষা-প্রশিক্ষণের স্থান হলো আপন গৃহ। পবিত্র কুরআনে আছে : ‘হে ইমানদারগণ, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে দোজখের আগুন থেকে বাঁচাও। ’ (সুরা আত-তাহরিম : ৬)

নারীদের সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য অভিভাবকদের উৎসাহিত করে প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তিনটি কন্যা সন্তান বা তিনটি বোনকে লালন-পালন করবে এবং তাদের ভদ্রতা, শিষ্টাচার, উত্তম চালচলন ও আচার-ব্যবহার শিক্ষা দিয়ে সাবলম্বী হতে সাহায্য করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব করে দেবেন। এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসুল (সা.), কেউ যদি দুজনের জন্য এরূপ করে? তিনি বললেন, দুজনের জন্য এরূপ করলেও হবে। ’ (বুখারি)

হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, ‘মহিলারা প্রিয় নবী (সা.)-কে বলল, আপনার কাছে পুরুষরা এত ভিড় করে থাকে যে অনেক সময় আমাদের পক্ষে আপনার কথা শোনা সম্ভবই হয় না। অতএব আমাদের জন্য আপনি আলাদা একটি দিন ধার্য করে দিন। এ কথা শুনে তিনি তাদের জন্য একটি দিন নির্দিষ্ট করে দিলেন। ’ (বুখারি)

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ

কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর


মন্তব্য