kalerkantho


সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহার

খন্দকার মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ

২৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহার

প্রযুক্তি-বিপ্লবের আধুনিক এ যুগে সোশ্যাল মিডিয়া পারস্পরিক যোগাযোগের শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে। আজকের দিনে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপ্তি সব মিডিয়াকে ছাড়িয়ে গেছে। ব্যক্তি ঘরের কোনায় বসে মুহূর্তেই তার বার্তা পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে দিতে পারছে। পুরো দুনিয়ার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা যাচ্ছে খুব সহজে। মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট সেবা সহজ করে দেওয়ার ফলে শিক্ষিত লোক তো বটেই, স্বল্পশিক্ষিতরাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভরপুর ব্যবহার করে চলেছে। প্রায় সব শ্রেণির মানুষ এখানে প্রাত্যহিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় ব্যয় করছে। সকাল কিংবা সন্ধ্যা, কোনো না কোনো সময় তার ধ্যান-জ্ঞান সোশ্যাল মিডিয়ায় পড়ে আছে। বিশেষত, তরুণদের একটি বড় অংশ তো রীতিমতো এর আকর্ষণে মজে আছে। তাদের মন-মগজের প্রায় সিংহভাগ জুড়ে সোশ্যাল মিডিয়া। সারা দিনের ব্যস্ততা-পরিশ্রমে ক্লান্ত তরুণ দিন শেষে একবারের জন্য হলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুঁ না মারলে যেন তার দুই চোখে ঘুম আসে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপ্তি ও গণ-ব্যবহার লক্ষ করা যাচ্ছে।

এক সময় মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য ব্যবসায়ীদের প্রচুর টাকা ঢালতে হতো; এখন তুলনামূলক নামমাত্র খরচে সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁরা বিজ্ঞাপন দিতে পারছেন।

ইন্দ্রিয়পূজারিরা এখানে অশ্লীলতা, নগ্নতা, যৌনবিকৃতি ও জৈবিক সুড়সুড়ির পসরা এভাবে সাজিয়ে রেখেছে; অবস্থাদৃষ্টে তাদের কোনো মানুষ বলার উপায় নেই; যেন ভিন্ন অবয়বের জানোয়ার। বিনোদনের নামে মুসলমানদের উঠতি প্রজন্মকে শেষ করে দেওয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত।

ক্রুসেড যুদ্ধে খ্রিস্টীয় শক্তি যখন প্রচলিত যুদ্ধে প্রায় হেরে যাচ্ছিল; প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার জন্য তারা বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের নতুন ও বিকল্প ফ্রন্ট খোলে। সেই বিকল্প আক্রমণ-পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা নির্বাচিত কিছু মেধাবী লোক দিয়ে ইসলামবিরোধী গবেষণা প্রকল্প হাতে নেয়। এরূপ গবেষকদের আমরা প্রাচ্যবিদ নামে চিনি। আজ ইসলাম সম্পর্কে বহুমাত্রিক সন্দেহ-সংশয়ের যে ভাইরাস ছড়ানো হয়েছে, এটি প্রাচ্যবিদদের মতলবি গবেষণা-তত্পরতার ফসল।

এমন পরিস্থিতিতে কেবল সোশ্যাল মিডিয়াকে যাবতীয় পাপের উৎসা ও অনিষ্টের কেন্দ্র বলে হা-পিত্যেশ করা, এটা থেকে দূরে থাকার জন্য উপদেশ বিলাতে থাকা আর যাই হোক দূরদর্শিতা হতে পারে না। আমরা হাজারবার মাথা ঠুকলেও আমাদের সন্তানরা এ জগৎ থেকে বেরিয়ে আসবে না। কাজেই সমাধানের বিকল্প উপায় খুঁজতে হবে। এটা অবশ্যই সত্য যে মুসলমান সমাজে তরুণ প্রজন্মের অধিকাংশই সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার করে যাচ্ছে। এটি ‘টাইম পাস’ করার একটি প্রিয় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এতে ছেলেদের ক্যারিয়ার নষ্ট হচ্ছে। সমাজে অশ্লীলতার বিস্তার ঘটছে। এটি এক ধরনের নেশা, যা একবার মাথায় চাপলে সহজে নামে না। যখন হুঁশ ফিরে আসে তখন বেলা গড়িয়ে জীবনে প্রায় সন্ধ্যা নামে। এমনটি কেন হচ্ছে? এর সমাধানই বা কী? এটি এ নিবন্ধের বিষয় নয়। আজকে চিন্তার অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা উচিত প্রত্যেক মতবাদ ও চিন্তাধারার ধারক-বাহকরা যখন সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপক ব্যবহার করে চলেছে; শাশ্বত ও বৈশ্বিক জীবনাদর্শের পতাকাবাহী হয়ে আমরা কেন আমাদের পয়গাম, আমাদের চিন্তা-চেতনার শ্রেষ্ঠত্বের বার্তা ছড়িয়ে দিতে, আমাদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যেতে সোশ্যাল মিডিয়ার  কেমন ও কতটুকু ব্যবহার করছি? দাওয়াতের ক্ষেত্র প্রসারিত করার জন্য সোশ্যাল মিডিয়াকে আমাদের সহজলভ্য হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। আমাদের কর্তব্য ছিল, মন্দের বিপরীতে ভালোর প্রসার ঘটিয়ে এর কল্যাণধর্মী ব্যবহার বাড়ানো। ইসলামের আন্তর্জাতিক রূপ গোটা দুনিয়ার সামনে যথাযথভাবে তুলে ধরা। মুসলমান ভাইবোনদের মধ্যে যারা সোশ্যাল মিডিয়ার ইতিবাচক ব্যবহারে তত্পর রয়েছে, তাদের অভিনন্দিত জানানো দরকার। সোশ্যাল মিডিয়ার শুদ্ধ ও কল্যাণধর্মী ব্যবহারে যারা অগ্রণী, তাদের জন্য দোয়া করার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ব্যবহারে নিজে সৎ, পরিচ্ছন্ন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা আর অন্যকেও এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্বের অংশ।

মানুষের লেখা, বক্তৃতা, আলাপ-সংলাপ তার চিন্তা ও মানসিকতার প্রতিফলন। পরিশুদ্ধ মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তি পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন বিষয় পেশ করে, আর বিকৃত বা নোংরা মনোবৃত্তির লোক দূষিত বিষয় ছড়াতে থাকে। কথায় আছে, পাত্রে যা আছে সেটাই গড়িয়ে পড়ে, ভিন্ন কিছু নয়।

জীবনপ্রদীপ নিভে যাওয়ার পরও পাপ আর পুণ্যের ফলাফল পৃথিবীর অন্তিমকাল পর্যন্ত চলমান থাকবে। যে ব্যক্তির নাম-নিশানা আজ পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে খসে গেছে, ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব কিংবা অন্য কোনো জায়গায় তার রেখে যাওয়া অশ্লীল, চরিত্রবিধ্বংসী কিংবা বিভ্রান্তিমূলক পোস্ট, ছবি, ভিডিও বার্তা কবরেও তার জন্য পাপের ‘উপহার’ পাঠাচ্ছে অনবরত!

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক

kmhamidullah@gmail.com


মন্তব্য