kalerkantho


বাঙালি মুসলমানের স্বাধীনতাসংগ্রাম

আল আমিন আশরাফি

২৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বাঙালি মুসলমানের স্বাধীনতাসংগ্রাম

এ পৃথিবীতে কেউ পরাধীন থাকতে চায় না। মুক্ত বিহঙ্গের মতো দুই ডানা মেলে আকাশে উড়তে চায়, ঘুরতে চায়।

স্বাধীনতা মানবজীবনে মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। মহান আল্লাহ মানুষকে স্বাধীনসত্তা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। আর তাঁর স্বাধীন বিচরণক্ষেত্র হিসেবে বিস্তৃত পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন। স্বাধীনতা মানে কী? বাংলা একাডেমির অভিধান মতে, স্বাধীন—১. বাধাহীন, আজাদ, মুক্ত, স্বচ্ছন্দ। ২. নিজের বশে, অনন্য নির্ভর। ৩. সার্বভৌম, বিদেশি দ্বারা শাসিত নয় এমন। স্বাধীনতা—১. স্বচ্ছন্দতা, বাধাহীনতা। ২. আজাদি। কাজেই স্বাধীন বাংলাদেশ মানে বিদেশিদের দ্বারা শাসিত নয়, এমন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বাঙালি স্বাধীনচেতা জাতি। তাদের রক্তে-মাংসে স্বাধীনতার বীজ বপন করা হয়েছে। হাজার বছরের ইতিহাস সাক্ষী, বাঙালি জাতি কখনো বিদেশিদের শাসন মেনে নেয়নি। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি জাতি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তি চেয়েছিল। স্বাধীন মাতৃভূমি প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাই তাদের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত করেছিল। ’৭১-এ ইসলাম রক্ষার নামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরপরাধ বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুসলমানদের তারা নির‌্যাতন করত ‘বিধর্মী’ আখ্যা দিয়ে। সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস লিখেছেন : ‘কুমিল্লার নবম ডিভিশন হেডকোয়ার্টারে আমার সফরকালে আমি দেখেছি, পাঞ্জাবি অফিসাররা বাঙালিদের ইসলামের আনুগত্যের প্রতি সব সময়ই সন্দেহ পোষণ করত। তারা বাঙালি মুসলমানদের কাফির ও হিন্দু বলত। ’ (দ্য রেইপ অব বাংলাদেশ, পৃ. ২৪) মূলত ’৭১-এ ইসলাম ও মুসলমানরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছিল। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম লিখেছেন—‘এক মহিলা রোগীর কাছে শুনেছিলাম, তিনি নামাজ পড়ছিলেন, সে অবস্থায় তাঁকে টেনে রেইপ করা হয়। আরেক মহিলা কোরআন শরিফ পড়ছিলেন, শয়তানরা কোরআন শরিফ টান দিয়ে ফেলে তাঁকে রেইপ করে। ’ (একাত্তরের দিনগুলি, পৃ. ১২৩)

স্বাধীনতার যুদ্ধে শরিক ছিলেন দেশের শ্রদ্ধাভাজন আলেম সমাজও। সৈয়দ আবুল মকসুদের ভাষায়, ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আলেম-ওলামা ও মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভূমিকা স্মরণীয়। পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী ঘাতক দালাল, রাজাকার, আলবদর প্রভৃতি অন্য এক প্রজাতি। তারা ঘৃণার পাত্র। আলেম-ওলামারা ধর্ম-নির্বিশেষে সব মানুষেরই অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন। ’ (সৈয়দ আবুল মকসুদের কলাম, ‘দ্য সুপ্রিম টেস্ট’, প্রথম আলো (০৭-০৪-১৩ ইং)

স্বাধীনতাসংগ্রামে সংগঠকের ভূমিকায়ও আলেম সমাজের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। এখানে আমরা স্মরণ করতে পারি মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশের কথা। মাওলানা তর্কবাগীশ ছিলেন ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসায় পড়া কওমি ঘরানার একজন আলেম। তিনি ছিলেন একাধারে একজন বিজ্ঞ সংগঠক ও যোদ্ধা। তাঁর সম্পর্কে ডক্টর মুহাম্মদ আবদুল্লাহ লিখেছেন, বাংলদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে (১৯৭১ খ্রি.) মাওলানা তর্কবাগীশ উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। তিনি ‘ওলামা পার্টি’ গঠন করে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করেন। তিনি ছিলেন ওই পার্টির সভাপতি। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের গণপরিষদের প্রথম বৈঠকে মাওলানা তর্কবাগীশ সভাপতিত্ব করেন। এখান থেকে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। তাঁর সভাপতিত্বেই সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার প্রমুখ নির্বাচিত হন—(রাজনীতিতে বঙ্গীয় ওলামার ভূমিকা, পৃষ্ঠা নম্বর ২০৪)

সুতরাং আমরা বাঙালি, নাকি মুসলমান—এ বিতর্ক অর্থহীন। আগে বাঙালি, নাকি আগে মুসলমান—এ বিতর্কেরও যৌক্তিকতা নেই। এটাই সত্য যে আমরা একই সঙ্গে বাঙালি ও মুসলমান। আহমদ ছফা লিখেছেন : ‘বেশ কিছুদিন ধরে একটা অশুভ বিতর্ক আমাদের দেশে চলে আসছে। আমরা বাংলাদেশি না বাঙালি? আমরা মুসলমান, না শুধু বাঙালি? এগুলো আসলে বিতর্কের বিষয় হওয়া উচিত ছিল না। আমরা যেমন বাংলাদেশি তেমনি আমরা বাঙালিও বটে। আমাদের মুসলমান পরিচয় বাঙালি পরিচয়কে যেমন খারিজ করে না, তেমনি বাঙালি পরিচয়ও মুসলমান পরিচয়কে খারিজ করে না। ’ (সূত্র : আহমদ ছফা, নির্বাচিত প্রবন্ধ, মাওলা ব্রাদার্স, তৃতীয় মুদ্রণ, পৃ. ২৫৯-২৬০)

বাংলাদেশের সংবিধানের চার মূলনীতিতে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ কথাটা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। এর ব্যাখ্যা বঙ্গবন্ধু নিজেই দিয়ে গেছেন। সেই ব্যাখ্যা উপেক্ষা করে মুসলমানদের ওপর ধর্মহীনতা চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখেছেন : ‘‘বাংলাদেশের যে ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ ঘোষিত হলো তা ইসলামহীন সেক্যুলারিজম নয়। কারণ মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ইসলামসংক্রান্ত অনুষ্ঠান একটু বেশিই যেন প্রচারিত হতো। হিন্দু-বৌদ্ধ ধর্ম নিয়ে বিশেষ কিছুই হতো না। কিন্তু কেন তা হতো? তা হতো এ জন্য যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান শ্রোতার কাছে ইসলামী অনুষ্ঠানের বিশেষ আবেদন ছিল। যার বিশেষ আবেদন থাকে, তার প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। বাংলাদেশ কি সেদিন ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ হতে চেয়েছিল নাকি অসাম্প্রদায়িক হতে চেয়েছিল? সেদিন বাংলাদেশের ধর্মাবলম্বী নির্বিশেষে বাঙালি জনগণ চেয়েছিল অতীতের সাম্প্রদায়িক বিষ ধুয়ে-মুছে একটি সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতিপূর্ণ, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে—সেক্যুলার হতে নয়। ’’ (সলিমুল্লাহ খান সম্পাদিত বেহাত বিপ্লব ১৯৭১, আগামী প্রকাশনী, দ্বিতীয় সংস্করণ, দ্বিতীয় মুদ্রণ, ডিসেম্বর ২০১৩, পৃ. ২২৮)

এটা দিবালোকের মতো পরিষ্কার যে ১৯৭১ সালের যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল জালিম পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘মোনাফিকদের ক্ষমা নেই’ শীর্ষক একটি সরকারি প্রচারপত্রের শেষে লেখা ছিল, “আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ‘সত্যের জয় ও মিথ্যার বিনাশ অবশ্যম্ভাবী। ’ বাঙালি এতে সম্পূর্ণ বিশ্বাসী। ” (সূত্র : বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ : দলিলপত্র, তৃতীয় খণ্ড, পৃ. ৩৩৩-৩৩৬) এই প্রচারপত্রে ফুটে উঠেছে যে ইমানি প্রেরণা নিয়েই মুসলমানরা ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করেছে। যারা এ নিয়ে তর্ক করতে চায়, তারা আসলে বিভ্রান্তির শিকার। এ বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল স্বাধীনতার পরই, মুষ্টিমেয় লোকের মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে এই বিভ্রান্তির ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু স্বদেশে ফিরে এসে এই বিভ্রান্তি দূর করেন। আবুল মনসুর আহমদের ভাষায়, “এখানে শুধু এইটুকু বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে একটা বিভ্রান্তি সত্যই সৃষ্টি হইয়াছিল। সেই বিভ্রান্তি পাকিস্তানের পরিণাম, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জাতীয় স্বকীয়তা, ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদি সকল ব্যাপারে পরিব্যাপ্ত ছিল। ফলে তাদের মধ্যে এমন ধারণাও সৃষ্টি হইয়াছিল যে নিজেদের ‘মুসলমান’ ও নিজেদের রাষ্ট্রকে ‘মুসলিম রাষ্ট্র’ বলিলে সাধারণভাবে হিন্দুরা বিশেষভাবে ভারত সরকার অসন্তুষ্ট হইবেন। ...

শেখ মুজিবের প্রত্যাবর্তন এক মুহূর্তে এই কুয়াশা দূর করিয়া দিয়াছিল। ১০ই জানুয়ারির ওই একটি মাত্র বক্তৃতার তুফানে বাংলাদেশের আসমান হইতে ওই বিভ্রান্তিকর কালো মেঘ মিলাইয়া গিয়াছিল। শেখ মুজিব তাঁর বক্তৃতায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ এবং আশু প্রয়োজনীয় ঘোষণা করিয়াছিলেন : ১. আমি মুসলমান, আমার বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র; (২) আমাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য আমি মি. ভুট্টোর কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু সে কৃতজ্ঞতার দরুন আমি দুই অঞ্চল মিলিয়া এক পাকিস্তান রাখিবার তাঁর অনুরোধ রাখিতে পারিলাম না। বাংলাদেশ স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রই থাকিবে; (৩) তাঁদের সৈন্যবাহিনী বাংলাদেশের জনগণের ওপর যে অকথ্য জুলুম করিয়াছে, দুনিয়ার ইতিহাসে তার তুলনা নাই। ...শেখ মুজিবের এই তিনটি ঘোষণাই জনগণের অন্তরের কথা ছিল। বিপুল হর্ষধ্বনি করিয়া সেই বিশাল জনতা শেখ মুজিবের উক্তি সমর্থন করিয়াছিল। ” (আবুল মনসুর আহমদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, খোশরোজ কিতাব মহল, বাংলাবাজার, ঢাকা; পুনর্মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি, ২০১০, পৃ. ৬০৪-৬০৫)

আবুল মনসুর আহমদ আরো লিখেছেন : “এই সব বিভ্রান্তির মধ্যে প্রধান এই : ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতায় পাকিস্তান ভাঙিয়া গিয়াছে; ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ মিথ্যা প্রমাণিত হইয়াছে। ’ এটা সাংঘাতিক মারাত্মক বিভ্রান্তি। ... অথচ প্রকৃত অবস্থাটা এই যে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় পাকিস্তানও ভাঙে নাই; ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ও মিথ্যা হয় নাই। এক পাকিস্তানের জায়গায় লাহোর প্রস্তাবের মতো দুই পাকিস্তান হইয়াছে। ... পশ্চিমা জনগণ তাদের রাষ্ট্র—নাম রাখিয়াছে ‘পাকিস্তান’। আমরা পূরবীরা রাখিয়াছি বাংলাদেশ। এতে বিভ্রান্তির কোনো কারণ নাই। ” (আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃ. ৬৩২, ৬৩৪)

লেখক : ইতিহাস গবেষক


মন্তব্য