kalerkantho


আগত ব্যক্তির সম্মানে দাঁড়ানো যাবে কি

মুফতি মাহমুদ হাসান   

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আিকিদা, ইবাদত, লেনদেনসহ মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইসলামের দিকনির্দেশনা রয়েছে। মানুষকে আদর্শ মানুষে পরিণত করতে যা কিছু প্রয়োজন সব বিষয়েই ইসলাম পথ দেখায়।

এটা ইসলামেরই সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য। আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি রীতি আছে, যেকোনো সম্মানিত ব্যক্তির উদ্দেশে সবাই দাঁড়িয়ে থাকে। এটি ইসলামের একটি শাখা, তথা মুয়াশারাত ও আচার-ব্যবহারসংক্রান্ত বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত একটি কাজ। এর জন্যও রয়েছে ইসলামের বিধিবিধান। আচার-ব্যবহারসংক্রান্ত বিষয়ের জন্য মৌলিকভাবে ইসলাম যে নির্দেশনাটি দিয়ে থাকে তা হলো, তোমরা প্রত্যেক মানুষকে তার স্তর অনুযায়ী সম্মান করবে। (আবু দাউদ : ৪৮৪২) তবে কাউকে কখনো অবহেলা বা অসম্মান করা যাবে না।

কারো সম্মানে দাঁড়ানোর স্তর ও বিধান

কোনো ব্যক্তির জন্য দাঁড়ানোর কয়েকটি প্রকার রয়েছে—এক. মজলিসের সর্দার উপবিষ্ট, আর বাকি উপস্থিত সবাই দাঁড়ানো। এটি নিঃসন্দেহে শরিয়তে নিষিদ্ধ। একেই হাদিস শরিফে অনারবিদের সংস্কৃতি বলে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

হজরত আবু উমামা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) লাঠি হাতে নিয়ে আমাদের দিকে অগ্রসর হলেন, আমরা তাঁকে দেখে দাঁড়িয়ে গেলাম, তখন তিনি ইরশাদ করলেন, তোমরা অনারবিদের মতো পরস্পরকে সম্মান দিতে দাঁড়িয়ে যেয়ো না। (আবু দাউদ : হাদিস ৫২৩০) হজরত আনাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাহাবায়ে কেরামের কাছে রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে অধিক প্রিয় আর কেউ ছিল না। তা সত্ত্বেও তাঁরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে দেখে দাঁড়াতেন না, কেননা তাঁরা জানতেন যে রাসুলুল্লাহ (সা.) তা অপছন্দ করতেন। (তিরমিজি : হাদিস ২৭৫৪, শরহু মুশকিলিল আসার : হাদিস ১১২৬)

দুই. আগত এমন ব্যক্তির জন্য দাঁড়ানো, যে অহংকারবশত নিজেকে সবার ঊর্ধ্বে মনে করে, সবাই তার জন্য দাঁড়াক—এটা কামনা করে, এটিও শরিয়তে নিষিদ্ধ। একদা হজরত মুয়াবিয়া (রা.) হজরত ইবনে জুবায়ের ও ইবনে আমেরের কাছে গেলে ইবনে আমের উঠে দাঁড়ালেন এবং ইবনে জুবায়ের (রা.) দাঁড়ালেন না, তখন হজরত মুয়াবিয়া (রা.) বললেন, বসে যাও, কেননা আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে শুনেছি, যে ব্যক্তি তার জন্য মানুষ দাঁড়িয়ে যাওয়া কামনা করে, সে যেন জাহান্নামে তার বাসস্থান বানিয়ে নেয়। (আবু দাউদ : হাদিস-৫২২৯, শরহু মুশকিলিল আসার : হাদিস-১১২৫)

তিন. আগত এমন ব্যক্তির জন্য দাঁড়ানো, যে অহংকারী নয়, তবে অন্তরে অহংকার আসার ভয় হয়, এমন ব্যক্তির জন্য দাঁড়ানো মাকরুহ। চার. সফর থেকে আগত ব্যক্তির জন্য তার আগমনে আনন্দ প্রকাশ ও তাকে সালাম দেওয়ার উদ্দেশে দাঁড়ানো জায়েজ, বরং মুস্তাহাব। পাঁচ. কোনো ব্যক্তির সফলতার ওপর আনন্দিত হয়ে অভিনন্দনের জন্য দাঁড়ানোও মুস্তাহাব। (ফাতহুল মুলহিম : ৩/১২৭)

হজরত কাব ইবনে মালেক (রা.)-এর দীর্ঘ একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, আমি মসজিদে প্রবেশ করলে তালহা (রা.) আমার দিকে আনন্দিত হয়ে বসা থেকে উঠে দৌড়ে এগিয়ে এলেন এবং অভিনন্দন জানালেন। (সহিহ বুখারি : হাদিস-৪৪১৮) ছয়. কোনো ব্যক্তির বিপদে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে এগিয়ে যাওয়াও মুস্তাহাব। (ফাতহুল মুলহিম : ৩/১২৭) সাত. আগত কোনো ব্যক্তিকে সম্মান ও একরাম করে দাঁড়ানো যে ব্যক্তি নিজে তার প্রত্যাশী ও আগ্রহী নয়, এর বিধান বর্ণনায় বিজ্ঞ আলেমগণের মতবিরোধ থাকলেও অগ্রগণ্য মতানুসারে তা জায়েজ। (ইলাউস সুনান : ১৭/৪২৯) তবে নিজের ক্ষেত্রে মানুষের দাঁড়ানোর ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বনই কাম্য, যাতে অহংকারের ন্যায় মারাত্মক আত্মিক ব্যাধি থেকে বাঁচার বেশি আশা করা যায়।

হজরত আবু সাইদ খুদরি (রা.) সূত্রে বর্ণিত, বনু কুরাইজার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত সাদ ইবনে মুয়াজ (রা.)-কে ডেকে পাঠালে সাদ (রা.) একটি গাধায় চড়ে আসেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বললেন, তোমরা তোমাদের নেতা সাদের দিকে দাঁড়িয়ে এগিয়ে যাও। (সহিহ মুসলিম : হাদিস-১৭৬৮)

ফাতেমা (রা.) যখনই রাসুল (সা.)-এর কাছে আসতেন, রাসুল (সা.) তাঁর দিকে দাঁড়িয়ে অগ্রসর হতেন, চুমু খেতেন, রাসুল (সা.)-এর নিজের জায়গায় তাঁকে বসাতেন। (সুনানে তিরমিজি : হাদিস-৩৮৭২)

লেখক : ফতোয়া গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার


মন্তব্য