kalerkantho


না জেনে ফতোয়া দেওয়া হারাম

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ   

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



৯ নভেম্বর ২০০৪ সালে আম্মানে ইসলামী স্কলারদের একটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এখানে বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশের ২০০ স্কলারের কাছে তিনটি বিষয়ে তাঁদের ফতোয়া বা মতামত চাওয়া হয়। তিনটি প্রশ্নের মধ্যে যেহেতু তৃতীয় প্রশ্নটি আমাদের আলোচ্য বিষয়, তাই শুধু এই প্রশ্নটির উত্তর অনুবাদ করে দেওয়া হলো।

প্রশ্ন : ইসলামে কে মুফতি হতে পারবেন? মৌলিক কী কী বিষয়ে যোগ্যতা অর্জন করলে কেউ মানুষকে শরিয়তের বিধিবিধানের ব্যাপারে নির্দেশনা ও ফতোয়া দিতে সক্ষম হবেন?

উত্তর : মুফতি ওই ব্যক্তি, যে বাস্তব ঘটনা উপলব্ধি করতে এবং দলিলসহ তার শরয়ি বিধান বর্ণনা করতে সক্ষম। শরিয়তের অসংখ্য বিধান তাঁর মুখস্থ থাকতে হবে। ইসলামে মুফতির গুরুত্ব অপরিসীম। মুফতি সাহেব রাসুল (সা.)-এর ইলমের (জ্ঞান) উত্তরসূরি। আল্লাহর পক্ষ থেকে নিযুক্ত প্রতিনিধি। তিনি আল্লাহর বিধিবিধানের ব্যাখ্যা দেন এবং সেটিকে মানুষের অবস্থা ও কাজের জন্য উপযোগী করে তোলেন। কারণ মুফতিকে ‘আহলুজ জিকির’-এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাদের কাছে জিজ্ঞাসার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘যদি তোমাদের জানা না থাকে, আহলুজ জিকির তথা জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো। ’ (সুরা নাহল : ৪৩)

মুফতির সুউচ্চ মর্যাদা ও গুরুত্বের কারণে ওলামায়ে কেরাম মুফতির মধ্যে মুজতাহিদের  জন্য প্রযোজ্য শর্তগুলোর উপস্থিতি অপরিহার্য করেছেন। এর সঙ্গে তাঁর মধ্যে নিম্নবর্ণিত গুণাবলি থাকা আবশ্যক—এক. মুসলমান হওয়া, বালেগ ও বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়া, ন্যায়পরায়ণ, বিশ্বস্ত, আমানতদার, পরহেজগার, মুত্তাকি হওয়া। ধর্মীয় বিষয়ে বেদআতি না হওয়া, পাপাচার ও অশালীন কাজ থেকে বিরত থাকা। কারো মধ্যে যদি উল্লিখিত শর্তগুলো না থাকে, তাহলে কোনোভাবেই তার কথা নির্ভরযোগ্য নয়। কেননা ইসলামে ফাসেকের কোনো বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়।

দুই. ফতোয়ার ব্যাপারে বেপরোয়া এবং সহনশীল না হওয়া।   যে ব্যক্তি ফতোয়ার ব্যাপারে বেপরোয়া, তার জন্য ফতোয়া দেওয়া বৈধ নয়। আর মুফতির জন্য আবশ্যক হলো, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পূর্ণ অধ্যয়ন ও সম্যক ধারণা লাভের আগে কোনো ফতোয়া না দেওয়া। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘তোমাদের মধ্যে যে (না জেনে) ফতোয়া প্রদানের দুঃসাহস দেখাল, সে যেন জাহান্নামের ব্যাপারে দুঃসাহস দেখাল। ’

তিন. প্রত্যুত্পন্ন মুফতি হওয়া। সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন সঠিক চিন্তার অধিকারী হওয়া।   দ্ব্যর্থহীন ও স্পষ্টভাষী হওয়া। মাসআলা আহরণ ও গবেষণার ক্ষেত্রে যথার্থ পদ্ধতি অনুসরণ করা। জীবনের বিভিন্ন দিক এবং বিভিন্ন ঘটনা গভীর ও তীক্ষ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ ও উপলব্ধি করা।

চার. আরবি ভাষা সম্পর্কে পূর্ণ অবগত হওয়া। আরবি ভাষার প্রয়োগক্ষেত্র ও তার উৎস সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অধিকারী হওয়া; যেন আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর বক্তব্য ও বাচনশৈলী সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন করতে পারে। কেননা শরিয়তকে সঠিকভাবে আয়ত্ত করার মাধ্যম হলো আরবি ভাষা।

পাঁচ. কোরআনের ওপর এই পরিমাণ ব্যুত্পত্তি অর্জন করা, যার মাধ্যমে কোরআনে বর্ণিত বিধিবিধান সম্পর্কে অবগত হতে পারে। অর্থাৎ কোরআনের মুহকাম, মোতাশাবেহ, আম, খাস, মুজমাল, মুফাসসার এবং নাসেখ-মানসুখ সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করা।

ছয়. রাসুল (সা.)-এর প্রমাণিত সুন্নাহর ব্যাপারে পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করা। রাসুল (সা.) থেকে বর্ণিত বিষয়গুলো, তাঁর বক্তব্য, কাজ ও এগুলো বর্ণনার পরম্পরা সম্পর্কে অবগত হওয়া। অর্থাৎ কোন হাদিসটি মুতাওয়াতির, কোনটি খবরে ওয়াহেদ, কোনটি সহিহ, কোনটি জয়িফ, সে সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করা।

সাত. পূর্ববর্তী ফকিহদের মাজহাব সম্পর্কে অবগত হওয়া। অর্থাৎ কোন কোন বিষয়ে তাঁদের মধ্যে ঐক্য হয়েছে এবং কোন কোন বিষয়ে তাঁরা মতপার্থক্য করেছেন, সেগুলোর ব্যাপারে অবগত থাকা; যেন এর আলোকে তিনি ফতোয়া দিতে পারেন। ঐকমত্যপূর্ণ বিষয়ের বিপরীত মুফতি কোনো ফতোয়া দিতে পারেন না। তবে মতভেদপূর্ণ বিষয়ে তিনি ইজতিহাদ ও গবেষণা করতে পারেন।

আট. কিয়াস (যুক্তি ও অনুমান), ইল্লত (হেতু) ও গবেষণার পদ্ধতি সম্পর্কে অবগত হওয়া। যেন তিনি শাখাগত মাসআলা-মাসায়েল ও উদ্ভূত সমস্যার ক্ষেত্রে মৌলিক উেসর আলোকে এর সমাধান দিতে পারেন।

নয়. মুফতির জন্য যেসব চারিত্র্যিক  বৈশিষ্ট্য ও আদব অর্জন আবশ্যক, সেগুলো অর্জন করা। অর্থাৎ ক্রোধ, ভয়, ক্ষুধা, মানসিক চিন্তা, প্রাকৃতিক চাহিদা থাকা অবস্থায় তিনি কোনো ফতোয়া প্রদান করবেন না; যেন তিনি পূর্ণ স্থিরতা ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা থেকে বিচ্যুত না হন। বিধিবিধান আহরণে আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ রাখা এবং তাঁর দৃষ্টি থাকবে পবিত্র কোরআনের নিম্নবর্ণিত আয়াতের দিকে—‘আর আমি আদেশ করছি যে আপনি তাদের পারস্পরিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তদনুযায়ী ফয়সালা করুন; তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না। ’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ৪৯)                  


মন্তব্য