kalerkantho


পারিবারিক মূল্যবোধ আমাদের ঐতিহ্য

কারি মাওলানা তাজুল ইসলাম   

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



পারিবারিক মূল্যবোধ আমাদের ঐতিহ্য

পরিবার হলো সমাজের প্রাণকেন্দ্র। সামাজিক সম্পর্ক সৃষ্টি ও বৃদ্ধি হয় পরিবারকে কেন্দ্র করে। মানবজাতির প্রথম ঐক্যের ভিত্তি হলো পরিবার। পৃথিবীর প্রথম মানব আদম (আ.) ও তাঁর স্ত্রী হাওয়া (আ.)-কে কেন্দ্র করে প্রথম পরিবার গড়ে উঠেছিল জান্নাতে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে আদম! তুমি তোমার স্ত্রীকে নিয়ে জান্নাতে বসবাস করো। যা ইচ্ছা তা খাও, কিন্তু এ গাছের নিকটবর্তী হয়ো না। ’ (সুরা বাকারা : ৩৫) পরিবারের ভিত্তি স্থাপিত হয় একজন পুরুষ ও একজন নারীর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যখন একসঙ্গে জীবন যাপন শুরু করে। পরিবার হলো অফুরন্ত সুখের উৎস। ইসলামে ছোট-বড়, একান্ন-একক সব ধরনের পরিবার গঠনের সুযোগ রয়েছে। পারিবারিক জীবনকে অধিকারের কষাকষিতে না ফেলে ইসলাম স্বামী-স্ত্রীকে প্রীতি-ভালোবাসা, হূদ্যতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ জীবনযাপনের নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা নারীদের সঙ্গে উত্তম উপায়ে জীবন যাপন করো। ’ (সুরা নিসা : ১৯) অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর একটি নিদর্শন এই যে তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাকতে পারো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। ’ (সুরা রুম : ২১) পরিবারকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা উন্নত সংস্কৃতির কারণে পশ্চিমা অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষ মানসিক দিক থেকে অনেক সুখী। নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন আমাদের সুখী হওয়ার এই দিকটি নিয়ে লিখেছেনও। ভোগবাদী মানসিকতা ও পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থার কারণে বর্তমানে সে সুখের জায়গায় চিড় ধরেছে। পারিবারিক সুখের বন্ধনগুলো ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধর্ষণ, স্বজন হত্যা, মায়ের হাতে সন্তান খুন, সন্তানের হাতে মা-বাবা খুন, পারিবারিক খুনাখুনি ও আত্মহননের ‘সংস্কৃতি’।

পশ্চিমা দেশে নারী

আমেরিকায় ১৯৯৬ সালে ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৩০টি গর্ভপাত ঘটানো হয়। (সূত্র : The world Almanc-2002, pp-88) ইউরোপীয় সভ্যতার মশালবাহী ইংল্যান্ডে ২০০৬ সালে এক লাখ ৯৩ হাজার ৭০০টি গর্ভপাত ঘটানো হয়। (সূত্র : Abortion statistics, England and Wales-2006)। এ ছাড়া পশ্চিমা নারীর ভাগ্যে রয়েছে যৌন রোগের দুর্ভোগ। কানাডার এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৫ থেকে ১৯ বছরের তরুণীদের মধ্যে সমবয়সী তরুণদের তুলনায় ক্ল্যামাইডিয়া ছয় গুণ বেশি আর গনোরিয়া বেশি দ্বিগুণ। আমরা জানি, এইডস সবচেয়ে বেশি ছড়ায় যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে এই মরণব্যাধি নারী থেকে পুরুষে যত সংক্রমিত হয়, পুরুষ থেকে নারীতে হয় তার ১৭ গুণ। এ কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পুরুষের তুলনায় নারীর এইডসে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা অনেক বেশি। যেমন—ব্রাজিলে ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যে নারীদের মধ্যে এইডস রোগী বৃদ্ধি পেয়েছে ৭৫ শতাংশেরও বেশি, অথচ পুরুষদের মধ্যে এইডস রোগী বৃদ্ধি পেয়েছে ১০ শতাংশের একটু বেশি। (সূত্র : A New psychology of Women. pp-297-298)

NCVS-এর দেওয়া তথ্যমতে, ১৯৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটে এক লাখ ৩৩ হাজার। আর ধর্ষণের ঘটনা ঘটে প্রায় দুই লাখ (অর্থাৎ গড়ে প্রায় আড়াই মিনিটে একটি) [সূত্র : 'Rape'. The Encarta Encyclopaedia.)

সম্পর্ক বাঁচানোর জন্য বন্ধুর, চাকরি বাঁচানোর জন্য কর্মকর্তার, আশ্রয় বাঁচানোর জন্য সিপতার এবং জীবন বাঁচানোর জন্য দুর্বৃত্তের যৌন নিপীড়ন তাকে মুখ বুজে সহ্য করতে হয়। নারীর ওপর পাশ্চাত্যের আরেকটা বড় জুলুম হলো, এই সভ্যতা নারীর শান্তিপূর্ণ পারিবারিক জীবন কেড়ে নিয়েছে। যে মাতৃত্বে নারীজন্মের সার্থকতা, যার জন্য নারীর চরম ব্যাকুলতা, তাকে ব্যর্থ করে দেওয়া হয়েছে। তার গর্ভাশয় পরবর্তী প্রজন্মকে ধারণ করতে প্রস্তুত, তার স্তনযুগল প্রস্তুত যার পুষ্টিদানে, হূদয়ের স্নেহ-মমতা প্রস্তুত যার মনের বিকাশ সাধনে, সেই সমাজের নারী আজ সন্তান কোলে ধারণ করতে আগ্রহী নয়। তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, তোমাকে পুরুষের মতো হয়ে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে। উপার্জন করতে হবে, ক্যারিয়ার বিল্ডআপ করতে হবে। আর সন্তানের জন্ম, লালন-পালন এ পথে বড় বাধা। সুতরাং পশ্চিমা নারী আজ এ ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকতে চাচ্ছে। পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী সমাজ নারীর ওপর পুরুষের দ্বিগুণ কাজের দুঃসহ বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। একদিকে স্বামী-সন্তানের পরিচর্যা, গৃহস্থালির যাবতীয় কাজ; অন্যদিকে অফিসে পুরুষের সমপরিমাণ কাজের বাড়তি বোঝা। পুরুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়ায় কী করুণ এসব নারীর জীবন! কানাডীয় সমাজবিজ্ঞানী রেজিনাল্ড বিবি এবং ডোনাল্ড পস্টারস্কি নারীর এই করুণ চিত্র এভাবে তুলে ধরেছেন : ‘এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ খুব কমই রয়েছে যে পেশাজীবী মায়ের কাছে বহুমুখী দাবি তাকে বড় চাপের মধ্যে ফেলে দেয়। ... যেসব নারী দিনে দ্বিগুণ কাজ করে, তাদের অসাধারণ ভারী বোঝা বহন করতে হয় এবং যে মূল্য তাদের দিতে হয় তা বিপুল। তারা দীর্ঘ সময় কাজ করে এবং আসলেই কোনো অবসর পায় না। তারা উচ্চমাত্রার চাপের শিকার হয়। (Teen Trends. p-152)

পরিবার কাঠামো ও আধুনিক জীবন

পশ্চিমা দেশগুলোতে যৌন রোগের ছড়াছড়ি, জীবিত মা-বাবার এতিম সন্তানই বেশি, যুবকদের বিয়ের প্রতি অনীহা, নারী-নির্যাতন বৃদ্ধি, বুড়ো বয়সে আশ্রয়হীন জীবনযাপন, মাদক সেবন বৃদ্ধি, অ্যালকোহল সেবন বৃদ্ধি, জনসংখ্যা হ্রাস ইত্যাদি তাদের সমাজের সাধারণ দৃশ্য। বিয়েশাদি নেই, বিয়ের প্রতি অনীহা। ঘরবাড়ি বিরানভূমি, পরিবার নেই। বৈধ সন্তানের চেয়ে ‘লাভ চিলড্রেন’ সেখানে বেশি। এটা পশ্চিমা সমাজের চিত্র। মিখাইল গর্বাচেভ সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট। তিনি রাশিয়ান ভাষায় একটি বই লিখেছেন। বইটি ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। তাঁর বইয়ের একটি অধ্যায় হলো—‘স্টেটাস অব উইমেন’। এই অধ্যায়ে তিনি লিখেছেন, আমরা অক্লান্ত বিপ্লবের মাধ্যমে নারীদের ঘর থেকে বের করে এনেছি, রাজপথে এনেছি, চেয়ারে বসিয়েছি, ফ্যাক্টরিতে কাজ করতে দিয়েছি। সর্বস্তরে আমরা নারীদের কাজ করতে দিয়ে আমাদের বস্তুগত কিছুমাত্র লাভ হয়েছে। পুরুষ ও নারী উভয় মিলে যখন কাজ করে, তখন বেশি লাভ হয়; কিন্তু তার চেয়ে আমরা অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। আমাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কোমলতা ও প্রশান্তি নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি আরো বলেন, ‘আমার জীবনের সর্বশেষ পর্যায়ে আমি দ্বিতীয় আরেকটি বিপ্লব সৃষ্টি করতে চাই। প্রথম বিপ্লবের মাধ্যমে পরিবার প্রথাকে নষ্ট করে মেয়েদের ঘরের বাইরে এনেছি। এবার দ্বিতীয় বিপ্লব হবে, তাদের আমরা আবার ঘরের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে দেব। যাতে আমাদের পারিবারিক সুখ-শান্তি ফিরে আসে। (সূত্র : আধুনিকতার আড়ালে নারী, জয়নব আক্তার সোহেল, পৃ. ১৬৫)

অধ্যাপক জন ইল ইস্পাইস ইটুয়া ১৯৯২ সালে একটি বই লিখেছেন। বইটি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়েছে।   বইটির নাম ‘Islam : The Straight Path’. সেখানে তিনি লিখেছেন, পাশ্চাত্য জগৎ বিশেষ করে অমুসলিম দেশগুলোতে সাধারণ মানুষ চারিত্রিক ও নৈতিক পথভ্রষ্টতায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছে। সেখানে তারা ইসলামের পারিবারিক জীবনব্যবস্থাকে অত্যন্ত ঈর্ষার দৃষ্টিতে দেখছে। পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির কারণে কোটি কোটি পরিবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সেখানে লাখ লাখ শিশু অমানবিক নির্যাতন, বর্বরতা এবং মাতৃ ও পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

মিসেস মরগান (গধত্ধফবষ গড়ত্মধহ) একজন আমেরিকান নারী। তিনি ‘Total Women’ নামে একটি বই লিখেছেন। এই বইয়ে তিনি আমেরিকান নারীদের সুন্দর দাম্পত্য জীবনযাপনের পরামর্শ দিয়ে লিখেছেন : 'Be nice to your husband, stop nagging him and understand his needs'@অর্থাৎ ‘তোমার স্বামীর উত্তম সঙ্গিনী হও, তাকে গালমন্দ কোরো না। তার প্রয়োজন অনুভব করো। ’ এক বছরের মধ্যে বইটি তিন মিলিয়নের চেয়েও বেশি বিক্রি হয়। মরগানের কাছে নারীর জন্য স্বামীর উত্তম সঙ্গিনী হওয়াই হলো Total Woman. (Times of India, Fb., 1978)

মুসলিম দেশগুলোতেও যে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে না, ব্যাপারটি এমন নয়। তবে এর জন্য দায়ী কে? নিউ ইয়র্কের ইখাকা কলেজের রাজনীতিবিজ্ঞান (Political scince) বিভাগের সভাপতি প্রফেসর ড. আসমা বার লাস কংগ্রেস লাইব্রেরিতে প্রদত্ত এক ভাষণে বলেন, ‘কোনো কোনো মুসলিম দেশে মাঝেমধ্যে যে নারী নির্যাতনের চিত্র দেখা যায়, তার সঙ্গে ইসলামের দূরতম সম্পর্কও নেই। এটা সেখানকার স্থানীয় সংস্কৃতি। পরিবেশের কারণে অথবা ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে বা ইসলাম থেকে দূরে থাকার কারণে এ কাজগুলো হয়। ’ (MARCH 2004, Lectur of the library of Congress)

লেখক : ইমাম, ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া মসজিদ


মন্তব্য