kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


হাজিদের সঙ্গে ধোঁকাবাজি!

মোহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ

১১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



প্রতিবছরই হাজিরা অনেক আশা ও স্বপ্ন নিয়ে হজে যান। কিন্তু অশ্রুভেজা চোখে তাঁদের ফিরে আসতে হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটাই যেন তাঁদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের পৃথক মন্ত্রণালয় থাকলেও কার্যত পরিস্থিতির উন্নতি দেখা যাচ্ছে না

 

গত শুক্রবার (৪-৩-১৬) দৈনিক কালের কণ্ঠর প্রথম পাতার একটি খবরের শিরোনাম হলো : ‘হজের ৪৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ!’ এর উপশিরোনামে বলা হয়েছে : ‘ধামাচাপা দিতে পাঁচ হাজার হজযাত্রীর নথি গায়েব; ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তিন কর্মকর্তাকে শোকজ। ’ খবরের ভেতরের অংশে বলা হয়েছে : ‘ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা ও বেসরকারি হজ এজেন্সি মালিকদের সংগঠন হাব নেতাদের বিরুদ্ধে হজের ৪৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে। এ অর্থের হিসাব-সংক্রান্ত নথিও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সচিব আবদুল জলিল তাঁর দপ্তরের পিএস আবদুল খালেক, পিও ইমামুল হক ও আরেক কর্মকর্তা আবসারকে শোকজ করেন। সচিবের মৌখিক নির্দেশে সেই নথি কোথায় আছে, তার তথ্য দিতে না পারায় ওই তিনজনকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে শোকজের জবাব দিতে বলা হয়। সাত দিন পার হওয়ার আগেই গত বুধবার শোকজের জবাব দেন তিন কর্মকর্তা। জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ অনুরোধে সৌদি সরকার গত বছর যে পাঁচ হাজার অতিরিক্ত হজযাত্রী পাঠানোর অনুমোদন দিয়েছিল, তা নিয়েই ঘটে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা। এর মধ্যে ১৭ কোটি টাকা সরকারের, বাকি ২৮ কোটি টাকা হজযাত্রীদের। টাকা আত্মসাতের পর চক্রটি ওই পাঁচ হাজার হজযাত্রীর সংশ্লিষ্ট নথি গায়েব করে দিয়েছে, যাতে ঘটনা প্রমাণ করা না যায়। ’

আশার কথা হলো, পরে গায়েব হওয়া নথি পাওয়া গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নথি পাওয়া গেলেও জড়িতদের বিচার হবে কি না—সেটাই দেখার বিষয়।

ধর্মীয় আবেগের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে প্রতিবছর এ দেশের লাখো বিত্তশালী মুসলমান পবিত্র হজ পালনে সৌদি আরব গিয়ে থাকেন। এতে যাতায়াত, থাকা-খাওয়া নিয়ে প্রায় প্রতিবছরই তাঁদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। প্রতিবছরই হজযাত্রীরা অনেক আশা ও স্বপ্ন নিয়ে হজে যান। কিন্তু অশ্রুভেজা চোখে তাঁদের ফিরে আসতে হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটাই যেন তাঁদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের একটি মন্ত্রণালয় থাকলেও কার্যত পরিস্থিতির উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। আর পরিস্থিতির উন্নতিই বা হবে কিভাবে, যখন এই অব্যবস্থাপনার সঙ্গে খোদ ওই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জড়িত! আসলে পরকালের আদর্শবিচ্যুত ভোগবাদী সমাজে সব কিছুকে পণ্যই ভাবা হয়। ভাবা হয় ব্যবসা ও পুঁজি সংগ্রহের মাধ্যম। সে ধারাবাহিকতায় হজের ব্যবসা এ দেশে খুবই রমরমা। রাতারাতি বড়লোক হওয়ার চরম সুযোগ এটি! বাংলাদেশে সমাজব্যবস্থায় যেখানে সব জায়গায় দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে, সেখানে মন্ত্রণালয়ের কথা না হয় বাদই দিলাম; কিন্তু এ ব্যবসার সঙ্গে তো অসংখ্য ‘আলেম’ও জড়িত আছেন, তাঁদের কী হবে? সত্যিই চোর কখনো ধর্মের কাহিনী শোনে না। আসলে এঁদের আলেম হিসেবে না দেখে হজ ব্যবসায়ী হিসেবে দেখাই ভালো। এঁদের দাড়ি-টুপি হয়তো আছে, হয়তো ধর্মের দু-চারটা বুলিও তাঁরা আওড়াতে পারেন; কিন্তু তাঁদের মধ্যে মূল্যবোধ নেই, আদর্শ নেই, ধর্মের শিক্ষা নেই। এরা এমন প্রদীপ, যার মধ্যে আলো নেই, প্রাণ নেই।

হজ পাপপঙ্কিলতা থেকে পবিত্র করে মানুষকে পরিশোধিত জীবনে ফিরিয়ে আনে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করে, আর তাতে কোনো ধরনের পাপাচারে লিপ্ত হয় না, সে সদ্য ভূমিষ্ঠ নবজাতকের মতো নিষ্পাপ হয়ে (হজ থেকে) ফিরে আসে। ’ (বুখারি : ১৪২৪, মুসলিম : ২৪০৪)

এমন নিষ্পাপ হাজিদের সঙ্গে যারা নির্দয় আচরণ করে, প্রতারণা করে, হয়তো তাদের কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা হবে, হয়তো ইহজগতে ওরা পার পেয়ে যাবে, পরকালে কিন্তু এদের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার হবে—বিশ্বাসী মানুষদের এ বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস আছে। হজ ব্যবসা নিয়ে বর্তমানে যে অরাজকতা চলছে, এর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া সময়ের দাবি। প্রয়োজনে হজ ব্যবস্থাপনা নতুনভাবে ঢেলে সাজানো হোক। আর কোনো হাজি পবিত্র হজ পালন করতে গিয়ে ভোগান্তি ও প্রতারণার শিকার হবেন না—এটাই সবার প্রত্যাশা।

লেখক : ইসলামী গবেষক


মন্তব্য