kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


টেকসই অর্থনীতি ও ইসলাম

মুহাম্মাদ রাশিদুল হক

১১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



টেকসই অর্থনীতি ও ইসলাম

অর্থ সব অনর্থের মূল বলে একটি কথা সমাজে প্রচলিত থাকলেও কথাটি অনেকাংশে সত্য নয়। প্রিয় নবী (সা.)-এর হাদিসের আলোকে আমরা সে কথা বলতে পারি।

তিনি বলেন, ‘দারিদ্র্য মানুষকে অবিশ্বাসের পথে নিয়ে যায়। ’ (মিশকাত : হা. ৫০৫১) বিশ্বাসী মানুষ হিসেবে অর্থ উপার্জন করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য ইবাদত। এই মর্মে নবীজি (সা.) ইরশাদ করেন, ‘হালাল সম্পদ উপার্জন করা অবশ্য করণীয় অন্যতম একটি বিধান। ’ (মিশকাত : হা. ২৭৮১) তবে অর্থ উপার্জনই মানুষের জীবনের মূল লক্ষ্য নয়। জীবনের প্রয়োজনে তা উপার্জন করতে হবে। ইসলাম মানুষের জীবনের সার্বিক ক্ষেত্রে সফলতার নিমিত্ত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা উপহার দিয়েছে। অর্থনীতিতেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি।  

কোরআনে কারিমে হালালভাবে উপার্জন ও তা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি হারাম পন্থায় সম্পদ উপার্জন ও ব্যবহার করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে, ‘হে মানবমণ্ডলী, পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তুসামগ্রী ভক্ষণ করো। আর শয়তানের  পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। নিঃসন্দেহে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। ’ (সুরা : বাকারা : আয়াত : ১৬৮) অন্য আয়াতে এসেছে : ‘তোমরা অন্যায়ভাবে একে অন্যের সম্পদ গ্রাস কোরো না এবং জেনে-বুঝে মানুষের সম্পদের কিছু অংশ অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে বিচারকের কাছে (মোকদ্দমা) পেশ কোরো না। ’ (সুরা : বাকারা : আয়াত : ১৮৮)

সম্পদের প্রয়োজনীয়তা এবং তা জনজীবনের চালিকাশক্তি হওয়ার ক্ষেত্রে যেমন কারো দ্বিমত নেই, তেমনি এর কিছু মাধ্যম বৈধ ও অন্যগুলো অবৈধ হওয়ার ব্যাপারেও সবাই একমত। তবে কোন মাধ্যম বৈধ ও কোনটি অবৈধ—এ ব্যাপার গোটা মানবজাতির কাছে একটি কার্যকর, গ্রহণযোগ্য ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নির্ধারণ সহজ নয়। বিশ্ববাসীর অগ্রগতি, উন্নতি ও সফলতার উদ্দেশ্যে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের জন্য যদি কেবল এক অঞ্চলের মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত জ্ঞানকেই পুঁজি করা হয়, তাহলে তা  নিরূপণের পর সেটি অন্য কোনো দেশ বা জাতির কাছে গ্রহণযোগ্য না-ও হতে পারে। আর যদি বহুজাতিক সম্মেলনের আয়োজন করে সব জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সমবেত করা হয়, তবু সবার ঐকমত্যসংবলিত এমন কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালায় পৌঁছা সম্ভব হবে না, যা গোটা মানবজাতির কাছে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ফলে এই অসম নীতি পরিশেষে দ্বন্দ্ব-সংঘাত, ফিতনা-ফ্যাসাদের এক ভয়াবহ রূদ্রমূর্তি ধারণ করবে। তাই হলফ করে বলা যায় যে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহির আলোকে প্রণীত নীতিমালাই হতে পারে এ ক্ষেত্রে একমাত্র সঠিক ও যুক্তিপূর্ণ মাপকাঠি।

ইসলামী শরিয়ত হালাল-হারাম ও জায়েজ-নাজায়েজের যে নীতিমালা প্রণয়ন করছে, তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আল্লাহ তাআলার প্রেরিত ওহির আলোকে নিরূপিত। নিঃসন্দেহে এটিই একমাত্র যুক্তিপূর্ণ, সর্বজনীন ও নিরাপদ নীতিমালা। সব দেশ, জাতি ও ধর্মের মানুষের উত্কর্ষের চাবিকাঠি। খোদাপ্রদত্ত নীতিমালায় নেহাত প্রয়োজনীয় ও যৌথভাবে প্রদানযোগ্য বস্তুগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে বিনা মূল্যে প্রদান করা হয়ে থাকে। যেমন : বাতাস, পানি, বিনা চাষে উদগত তৃণলতা, আগুন, মালিকানাবিহীন সমতল ও পাহাড়ি বনভূমির ফল, ফসল প্রভৃতি। এগুলোর মধ্যে সব মানুষের অধিকার রয়েছে। এতে কারো একক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা বৈধ নয়।

পক্ষান্তরে যেসব বস্তু নিয়ে যৌথ মালিকানা প্রদানের নিয়ম জারি করলে মানবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় অথবা পরস্পর দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পথ উন্মুক্ত হয়, সেসব ক্ষেত্রে যৌথ মালিকানার নীতি প্রণয়ন করা হয়নি। কোনো ভূমি বা সেটির উত্পাদিত ফসলের প্রাথমিক মালিকানা অর্জন ও মালিকানা হস্তান্তরের নীতিমালা ভিন্ন ভিন্ন। কোনো মানুষ যেন তার প্রয়োজনীয় বস্তু থেকে বঞ্চিত না হয়, এ নীতিমালার প্রতিটি ধারায় এদিকে লক্ষ রাখা হয়েছে। তবে প্রতিটি মানুষকে এ ক্ষেত্রে পরিশ্রমী হতে হবে এবং তা অর্জনে যথাসাধ্য শক্তি ব্যয় করতে হবে। অন্যের প্রাপ্য অধিকার ক্ষুণ্ন করে অথবা ক্ষতি সাধন করে নিজে পুঁজিপতি হওয়ার চেষ্টা থেকে বিরত থাকতে হবে। মৃত্যুর পর মিরাস বণ্টন হোক অথবা ক্রয়-বিক্রয় বা অন্য কোনোভাবেই মালের মালিকানা হাতবদল হোক না কেন, সে ক্ষেত্রে মুআমালা বা লেনদেনটি উভয় পক্ষের সম্মতিতে হতে হবে। মজুরি বা অন্য কোনো লেনদেনের ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণরূপে প্রতারণা-প্রবঞ্চনামুক্ত হতে হবে। শুধু তা-ই নয়, এ ক্ষেত্রে এমন কোনো সন্দেহের অবকাশও থাকতে পারবে না, যার ফলে পরস্পরের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হতে পারে।

পারস্পরিক সম্মতির ক্ষেত্রে এ বিষয় লক্ষণীয় যে সম্মতিটি কি স্বেচ্ছায় প্রদান করা হয়েছে, নাকি কোনো চাপের মুখে দিতে বাধ্য হয়েছে। ইসলামী শরিয়ত যেসব লেনদেনকে বাতিল, ফাসিদ ও গুনাহ বলে সাব্যস্ত করেছে, তার সব কয়টির মধ্যে উপরোক্ত ত্রুটির যেকোনো একটি অবশ্যই থেকে থাকে। প্রতারণা-প্রবঞ্চনা অথবা অজানা পণ্য বা কাজকে বিনিময় নির্ধারণ, অন্যের অধিকার খর্ব বা অপরের ক্ষতি সাধন করে নিজ মুনাফা হাসিল করার মতো বিষয় বিদ্যমান থাকার কারণে শরিয়ত নির্দিষ্ট কিছু লেনদেনকে হারাম, মাকরুহ ইত্যাদি সাব্যস্ত করেছে। সুদ, জুয়া প্রভৃতি হারাম হওয়ার মূল কারণ হলো এই যে তা সম্মিলিত অধিকার রক্ষার প্রতিবন্ধক। এতে কিছুসংখ্যক মানুষ রাতারাতি ফুলে-ফেঁপে ওঠে। অন্যদিকে গোটা সমাজ দারিদ্র্যের শিকার হয়। সমগ্র জাতির ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার কারণে এসব লেনদেন পারস্পরিক সম্মতি থাকা সত্ত্বেও জায়েজ নেই। আল্লাহ তাআলার বাণী : ‘তোমরা অন্যায়ভাবে (নাজায়েজ পদ্ধতিতে) একে অন্যের সম্পদ ভোগ কোরো না’—এর মধ্যে এসব নিষিদ্ধ পন্থা অবলম্বনের ওপর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। আয়াতে কারিমার মধ্যে গভীরভাবে ভেবে দেখার বিষয় হলো, ‘নিজের সম্পদ’ দ্বারা এ ক্ষেত্রে এ বিষয়ের প্রতি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত হয়েছে যে অন্যের সম্পদে অবৈধ হস্তক্ষেপের আগে তোমাদের একবার এ কথা ভেবে দেখা দরকার যে অন্যদের নিজ নিজ সম্পদের ওপর ঠিক তেমনি ভালোবাসা রয়েছে, যেমনটি রয়েছে তোমাদের নিজের সম্পদের ওপর। তোমাদের সম্পদে অনুরূপ অবৈধ হস্তক্ষেপের সময়ও মনে এই অনুভূতির সৃষ্টি করো যে এ যেন তোমাদেরই সম্পদ।

কোনো ব্যক্তি অন্যের সম্পদে অবৈধ হস্তক্ষেপ করলে স্বভাবতই অন্য ব্যক্তি তার সম্পদে অবৈধ হস্তক্ষেপ করে বসবে। তো অন্যের সম্পদে অবৈধ হস্তক্ষেপ করা নিজের সম্পদকে এরূপ অবস্থার সম্মুখীন করার নামান্তর। একটু তলিয়ে দেখলে আমাদের কাছে এ কথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীতে যদি ভেজাল মিশ্রণের প্রবণতা শুরু হয়ে যায়, আর কেউ ঘির মধ্যে তেল বা চর্বি মিশিয়ে অধিক মুনাফা হাসিল করে, তাহলে সে যখন দুধ ক্রয় করবে, তখন বিক্রেতা তাকে পানি মিশ্রিত দুধ সরবরাহ করবে। অপরজন সে পরিমাণ পয়সা তার পকেট থেকে একই পন্থায় হাতিয়ে নেবে। এমনিভাবে তৃতীয় ব্যক্তি দ্বিতীয় ব্যক্তির সঙ্গে অনুরূপ আচরণ করবে। নির্বোধ শুধু নিজের কী হাসিল হলো তা-ই দেখল। কিন্তু পরিশেষে নিজের ভাগে কী এলো তার প্রতি বিন্দুমাত্র খেয়াল করল না।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ওই বাণীর মধ্যে সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন যে বিচারক যদি কোনো প্রকার ভুলের কারণে এমন রায় প্রদান করেন যে তাতে একজনের অধিকার অন্যায়ভাবে অন্যজনের হস্তগত হয়, তাহলে আদালতের এই রায়ের ভিত্তিতে ওই সম্পদ হালাল হবে না। এমনিভাবে এ রায়ের কারণে সম্পদের মূল মালিকের জন্য তা হারাম হবে না। মোট কথা, আদালতের রায় কোনো হারাম বস্তুকে হালাল, তদ্রূপ কোনো হালাল বস্তুকে হারাম সাব্যস্ত করতে পারে না। যদি কোনো ব্যক্তি প্রতারণা বা মিথ্যা সাক্ষ্য-প্রমাণের আশ্রয় নিয়ে আদালতের মাধ্যমে অন্যের সম্পদ হস্তগত করে নেয়, দুনিয়াতে পার পেয়ে গেলেও সে আখিরাতে এর শাস্তি ভোগ করবে। সে যেন সেদিনের হিসাব-নিকাশ ও আলিমুল গাইবের সামনে দাঁড়ানোর ভয় করে।

ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উভয় জগতে মানবজাতির কল্যাণের উদ্দেশ্যে। সে হিসেবে অর্থ মানুষের সেবক। উন্নতি শুধুই ইহকালকেন্দ্রিক নয়। এর একটি শাখা পরকালেও গিয়ে পৌঁছেছে। ইসলামের দেওয়া অর্থনৈতিক শিক্ষা স্বল্পমেয়াদি নয়। দীর্ঘস্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী। একটি টেকসই অর্থনীতির বিশ্ব উপহার দিতে হলে অবশ্যই আমাদের ইসলামী অর্থব্যবস্থাকে আপন করে নিতে হবে। কেননা মহান আল্লাহর একমাত্র মনোনীত ধর্ম ইসলামের প্রদর্শিত অর্থব্যবস্থাই কেবল বিশ্বকে উপহার দিতে পারে একটি টেকসই অর্থনীতি, সর্বোপরি বিশ্বশান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠার সোনালি সোপান। বিশ্ব-অর্থনীতি ইতিমধ্যে এই সত্য উপলব্ধি করতে বাধ্য হচ্ছে। তাই ইউরোপ-আমেরিকার ব্যাংকগুলো ইতিমধ্যে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু করতে শুরু করেছে।

লেখক : সিনিয়র মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, নড়াইবাগ ইসলামিয়া মাদ্রাসা, ডেমরা, ঢাকা


মন্তব্য