জাহেলি সমাজে বিবাহ নারী ও পরিবার-331953 | ইসলামী জীবন | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

সোমবার । ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১১ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৩ জিলহজ ১৪৩৭


জাহেলি সমাজে বিবাহ নারী ও পরিবার

মাওলানা আখতার হোসাইন

৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সভ্যতা বহুদূর এগিয়েছে। অজ্ঞতার যুগ থেকে আমরা আধুনিক যুগে পদার্পণ করেছি। অমানবিকতা পরিহার করে আমরা মানবিক হতে চেষ্টা করছি। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় রাতের আঁধার দূর করে আলোর মশাল জ্বালিয়েছি। প্রশ্ন হলো, প্রকৃত অর্থে আমরা কত দূর এগিয়েছি? আমাদের সমাজ কতটা এগিয়েছে? আধুনিক সমাজের দিকে একবার তাকিয়ে আসুন; আমরা একটু জাহেলি সমাজের চিত্রটা দেখে নিই। সিরাত গ্রন্থাবলির মধ্যে অন্যতম বিশুদ্ধ গ্রন্থ ‘আর-রহিকুল মাখতুম’ থেকে জাহেলি সমাজের চিত্র তুলে ধরা হলো : আরবের জনগণ বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে বসবাস করত। প্রত্যেক শ্রেণির অবস্থা ছিল অন্য শ্রেণির চেয়ে আলাদা। অভিজাত শ্রেণিতে নারী-পুরুষের সম্পর্ক ছিল যথেষ্ট উন্নত। এ শ্রেণির মহিলাদের স্বাধীনতা ছিল অনেক। তাদের কথার মূল্য দেওয়া হতো। তাদের এতটা সম্মান করা হতো এবং নিরাপত্তা দেওয়া হতো যে এরা পথে বের হলে তাদের নিরাপত্তার জন্য তলোয়ার বেরিয়ে পড়ত। প্রয়োজনে রক্তপাত হতো। কেউ যখন নিজের দানশীলতা ও বীরত্ব প্রসঙ্গে নিজের প্রশংসা করত, তখন সাধারণত মহিলাদের সম্বোধন করত। নারীরা ইচ্ছা করলে তাদের মধ্যে যুদ্ধ ও রক্তপাতের আগুন জ্বালিয়ে দিত। এ সব কিছু সত্ত্বেও পুরুষদেরই মনে করা হতো পরিবারের প্রধান এবং তাদের কথা গুরুত্বের সঙ্গে মান্য করা হতো। এ শ্রেণির মধ্যে নারী-পুরুষের মধ্যকার সম্পর্ক বিয়ের মাধ্যমে নির্ণীত হতো এবং মহিলাদের অভিভাবকদের মাধ্যমে এ বিয়ে সম্পন্ন হতো। অভিভাবক ছাড়া বিয়ে করার মতো কোনো অধিকার নারীদের ছিল না।

অভিজাত শ্রেণির অবস্থা এ রকম হলেও অন্যদিকে অন্যান্য শ্রেণির অবস্থা ছিল ভিন্নরূপ। সেসব শ্রেণির মধ্যে নারী-পুরুষের যে সম্পর্ক ছিল, একে পাপাচার, নির্লজ্জতা, বেহায়াপনা, অশ্লীলতা ও ব্যভিচার ছাড়া কিছু বলা যায় না। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘জাহেলি যুগে বিয়ে ছিল চার প্রকার। প্রথমটি ছিল বর্তমান কালের অনুরূপ। যেমন—একে অন্যকে মেয়ের বিয়ের জন্য পয়গাম পাঠাত। সে পয়গাম মঞ্জুর হওয়ার পর মোহরানা আদায়ের মাধ্যমে বিবাহ সম্পন্ন হতো।

দ্বিতীয়টি ছিল নিজের স্বামী থাকা সত্ত্বেও অন্যের কাছ থেকে সন্তান গ্রহণ। বিবাহিত মহিলা রজঃস্রাব থেকে পাকসাফ হওয়ার পর তার স্বামী তাকে বলত, অমুক লোকের কাছে পয়গাম পাঠিয়ে তার কাছ থেকে তার লজ্জাস্থান অধিকার করো। অর্থাৎ তার সঙ্গে ব্যভিচার করো। এ সময় স্বামী নিজ স্ত্রীর কাছ থেকে দূরে থাকত। স্ত্রীর কাছে যেত না। যে লোকটিকে দিয়ে ব্যভিচার করানো হচ্ছিল তার দ্বারা নিজ স্ত্রীর গর্ভে সন্তান আসার প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত স্বামী স্ত্রীর কাছে যেত না। গর্ভলক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর স্বামী ইচ্ছা করলে স্ত্রীর কাছে যেত। এমন করার কারণ ছিল যাতে সন্তান সুন্দর, অভিজাত ও পরিপূর্ণ হতে পারে। এ ধরনের বিয়েকে বলা হয় ‘এসতেবদা’ বিবাহ। ভারতেও এ বিয়ে প্রচলিত আছে।

তৃতীয়ত, ১০ জন মানুষের চেয়ে কমসংখ্যক মানুষ কোনো এক জায়গায় একজন মহিলার সঙ্গে ব্যভিচার করত। মহিলা গর্ভবতী হওয়ার পর সে সব পুরুষকে কাছে ডেকে আনত। এ সময় কারো অনুপস্থিত থাকার উপায় ছিল না। সবাই উপস্থিত হলে মহিলা বলত, তোমরা যা করেছ, তা তো তোমাদের জানা, এখন আমার গর্ভে এ সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছে। হে অমুক, এ সন্তান তোমার। তারপর সে মহিলা ইচ্ছামতো যে কারো নাম নিত। যার নাম নেওয়া হতো নবজাত শিশুকে তার সন্তান হিসেবে সবাই মেনে নিত।

চতুর্থত, বহু লোক একত্রিত হয়ে একজন মহিলার কাছে যেত। মহিলা কোনো ইচ্ছুক পুরুষকেই বিমুখ করত না বা ফিরিয়ে দিত না। এরা ছিল পতিতা। এরা নিজেদের ঘরের সামনে একটা পতাকা স্থাপন করে রাখত। এর ফলে ইচ্ছামতো বিনা বাধায় তাদের কাছে যাওয়া যেত। এ ধরনের মহিলা গর্ভবতী হলে এবং সন্তান প্রসব করলে যারা তার সঙ্গে মিলিত হয়েছিল তারা সবাই হাজির হতো। তারপর একজন বিশেষজ্ঞ ডাকা হতো। সেই বিশেষজ্ঞ তার অভিমত অনুযায়ী সন্তানটিকে কারো নামে ঘোষণা করত। পরবর্তী সময়ে সেই শিশু ঘোষিত ব্যক্তির সন্তান হিসেবে বড় হতো। সে ব্যক্তি সন্তানটিকে অস্বীকার করতে পারত না। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আগমনের পর আল্লাহপাক জাহেলি সমাজের সব ধরনের বিবাহ প্রথা বাতিল করে দেন এবং বর্তমানে প্রচলিত ইসলামী বিবাহ প্রথা প্রচলন করেন।’ (সহিহ বুখারি, কিতাবুন নিকাহ, খণ্ড ২, পৃ. ৭৬৯)

জাহেলি যুগে একাধিক স্ত্রী রাখা কোনো দোষের ব্যাপার ছিল না। সহোদর দুই বোনকেও অনেকে একই সময়ে স্ত্রী হিসেবে ঘরে রাখত। পিতার তালাক দেওয়া স্ত্রী অথবা পিতার মৃত্যুর পর সন্তান তার সত্মায়ের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতো। তালাকের অধিকার ছিল শুধু পুরুষের এখতিয়ার। তালাকের কোনো সংখ্যা নির্দিষ্ট ছিল না। (আবু দাউদ, তাফসির গ্রন্থাবলি, আত তালাক মাররাতান দ্রষ্টব্য)

ব্যভিচার সমাজের সর্বস্তরে প্রচলিত ছিল। কোনো শ্রেণির নারী-পুরুষই ব্যভিচারের কদর্যতা, পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত ছিল না। অবশ্য কিছুসংখ্যক নারী-পুরুষ এমন ছিল, যারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের অহমিকার কারণে এ নোংরামি থেকে বিরত থাকত। স্বাধীন মহিলাদের অবস্থা তুলনামূলকভাবে দাসীদের চেয়ে ভালো ছিল। দাসীদের অবস্থা ছিল সবচেয়ে খারাপ। জাহেলি যুগের অধিকাংশ পুরুষ দাসীদের সঙ্গে মেলামেশায় দোষ ও লজ্জাবোধ করত না। সুনানে আবু দাউদে উল্লেখ রয়েছে, একদা একজন লোক দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, অমুক আমার পুত্রসন্তান। জাহেলি যুগে আমি তার মায়ের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ইসলামে এ ধরনের দাবির  কোনো সুযোগ নেই। এখন তো সন্তান সেই ব্যক্তির মালিকানাধীন, যার স্ত্রী বা স্বামী হিসেবে সেই মহিলা পরিচিত আর ব্যভিচারের জন্য রয়েছে পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুর শাস্তি। হজরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) এবং আবদ ইবনে জাময়ার মধ্যে জাময়ার দাসীর পুত্র আবদুর রহমান ইবনে জাময়ার বিষয়ে যে ঝগড়া হয়েছিল সেটা তো সর্বজনবিদিত। (সহিহ বুখারি, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ. ৯৯৯, ১০৬৫) জাহেলি যুগে পিতা-পুত্রের সম্পর্কও ছিল বিভিন্ন রকমের। কিছু লোক এমন ছিল, যারা বলত, আমাদের সন্তান আমাদের কলিজার টুকরা। অন্য দিকে কিছু লোক এমন ছিল, যারা অপমান ও দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তানকে জীবিত মাটিতে প্রোথিত করত। শিশুসন্তানদের শৈশবেই মেরে ফেলত।

(আর-রহিকুল মাখতুম থেকে অনূদিত, সংক্ষেপিত)

মন্তব্য